শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫
logo
 

‘পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নে ভারতকে আরো উদার হতে হবে’

‘পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নে ভারতকে আরো উদার হতে হবে’

ঢাকা, ০৮ এপ্রিল, এবিনিউজ : ড. মো. আবদুল্লাহ হেল কাফী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। ২০০৮-১০ সাল পর্যন্ত তিনি এ বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এমফিল ও পিএইচডি থিসিসের বিষয়বস্তু ছিল যথাক্রমে ‘বাংলাদেশ-সোভিয়েত ইউনিয়ন রিলেশনস ১৯৮০-১৯৯০’ ও ‘বাংলাদেশ-ভারত রিলেশনস ১৯৭১-২০০০’। কর্মজীবনের শুরুতে বিআইডিএসের রিসার্চ অফিসার হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের আজীবন সদস্য। দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাময়িকীতে তার ২৫টির বেশি গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তার হুবহু তুলে ধরা হলো-

বলা হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি ভালো সময় পার করছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই।

ভারতের সঙ্গে আমাদের যে ধরনের সম্পর্ক বিরাজ করছে, তেমনটা আগে ছিল না। তাই বলব, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের একটি ভূমিকা ছিল। শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি তারা অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে ভারত। সেই সুবাদে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সবসময় ভালো থাকা উচিত। যদিও মাঝেমধ্যে এ ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। কিন্তু বর্তমানে ভারতের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। তাছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে এবং তার গৃহীত পদক্ষেপের কারণে ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ফারাক্কা বাঁধ সমস্যার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। ভারতের সঙ্গে যে সমস্যাটা আমাদের দীর্ঘদিনের। ভারতের তরফ থেকে পানি না ছাড়ায় আমাদের দেশের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলো খরাপ্রবণ হয়ে উঠছিল। আমরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলাম। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর আমরা ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করি, যার সুফল আমরা এখনো ভোগ করছি। একসময় বলা হতো, বাংলাদেশ শুকিয়ে যাবে, রাজশাহী অঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাবে কিন্তু চুক্তি হওয়ার পর আমরা অনেকটাই সে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। কাছাকাছি সময়ে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরো একটি চুক্তি করেন, তা হলো— পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বড় অঞ্চল। অভিযোগ ছিল, সে সময় ভারত থেকে ওই অঞ্চলের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিত। আমাদের সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য ওই এলাকায় নিহত হয়েছেন। শরীরের কোনো অংশে ব্যথা থাকলে সারা শরীরেই কিন্তু এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। তেমনি বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের একটি অঞ্চলে যদি সমস্যা থাকে, তাহলে পুরো রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রধান করে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ওই সমস্যার সমাধান করেছেন। তার পর থেকে পার্বত্য অঞ্চলে অনেকটা শান্তি বিরাজমান। পরবর্তীতে আবার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি আরো কিছু সমস্যার সমাধান করেন। এর মধ্যে একটি সমুদ্রসীমাবিষয়ক সমস্যা। এদিকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর সমস্যাটি ছিল ছিটমহলসংক্রান্ত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে ছিল বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল। এর বাসিন্দারা ছিল রাষ্ট্রীয় সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেখানে কোনো স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল ছিল না। ওখানকার বাসিন্দারা নাগরিক কোনো সুযোগ-সুবিধাই পাচ্ছিল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় সংবিধান সংশোধন বিল পাস করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ৩১ জুলাই রাত ১২টায় সীমান্ত চুক্তি কার্যকর হয়। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের ৪৪ বছরের ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়। এতে ছিটমহলের বাসিন্দাদের দুর্বিষহ জীবনের অবসান ঘটে। ছিটমহল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান বর্তমান সরকারের বড় প্রাপ্তি। যেকোনো সমস্যা তৈরি হওয়া সহজ কিন্তু এর সমাধান কঠিন। যেমন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যাটা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে নিজ ভূমিতে সামরিক হামলার মুখে রোহিঙ্গারা ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তখন বিষয়টি সাময়িক মনে করা হলেও তা একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। মাঝখানে নানা কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে মিয়ানমার তাদের কিছু শরণার্থী ফিরিয়ে নিলেও বিভিন্ন ঘটনায় তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে মারাত্মক মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। কাজেই সবসময় নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে কিন্তু এর সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে। সরকার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। আমরা জানি, তিস্তা চুক্তিটি এখনো বড় ধরনের সমস্যা হয়ে রয়ে গেছে, যদিও কয়েকবার এটি সমাধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। এখনো আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে চাপ দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এ সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।

আসামে বাঙালিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে বলে এক ধরনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আসলে যেকোনো দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার এবং থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে দেশ থেকে তিনি সব অভিবাসীকে বিতাড়িত করবেন। এটা করা কি সম্ভব হয়েছে? বর্তমানে ভারতে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নীতিটা কিন্তু কংগ্রেসের চেয়ে ভিন্ন। কংগ্রেস ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারণ তারা তাদের নীতিতে অসাম্প্রদায়িক। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে অনেক সময় অনেক ধরনের স্লোগান তোলে। বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, আমরা বাংলাদেশীরা কিন্তু শঙ্কিত ছিলাম, এবার বোধহয় ভারতীয় মুসলমানগোষ্ঠীকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। আমার জানামতে, একজন ভারতীয় মুসলমানও বাংলাদেশে আসেনি। আসামে বাঙালিদের তালিকা তৈরি করা নিয়ে সেখানকার অনেক রাজনৈতিক দলই সোচ্চার। অনেকের ধারণা ছিল, এক্ষেত্রে কংগ্রেস মুখ খুলবে না; কারণ তাদের এখানে ভোট কমার আশঙ্কা রয়েছে। এ ইস্যুতে তারা চুপ থাকেনি।

ভারতের সেনাপ্রধান মন্তব্য করেছেন, ভারতকে অস্থির করতে পাকিস্তান ও চীন একাট্টা হয়ে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের আসামে ঢোকাচ্ছে। সেনাপ্রধানের এ উক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে কি?

এটি কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ ভারতের রাজনৈতিক দল রয়েছে, সরকার রয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রয়েছে। প্রয়োজনে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনোভাবেই সেনাবাহিনীর প্রধান কথা বলতে পারেন না। কারণ এটা সেনাবাহিনীর এখতিয়ারবহির্ভূত। ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান তার নিজের স্বার্থে এটা করেছেন। তিনি হয়তো ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদানের উদ্দেশ্যে এটা করেছেন। এর আগেও ভারতের এক সেনাপ্রধান রাজনীতিতে এসেছেন, তিনিও হয়তো তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন বলে ঠিক করেছেন। তাছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের বড় ধরনের তফাত আছে। মিয়ানমারে যেমন সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখছে, ভারতে কিন্তু তা নয়। এখানে সরকারই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া ভারতের সেনাবাহিনী প্রধানের ভাষ্য সরকারের পক্ষ থেকে সমর্থন করা হয়নি। তাই তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ক্ষমতাসীন দল এবং আমাদের দেশের বর্তমান সরকার তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনবে না। কাজেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে না। ২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটকের ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে ছেদ পড়ার কথা ছিল। কারণ চালানটি ভারতের আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) কাছে যাওয়ার কথা ছিল বলে মনে করা হয়। তার পরও পারস্পরিক সম্পর্কে তেমন প্রভাব পড়েনি; বরং ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সম্পর্কের ক্রমোন্নতি হয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনী প্রধানের কথার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার আরো বেশি সজাগ হবে যেন মাঝখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ এসে এ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। ভারত ও বাংলাদেশের সামনে জাতীয় নির্বাচন। তাছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো এক ধরনের স্বস্তি বোধ করে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই সন্দিহান ছিল, তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বস্তি বোধ করবে কিনা। সে সন্দেহের অবসান ঘটেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকার তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকানদের সমর্থন আমরা পাইনি কিন্তু বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট আমাদের পক্ষে ছিল। অথচ ভারতের সব রাজনৈতিক দলই দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সমর্থন জুগিয়েছিল। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ঐতিহাসিক। আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস না করলে তা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

রোহিঙ্গা সমস্যায় আমরা ভারতের সমর্থন পাইনি। ভবিষ্যতে আসাম ইস্যুতে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা থেকে যায় কি?

মিয়ানমারের সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যেকোনো দেশ তার অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আর এটিই বাস্তবতা। তাই শুরুতে ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরব থেকেছে। তবে এখন কিন্তু তারা অতটা নির্বিকার ভূমিকায় নেই। আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু এবং আসামের বাঙালি ইস্যু দুটো আলাদা। আসামের নির্বাচন ঘিরে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে সেখানে বিজিপি নেতাদের জয়লাভের কৌশল এটা।

মিয়ানমার যখন তাদের দেশের রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরি করে, তখন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো কথা বলেনি। শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আসামও এখন বাঙালিদের তালিকা তৈরি করছে। পরবর্তীতে তাদের যে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে না, এর কী নিশ্চয়তা রয়েছে?

এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই নেতিবাচক হবে। পরস্পরের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস খণ্ডিত হবে। আমার মনে হয়, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে তেমনটা ঘটবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, আসামের বাঙালিদের যদি বিতাড়িত করা হয়, তিনি তাদের আশ্রয় দেবেন। ভারতের অভ্যন্তরেই কিন্তু এ ইস্যুতে প্রতিবাদ হয়েছে। তাই আসাম ইস্যুতে রাজ্য সরকার কোনো একক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ভারতের সঙ্গে আমাদের কোস্টাল শিপিং চুক্তি রয়েছে। এতে ৪০ শতাংশ ট্যারিফ ছাড় পাচ্ছেন না বাংলাদেশের জাহাজের মালিকরা—

১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে এক ধরনের ভূমিকা রাখা হয়। ট্যারিফসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে করতে পারি, আবার সার্ক সম্মেলনেও এটি উত্থাপন করতে পারি। এখানে দুই দেশের স্বার্থের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে সমস্যা ছিল। আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়ে আমরা ওই সমস্যার সমাধান করেছি। এক্ষেত্রে আমরা একই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় উদ্যোগী হন, তাহলে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কারণ এর থেকেও অনেক জটিল সমস্যার সমাধান আমরা করেছি। এক্ষেত্রে দুটি দেশেরই রাজনৈতিক নীতিতে স্থির থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষের সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি রয়েছে। এমনকি নদীবিষয়ক কমিটি রয়েছে। কিন্তু এ কমিটিগুলো কাজ করছে না। এটা কীভাবে কার্যকর করা যায়?

আসলে একটা দেশের সরকারপ্রধানের পক্ষে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা সম্ভব নয়। তাই বলব, নদীবিষয়ক কমিটি যে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন, সে মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আপনার পরামর্শ কী?

বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনৈতিক রাষ্ট্র। বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষ করে ইউরোপে আমাদের বাজার রয়েছে। আমরা যদি মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করতে পারি তাহলে অন্যরা আমাদের পণ্য নিতে বাধ্য হবে। ইউরোপের চেয়ে ভারতে পণ্য পাঠানো আমাদের জন্য সহজ, খরচও কম। ভারতের সঙ্গে পরিবহন খরচ কমানোর জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সড়কপথে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে ভোজ্যতেল পরিবহন শুরু হয়েছে। আমরাও এ ধরনের সুযোগ গ্রহণ করতে পারি। ভারতকে সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে আমরা তাদের কাছ থেকেও সুবিধা গ্রহণ করতে পারি।

পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসিয়েছে ভারত। এতে কি বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না?

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও পাট উৎপাদন হয়। আমার জানামতে, ভারত একসময় বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করত না। তবে বাংলাদেশের পাটের মান ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে। ২০১০ সালে দেশী পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন মাকসুদুল আলম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জুট জেনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী। কাজেই আমাদের পাটের মান আরো উন্নত হয়েছে। সেই সুবাদে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের পাট আমদানি করতে তারা বাধ্য। তবে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের বিষয়গুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের আলোচনা করা উচিত। বারবার এ ধরনের ব্যারিকেড দিলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হই, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেকোনো রাষ্ট্রই তার অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর রাজনীতিতে চিরশত্রু-চিরমিত্র বলে কিছু নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপান-আমেরিকার যে সম্পর্ক ছিল, এখন তার রূপ বদলেছে। আবার ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমরা আমেরিকা-চীনের সমর্থন পাইনি। রাশিয়া-ভারত আমাদের পক্ষে ছিল। এখন কিন্তু আবার চীনের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে ছেদ পড়েছে। আবার দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে ভারত ও চীনের। তাই দেখা যায়, আমরা যখন চীনের সঙ্গে যৌথ কোনো কার্যক্রম শুরু করি, তখন ভারত ক্ষুব্ধ হয় আবার ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক চীনের অসন্তোষের কারণ হয়। বড় রাষ্ট্রের পাশে যদি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র থাকে তাহলে তাকে এ ধরনের বিষয় মানিয়ে চলতে হয়। আমরা একপেশে নীতি নিয়ে চলতে পারব না। বিশ্বায়নের যুগে তা সম্ভবও নয়। ২০১৫ সালের জুনে চীনের অর্থায়নে কক্সবাজার শহরের অদূরে মহেশখালী দ্বীপের সঙ্গে লাগোয়া সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন ও বাংলাদেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত অসন্তোষ প্রকাশ করায় তা বাতিল হয়ে যায়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অনেক কিছু হিসাব করে চলতে হয়। আমরা ইচ্ছা করলেই ভারত কিংবা চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি না। তবে এত কিছুর পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোচ্ছে। এক্ষেত্রে আমি আমাদের সরকারকে সফল মনে করি।

চীন ও ভারত বিষয়ে আমাদের ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে? এক্ষেত্রে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগ কোনো প্রভাব ফেলবে কি?

বিশ্বায়নের পৃথিবীতে যুদ্ধ করতে গেলে স্থলযুদ্ধের চেয়ে বিমান আর পারমাণবিক যুদ্ধই বেশি হবে। একসময় ইউরোপে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ হয়েছে। এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি শান্তিপূর্ণ। তাই চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগের নিশ্চিত একটা সুফল তো রয়েছেই। আর এটা সম্পন্ন হলে আমরা সহজেই অন্য দেশের বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। এশিয়ায় চীন দুটি ইকোনমিক করিডোর সৃষ্টি করছে। একটি কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। দ্বিতীয়টি চীনের জিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ। এ অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের নাখোশ হওয়াটা ঠিক হবে না। কারণ এটা করা হলে এ অঞ্চলের উন্নতির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো উচ্চপর্যায়ে নিতে কী করণীয়?

দুটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্বল্পসময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে তাদের সমর্থন দান। ফিলিস্তিনের লড়াই শুরু হয়েছে অনেক আগে। ফিলিস্তিন এখন পর্যন্ত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। কাশ্মীরের সমস্যার শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি নয় মাস যুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের দেশের মানুষ মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ওই সময় ভারত আমাদের আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে জাপানে আমেরিকা পারমাণবিক বোমা হামলা করে, পরবর্তীতে সে জাপানের অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে আমেরিকাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপানের কিন্তু কোনো পারমাণবিক শক্তি নেই কিন্তু আমেরিকাকে জাপানের নিউক্লিয়ার আমব্রেলা বলা হয়। পৃথিবীর অনেক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নেপথ্যে বড় রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের বড় বাজার রয়েছে ইউরোপে। পোশাক ও জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। একে আমাদের অর্থনীতির উদীয়মান শক্তি বলা হয়। তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের কূটনৈতিক নীতির পরিবর্তন হয়। এর আগে খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় এসেই বলছিল, তারা ‘লুক ইস্ট’ পলিসি গ্রহণ করবে। সে আমলে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভাটা পড়ে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুসম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু এটা করতেও তো তার কিছু সময় প্রয়োজন হয়। আমাদের বৈদেশিক নীতির মূল বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে— সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। কাজেই সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে জোর দেয়। বর্তমানে মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের অস্বস্তি আছে। পরবর্তীতে প্রতিবেশী কোনো বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে যদি আমরা সমস্যা তৈরি করি, তাহলে আমাদের সমস্যা হবে; বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে কীভাবে কাজ আদায় করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রতিপাদ্য ছিল— বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ এ অঞ্চলের সাতটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। ভারত, নেপাল, বাংলাদেশের সঙ্গে যদি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়, তাহলে নেপালের যে পানির জলাধার আছে, তার মাধ্যমে ভারতের পাশাপাশি আমরাও উপকৃত হব। এখানে ভারতকে আরো উদার হতে হবে। বড় রাষ্ট্রকে প্রতিবেশী ছোট দেশকে ছোট ভাইসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হয়। ভারত যেহেতু আয়তনে ও জনসংখ্যায় আমাদের চেয়ে অনেক বড় রাষ্ট্র, তার মনমানসিকতা উদার হতে হবে। তাতে আমাদেরও উপকার হবে, তাদেরও উপকার হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল যদি মৈত্রী চুক্তি হয়, তাহলে পানির সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান হবে। এর সুফল ভারতের জনগণও পাবে, বাংলাদেশের জনগণও ভোগ করবে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের প্রতিটি দেশই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। আন্তঃনির্ভরশীলতার এই যুগে যুদ্ধ নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতাই পারে উন্নয়নের সুফল ভোগ করাতে। কাজেই ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ এ অঞ্চলের সব জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আবার কোনো কারণে যদি ভারতের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আমরাও কিন্তু তার কুফল ভোগ করব। বিশ্বায়নের যুগে এসে সুসম্পর্কের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেবল একটি দেশ নয়, এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো কীভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে, তার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান অনেক বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। তিস্তা চুক্তি ও কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি ছাড়া তেমন কোনো অসম্পন্ন চুক্তি আছে বলে তো দেখি না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মনমোহন সিং সরকার উভয়েই তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। কিন্তু আমরা সবাই জানি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অনাগ্রহের কারণে এটি সম্ভব হয়নি। তাই আমি বিশ্বাস করি, সময়ের ব্যবধানে একদিন তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন হবে এবং সেখানে ভারতের সর্বদলীয় সমর্থন থাকবে। (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে সংগৃহীত)

এবিএন/সাদিক/জসিম

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত