বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট ভ্রমণের শতবর্ষ

  ইসমাইল মাহমুদ

২৯ জুন ২০১৯, ১৩:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

‘মমতাবিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি। ভারতী আপন শূন্য হাতে বাঙ্গালীর হৃদয়ের সাথে বরমাল্য নিয়া বাধে তব হিয়া। সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে বাঙলার আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।’ বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে উজ্জ্বল নক্ষত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট ঘুরতে এসে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে সিলেট নিয়ে উপরোক্ত কবিতাটি রচনা করেন। তিনি ১৯১৯ সালে সিলেটে আসেন। চলতি বছরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট আগমনের শতবর্ষ পূর্ণ হলো। বিশ্বকবির স্মৃতিকে ধারণ করে সিলেটবাসী আজও গৌরবান্বিত। ১৯১২-১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক মননে প্রভাব বিস্তার করেন। সংযোগ সৃষ্টি করেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে বাংলা সাহিত্য বিশ্বে একটি বিশেষ স্থান লাভ করে। কিন্তু ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া বিশ্বযুদ্ধ তা সম্পূর্ণ ওলট-পালট করে দেয়। ১৯১৮ সালে বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে পাশ্চত্যকে অস্বীকার করেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার সংযোগকে যে গভীরতর করার চেষ্টা করেছিলেন, তাতে তার সে প্রচেষ্টার ভাটা পড়ে যায়। ফলে পৃথিবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলা সাহিত্যের বিচ্ছিন্নতা ঘটে। ঠিক সেই সময়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট আগমন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার এ আগমন সারা সিলেটবাসীর জন্য এক গৌরবের অধ্যায়। বিশ্বযুদ্ধের টানাপড়েনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৃদয়ে সৃষ্টি হয় বিশাল ক্ষত। আর এ ক্ষত নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলংয়ে চলে যান। উদ্দেশ্য অবকাশ যাপন। শিলং থাকাকালীন (মতান্তরে গৌহাটি) সিলেটের আনজুমানে ইসলামিয়া ও ব্রাহ্মসমাজ সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সিলেট সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে আমন্ত্রণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। তিনি ১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর সিলেট আগমন করেন। ওইদিন সকাল ৮টায় ট্রেনে চড়ে বিশ্বকবি সিলেটে পৌঁছলে মৌলভীবাজারের আনজুমানে ইসলামিয়ার নেতা আসাদউল্লার নেতৃত্বে তাকে রাজোচিত সংবর্ধনা জানানো হয়। সিলেট রেলস্টেশনে উপস্থিত ছিলেন সিলেট পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর সুখময় চৌধূরী, খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া), রায় বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মৌলভী আব্দুল করিম, নলিনী বালা চৌধুরীসহ গণ্যমান্য সিলেটবাসী। সেখান থেকে বিশ্বকবিকে চাঁদনীঘাটে নিয়ে যাওয়া হলে সিলেটের বনিয়াদি জমিদার পরিবারের মজুমদার বাড়ি, কাজীবাড়ি ও দস্তিদার বাড়ির প্রতিনিধিরা ঘোড়ায় চড়ে এসে কবিকে সংবর্ধনা জানান। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৌলভী আব্দুল করিমকে নিয়ে বসেন এক ফিটন গাড়িতে। কবি গাড়িতে চড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুল-কলেজের উৎসাহী যুবক ও কিশোররা ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে নিজেরা গাড়ি টেনে চলে। সে সময়ে সিলেটের ক্বীন ব্রিজ তৈরি হয়নি। ফলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ে পৌঁছলে একখানা সুসজ্জিত জুড়িন্দা নৌকায় করে তাকে নদী পারাপার করা হয়। সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে আসার পর রবীন্দ্রনাথকে একখানা ফিটন গাড়িতে বসানো হয়। কবির সঙ্গে কবির একমাত্র পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্ত্রী প্রতিমা দেবী ছিলেন। বিকালে রতনমনি লোকনাথ টাউন হল প্রাঙ্গণে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সংবর্ধনা সভায় কবিকে স্বাগত জানিয়ে ভাষণ দেন সৈয়দ আব্দুল মজিদ। তিনি অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। ইংরেজি, উর্দু ও ফরাসি ভাষায় তিনি অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারতেন। তার আশঙ্কা ছিল বাংলায় বক্তৃতা দিলে সিলেটি টান এসে যাবে, যা হয়তো রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারবেন না। তাই তিনি ইংরেজির পরিবর্তে দেশি ভাষারই আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ডক্টর ছাহেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপ জো হামারে সিলহেট যে তশরিফ লেআয়ে, ইসলিয়ে সিলহেট কা সব লোগ খুশ হোয়া।’ পরদিন মুরারীচাঁদ কলেজের হিন্দু হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্রদের জন্য তিনি বক্তৃতা দিলেন। ব্রাহ্মসমাজ ব্যতীত সিলেট শহরের বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কবির আগমনে ব্যাপক কোনো উৎসাহ লক্ষ করা যায়নি। তবে আনজুমানে ইসলামিয়ার সবাই কবিকে রাজসিক সংবর্ধনা প্রদান করেন। সিলেটে সংবর্ধনার জবাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিমত ব্যক্ত করেন- তিনি সমগ্র জীবনে বহু স্থান পরিদর্শন ও ভ্রমণ করেছেন, কিন্তু সবগুলো স্থান তার অন্তরকে স্পর্শ কিংবা সমান প্রভাবিত করেনি। সিলেট ভ্রমণ তার মনোজীবনে ও সৃষ্টিকর্মে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। সিলেট আগমনের সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মানে সিলেটের মাছিমপুরে মণিপুরী রাস নৃত্যের আয়োজন করা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিপুরী নৃত্যের ভাবরস দেখে অভিভূত হন। পরে কবিগুরু ত্রিপুরা রাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃদ্ধিমন্ত সিংহকে মণিপুরী নৃত্যের শিক্ষক হিসেবে বিখ্যাত শান্তি নিকেতনে নিয়োগ করে মণিপুরী রাসনৃত্যকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলেন। (দৈনিক আমাদের সময় থেকে সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ