বুক রিভিউ

‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ পরিক্রমায়’ : উন্নয়ন দ্রষ্টার অনন্য গ্রন্থ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০১৯, ১৭:৫১ | আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ১৭:৫৯

অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য, সিনিয়র সচিব, বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ এর অন্যতম রূপকার। ২০০৯ সাল থেকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ-মেয়াদি রূপকল্প এবং একাধিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র প্রণয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় শতবছরের বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন। উন্নয়নশীল স্তর থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সরকারকে নিরন্তর দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। তিনি একাধিক বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিতভাবে কলাম লিখে অর্থনীতির জটিল ও কঠিন বিষয়গুলোকে সহজ-সরলভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন। এবিনিউজের পাঠকরদের জন্য বইটির রিভিউ লিখেছেন- মিল্টন বিশ্বাস

২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক গ্রন্থ। ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ পরিক্রমায়’ গ্রন্থটি এর মধ্যে অন্যতম। ১২০ পৃষ্ঠাবৃত এবং ২০টি প্রবন্ধের সংকলন এটি। গ্রন্থটির নামকরণ জানান দিচ্ছে, এদেশের উন্নয়নের মূল নিয়ন্ত্রক কিংবা অনুঘটক সম্পর্কে লেখকের অভিনিবেশ তীব্র। তিনি আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সুলুক-সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উন্নয়ন ভাবনাকে আত্মকৃত করে।   

উন্নয়ন সম্পর্কে নোবেল লরিয়েট ড. অমর্ত্য সেন বলেছেন: ‘জনগণের সক্ষমতার বিকাশ সাধনই হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এই সক্ষমতা অর্জন এবং নিজের জীবনের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা।’ এই উন্নয়ন চিন্তার প্রতিধ্বনি রয়েছে ড. শামসুল আলমের পর্যবেক্ষণে। তিনি নিজের কর্ম ও চেতনায় অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট। এমনকি বিশ্ব পরিস্থিতিকেও ধর্তব্যের ভেতর রেখেছেন।

তাঁর উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন, ন্যায়বিচারের মতো প্রসঙ্গগুলো জড়িত। মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় উন্নয়ন ধারণাটি কীভাবে কার্যকর সে সম্পর্কেও তিনি সচেতন। তিনি প্রকৃতিসৃষ্ট ও মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়কে দেখেছেন অত্যন্ত গভীরভাবে এবং কাছ থেকে। দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষকে ক’রে তোলে বিপন্ন এবং সম্পদহীন। এজন্য তাঁর এই আলোচ্য গ্রন্থের একাধিক প্রবন্ধে বিষয়টি নিয়ে যুক্তিশীল মতামত উপস্থাপিত হয়েছে।  

ড. শামসুল আলম এদেশের স্বল্পোন্নত অবস্থার উন্নয়ন নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন ‘দারিদ্র্যপীড়িত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মাহেন্দ্রক্ষণে’ প্রবন্ধে। একইসঙ্গে বলা যায়, লেখকের উন্নয়ন ভাবনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ’, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’, ‘পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন হালচাল’, ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় আমাদের দৃষ্টি দিগন্ত ছাড়িয়ে’ প্রভৃতি নিবন্ধমালায়। উন্নয়ন- কাউকে পিছনে ফেলে নয়, কোনো মানুষকে বাদ দিয়ে নয়- সকলকে সঙ্গে নিয়ে- এই অভিব্যক্তি রয়েছে ‘পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন হালচাল’ প্রবন্ধে। ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ চূড়ান্ত করার জন্য পার্বত্য এলাকা সফর করেছেন লেখক নিজে। নিজের দেখা অভিজ্ঞতা থেকে কৃষি, সেচ, অরণ্য সবমিলে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নের নীতি ও পরিকল্পনা স্পষ্ট করেছেন তিনি এ প্রবন্ধে।  

ড. শামসুল আলম বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেই কৃষিবান্ধব বাজেট, উন্নত অর্থনীতির জন্য কৃষিখাতের রূপান্তর প্রত্যাশা করেছেন। তিনি যেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে নীতি পরিকল্পনায় সিদ্ধ হয়ে উঠেছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘আজ সোনার বাংলার কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা, আশ্রয়হারা। তারা নিঃসম্বল।’

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে বারবার উচ্চারণ করতে হয়েছে, ‘দেশে কৃষি বিপ্লব সাধনের জন্য কৃষকদের কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা হবে না।’(১৯৭২) ১৯৭২ সালের মে মাসে তিনি বলেন, কৃষক ভাইয়েরা, চেষ্টা করবো, দুনিয়া থেকে বীজ ও পাম্প এনে আপনাদের দেবার জন্য। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি অন্য এক ভাষণে বলেছেন, কৃষক ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে সবুজ বিপ্লব সফল করে তুলুন। বাংলাদেশকে খাদ্যে আত্মনির্ভর করে তুলুন।’ বাকশাল গঠনের পর ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চের ভাষণেও বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয়, জাপানের এক একর জমিতে তার তিন গুণ বেশি ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডবল ফসল করতে পারব না, দ্বিগুণ করতে পারব না।’ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন শেখ হাসিনা তা সরকারি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সফল করে তুলেছেন।

বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা, কৃষি উন্নয়নে গরিব ও বর্গাচাষিদের সহায়তা করা প্রভৃতি কাজের ফলাফল আজ ১০ বছর পর আমরা পাচ্ছি। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টায় এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যথাযথ কর্মকাণ্ডের ফলাফল হলো আজকের বাংলাদেশ। আজকে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনে অগ্রগামী। এসবের ভিত্তি আরো ত্বরান্বিত হয়েছে ড. শামসুল আলমের মতো গবেষকদের প্রচেষ্টায়।

সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এই লেখকের। তিনি যেমন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে ভেবেছেন তেমনি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিয়েও কথা বলেছেন। অন্যদিকে তাঁর মতে, কর্মসংস্থান-সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আয় বা উপার্জনের সক্ষমতা ও প্রবাহ বাড়িয়ে তুলতে হবে। তাহলে শুধু মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে।

আর্থিক মুক্তির জন্য মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ ক্ষুধা থেকে মুক্তি; পরনির্ভরতা থেকে মুক্তি এবং সংকীর্ণ কূপমণ্ডকতা থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে মানুষের উন্নয়ন সম্ভব। ড. শামসুল আলম অর্থনীতিবিদ বলেই দেশের মুদ্রানীতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে এই গ্রন্থে তাঁর দু’টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।           

 অবশ্য লেখকের মুখ্য আগ্রহের বিষয় ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’। এ বিষয়ে গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে একাধিক প্রবন্ধ। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ : বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনা’, ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ : কী এবং কেন’, ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা : ভ্রান্তি দূরে কিছু বক্তব্য’, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমান প্রজন্মের একটি শ্রেষ্ঠ উপহার’ অন্যতম। অর্থাৎ তিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টির সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন, খরাপ্রবণ এলাকার সবুজায়ন, নদ-নদীর বর্তমান পরিস্থিতি, সেচ প্রকল্প ও বিলের চালচিত্র অঙ্কন করেছেন নির্মোহভাবে।  

অন্যদিকে ৭৪ থেকে ৮৬ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘একটি প্রলম্বিত সাক্ষাৎকার’-এ লেখকের ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা’ সম্পর্কে অভিমতসমূহ ব্যক্ত হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং লেখকের উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম দৃষ্টান্ত।

মূলত ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ পরিক্রমায়’ গ্রন্থে উন্নয়ন ভাবনার আদিগন্ত প্রান্তর স্পর্শ করেছেন ড. শামসুল আলম। এজন্য দেখা যায়, টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জসমূহ ও করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করে তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং উন্নয়ন যে সকলকে নিয়ে হতে হবে- সে বিষয়ে যথার্থ অভিমতসমূহ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য ও মতামত যুক্তিনির্ভর, স্পষ্ট, বাস্তব অভিজ্ঞতাজাত। গ্রন্থটি পাঠক মহলে অবশ্যই অতি আবশ্যক হিসেবে চিহ্নিত ও পঠিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।


এবিএন/রাজ্জাক/জসিম/এআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food