শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫
logo
 

কোটা সংস্কার আন্দোলন কিছু বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন

কোটা সংস্কার আন্দোলন কিছু বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, ১৫ এপ্রিল, এবিনিউজ : দাবি যদি হয় ন্যায্য এবং লক্ষ্য যদি থাকে স্থির তাহলে যে কোন আন্দোলন যে জয়ের মুখ দেখতে বাধ্য তা সরকারি চাকুরী ক্ষেত্রে ‘কোটা প্রথা’ বাতিলের দাবিতে সাধারণ ছাত্রদের দেশব্যাপী আন্দোলনের সাফল্য বলে দেয়। কোন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে নয়, কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায়ও এই আন্দোলন হয়নি। এই আন্দোলন ছিল সাধারণ ছাত্র সমাজের, যারা একই সমস্যার যাঁতাকলে আটকে পড়ে আছে বছরের পর পর। সমস্যা অভিন্ন এবং ইস্যু বাঁচা–মরার, তাই তারা এককাট্টা হয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাতের ঘুমকে শিঁকেয় তুলে, বিপদ মাথায় করে গভীর রাতেও রাস্তায় নেমেছিল তাদের দাবী নিয়ে। তাদের এই আন্দোলন দেশের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ওয়াইল্ড ফায়ারের’ মত মুহূর্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল গোটা দেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে – সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। দীর্ঘ দিনের এই ‘কোটা প্রথার’ শিকার হয়ে আসছে হাতে সার্টিফিকেট নিয়ে বেড়িয়ে আসা লক্ষ লক্ষ যুব গোষ্ঠী। তারা হতাশ হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে, তাদের ভাষ্য –তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, ফেরার আর কোন পথ নেই। বাস্তবিক তাই। তাদের এই ন্যায্য দাবীর আন্দোলনকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা–অপচেষ্টা দুটোই হয়েছে, বিভিন্ন স্বার্থানেষী মহল থেকে। অনেকে অভিযোগ করেছে –মুক্তিযুদ্ধ–বিরোধী শক্তি এই আন্দোলনের পেছনে। অগ্নিকন্যা হিসাবে পরিচিত মন্ত্রী, মতিয়া চৌধুরী তো এক ধাপ এগিয়ে আন্দোলনকারীদের ঢালাওভাবে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে অভিহিত করেছেন। হঠাৎ করে এই অগ্নিকন্যা এমন অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন কেন তা বোধগম্য নয়। সরকারের অন্য কোন মন্ত্রী বা নেতা বললে খুব একটা অবাক হতাম না। তার মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে কেউ এমন ঢালাও আক্রমণ আশা করেনি। যাই হোক, সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ ছাত্রদের দাবীর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন এবং কোন কোন গোষ্ঠী ছাত্রদের এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার আগেই তিনি সংসদে ঘোষণা দিলেন, ‘ছাত্ররা এমন কী আন্দলোনরত ছাত্রীরাও যখন সরকারি চাকুরী ক্ষেত্রে কোন কোটা রাখার বিরোধী তখন এই কোটা প্রথা তুলে দেয়া হবে’। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। তিনি অনেক দিনের এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এই আশ্বাস বাণীটিই আন্দোলনরত ছাত্র–ছাত্রীরা তার কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিল। তারা বারবার বলে আসছিল, ‘আমরা প্রধান মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনতে চাই’। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি ছাত্রদের কথা শুনেছেন এবং ছাত্ররা তাদের আন্দোলন গুটিয়ে ক্লাসে ফিরে যাবে এটাই সবাই আশা করে।

ছাত্ররা যখন আন্দোলন করে, রাজপথে নামে, মিছিল করে তখন উদ্বিগ্ন হয় লক্ষ মা–বাবা, তাদের অভিভাবকেরা। কেননা যে সমস্ত ছাত্র–ছাত্রী ক্লাস ছেড়ে, হল ছেড়ে রাস্তায় আন্দোলনে নামে তাদের বেশীর ভাগই মফঃস্বল এলাকা বা অন্য জেলা থেকে আসা। অনেকেই অনেক কষ্টে ঠাঁই করে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, শহরে থাকার একটি জায়গা করে নিয়েছে একটি সুন্দর আগামী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। তাদের মা–বাবা, নিকটজনও স্বপ্ন দেখে তাদের ছেলে–মেয়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একটি ‘সরকারি’ চাকুরী নেবে, তাদের এতদিনের তিলতিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে, তাদের অভাব ঘুচবে। অনেক ছাত্র–ছাত্রী তো জীবন হারিয়েছে এই ধরণের আন্দোলনে, হয়েছে পুলিশি নির্যাতনের শিকার, কেউ কেউ হয়েছে পঙ্গু। আর তাই তারা যখন দূর থেকে শোনে, পত্রিকায় পড়ে, টেলিভিশনের পর্দায় দেখে তাদের সন্তানেরা রাজপথে, আন্দোলনে মিছিলে, পুলিশের সামনে, তখন তাদের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হবার কারণ থাকে বৈকি।

কোটা প্রথা নতুন কোন বিষয় নয়। এই অঞ্চলে বৃটিশ শাসনামলে কোলাপুরের (খুব সম্ভবত মহারাষ্ট্রে) মহারাজা রাজর্ষি শাহু মহারাজ যিনি শাহু রাজা (১৮৯৪–১৯২২) হিসাবে সমধিক পরিচিত প্রথম এই বিশেষ সুবিধা প্রদান প্রথা চালু করেন। তার ২৮ বছরের শাসনামলে তিনি নিম্নবর্ণ শ্রেণির লোকদের জন্য শিক্ষা, চাকুরী সহ অনেক সমাজ সংস্কারমূলক কাজ করেন। রাজ্‌ পরিবারের ব্রাহ্মন পুরোহিতরা এক সময় ব্রাম্মন–নন এমন জনগণের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আপত্তি করলে মহারাজা শাহু ওই ব্রাম্মন পুরোহিতদের সরিয়ে এক তরুণ মারাঠীকে ‘অ–ব্রাম্মনদের’ ধর্মীয় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেন, যা ছিল সে সময়ে একটি অতি সাহসী পদক্ষেপ। সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্যে তিনি ৫০% সুযোগ সুবিধা প্রদান করেন, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই কোটা প্রথা বৃটিশ–উত্তর ভারতে প্রবর্তন করা হয়, এখনও আছে সে দেশে, প্রচলিত আছে নেপালে। এমন কী ‘পজিটিভ অ্যাকশন’ নামে যুক্তরাজ্যে এবং ’এমপ্লয়মেন্ট ইকুইটি’ নামে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বৈষম্যের শিকার তেমন কয়েকটি শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। পাকিস্তান আমলেও আমরা এই অঞ্চলে দেখেছি ক্ষুৃদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে চাকুরী, শিক্ষা সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে কোটা প্রথা চালু ছিল। বাংলাদেশেও এই কোটা প্রথার প্রচলন শুরু থেকে ছিল। আমাদের দেশে বিসিএসে নিয়োগ ক্ষেত্রে বর্তমানে ৫৫% শতাংশ কোটা সংরক্ষিত। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও তাদের নাতি–নাতনিদের জন্যে ৩০% শতাংশ, নারী কোটা ১০% শতাংশ, জেলা কোটা ১০% শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্যে ৫% শতাংশ কোটা প্রচলিত। কিন্তু সমস্যা হলো এতে মেধার চাইতে কোটার প্রাধান্য বেশি এবং তা সংস্কারের দাবি সত্ত্বেও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি এদ্দিন। তাতেও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই কোটার অপব্যবহার হতে আমরা দেখেছি। আমরা দেখেছি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ছাপিয়ে অনেক ক্ষেত্রে কী করে অ–মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে সরকারী ও অন্যান্য সুযোগ–সুবিধা নিতে। এদেশে একাধিক ‘সচিব’ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ‘জাল’ বলে প্রমাণিত হয়েছে, সে আমরা পত্র–পত্রিকায় পড়েছি। এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সূর্য সন্তান। দেশের জন্যে তাদের অবদান কেউ খাটো করে দেখার কথা নয়, যারা দেখে তারা বলতে হয় এই দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনা। কিন্তু এর অপব্যবহার যাতে কোনভাবে হতে না পারে সেদিকে সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। ছাত্রদের আন্দোলন কোটার বিরোধিতা নয়, তাদের আন্দোলন কোটার পরিমান কমিয়ে আনা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব কোটা উঠিয়ে নেয়া হবে। দেখা যাক শেষ তক কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাধারণ ছাত্রদের এই আন্দোলন ও দাবিকে ন্যায্য বলে এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন ঢাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদ্বয়, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এতেই কী প্রতীয়মান হয় না যে ছাত্রদের এই দাবি যৌক্তিক!

সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাবার যে প্রচেষ্টা হয়নি তা বলা যাবে না। ফেইস বুকে মিথ্যে তথ্য ও ছবি দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। অনেকে এই আন্দোলনকে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দাও লুটতে চেয়েছেন বলে খোদ প্রধানমন্ত্রী, তার কয়েক মন্ত্রী এমন কী সাধারণ জনগণও মন্তব্য করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন আক্রমণ ও লুটের ঘটনা তারই প্রমান সেটি বলা বাহুল্য। প্রকৃত ছাত্র তার শিক্ষকের বাসভবনে এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাতে পারে বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। ছাত্রের আড়ালে বা মুখোশে এ অন্য কারো কাজ বলে অনেকেই মনে করেন, আর হয়তো সে কারণে আন্দোলনকারী ছাত্ররা এই আক্রমণকারীদের বিচার চেয়েছে। জনৈক মন্ত্রী তো অভিযোগ করেছেন এই বলে, তারা লাশ চেয়েছিল, পায়নি। জানি না মন্ত্রীর এই অভিযোগ কতটুকু সত্যি, তবে এটা সত্যি, ভিসির বাসভবনে আক্রমণ অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা এবং প্রধান মন্ত্রী সংসদে এই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যথার্থভাবে বলেছেন, ’’যারা ভাঙচুরের সাথে জড়িত তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। এতো বড় অন্যায় আমরা মেনে নিতে পারিনা। গুরুজনকে অপমান করে প্রকৃত শিক্ষা হয় না’’। আমরাও আশা করবো যারা এই ধরনের ঘটনার সাথে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে এবং প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে। কেননা এই ধরনের অমার্জনীয় অপরাধ বিচার ছাড়াই পার পেয়ে গেলে আগামীতে এই ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে পারে। ছাত্রদের এই আন্দোলন একটা সময় হয়তো থেমে যাবে, আন্দোলনরত ছাত্র–ছাত্রীরাও ফিরে যাবে তাদের নিজ নিজ ক্লাসে। পাশাপাশি এই আন্দোলনকে বেগবান করার জন্যে যারা এখনোও জেলে রয়েছে তারাও আশা করি অচিরেই বিনা শর্তে ছাড় পাবে। অনেক মা–বাবা, অভিভাবক, তথা গোটা দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় স্বস্তি পেলেও এখনো সেই সমস্ত অভিভাবক এবং ছাত্ররা উদ্বিগ্নে আছেন যাদের সন্তানেরা এবং সহপাঠীরা এখনো কারাগারে।

লেখক: প্রবাসী

(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত