বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫
logo
feb18  
  • হোম
  • মিডিয়া
  • ‘বাংলাদেশের কর্পোরেট এবং মিডিয়া জগতে নারী অনেক সম্মান পায়’

‘বাংলাদেশের কর্পোরেট এবং মিডিয়া জগতে নারী অনেক সম্মান পায়’

‘বাংলাদেশের কর্পোরেট এবং মিডিয়া জগতে নারী অনেক সম্মান পায়’

ঢাকা, ০৭ ফেব্রয়ারি, এবিনিউজ : বাংলাদেশে পাবলিক রিলেশনস্‌ বা পিআর এখনো পুরোপুরি একটি পেশাদার শিল্পে পরিণত হয়নি। আর এই উঠতি খাতে নারী নেতৃত্ব এখনো বিরল একটি ঘটনা। যে কয়জন নারী এই পেশায় জায়গা করে নিতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমপ্যাক্ট পিআর-এর প্রধান নির্বাহী সাবরিনা জামান।

তবে মিস জামান মনে করেন না যে, গণসংযোগ বা পাবলিক রিলেশনস্ খাতকে 'পুরুষ-শাসিত' বলা ঠিক হবে।

'পিআর খাত এখনো খুব ছোট, এটা যে খুব স্থিতিশীল অবস্থায় আছে, তাও আমি বলবো না। এই শিল্প 'পুরুষ-শাসিত', সেটা বলা ঠিক হবে না,'' মিস জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন।

সাবরিনা জামানের সাথে কথা হচ্ছিল লন্ডনে বিবিসি স্টুডিওতে। সাক্ষাৎকারের বড় একটি অংশ জুরে ছিল তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে পেশাগত জীবনে নারীদের অবস্থান।

শুরুতেই কথা হয় নারী হিসেবে পাবলিক রিলেশনস্‌-এর মত জায়গায় কাজ করা কতটা কঠিন বা সহজ, সে বিষয়ে।

প্রচলিত ধারণার সাথে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে সাবরিনা জামান বলেন, একজন মহিলা হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করার অনেক এডভান্টেজ আছে।

''আমাদের দেশে মানুষ নারীকে অনেক সম্মান দেয়। আমি কর্পোরেট দুনিয়াতে সেই সম্মানটা পাই। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মিডিয়ায় নারী-পুরুষ ভেদাভেদটা খুব কম,'' তিনি বলেন।

তিনি আগেই বলেছেন, পিআর খাতকে পুরুষ শাসিত বলা ঠিক হবে না। তাহলে এই পেশায় নারীরা কি আসছে? এই প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর ছিল না।

''আশা করি আরো অনেক বেশি হবে। এই পেশা কাজ করার একটা সুন্দর জায়গা, তাই আমি চাই আরো বেশি নারী আসুক,'' তিনি বলেন।

মিস জামানের কোম্পানি ইমপ্যাক্ট পি পিআর-এ ২৫ জন কর্মীর মধ্যে পাঁচজন নারী। তিনি এই সংখ্যাকে 'অনেক আশাব্যঞ্জক' হিসেবেই দেখছেন, কারণ বাংলাদেশে মেয়েদের চাকরীর বাইরে আরো অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়।

''আমার এক কলিগ বলছিলো, আমরা আমাদের সংসার, বাচ্চা, বাবা-মা সবাইকে সাথে নিয়েও যে এত পারফর্ম করতে পারি, সেগুলো না থাকলে আরো কত পারফর্ম করতে পারতাম, সে প্রশ্ন থেকেই যায়,'' তিনি বলেন।

''আমরা যারাই প্রফেশনাল ক্যারিয়ারে এসেছি নারী হিসেবে, আমাদের কিন্তু ঐ জায়গাগুলোতে কিছু আপোষ থাকলেও, কিছু দেখা-শোনা করতে হচ্ছে। আপনার ছেলে-মেয়ে খাচ্ছে কি না বা স্কুলে যাচ্ছে কি না, সেগুলো আমরা ইগনোর করতে পারি না,'' তিনি বলেন।

সাবরিনা জামান ইমপ্যাক্ট পিআর-এর সাথে আছেন প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। তার মধ্যে আট বছরেরও বেশি সময় তিনি প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন। পুরুষ কর্মীরা কি একজন নারীকে তাদের বস হিসেবে সহজে মেনে নিয়েছিল?

তিনি বলেন প্রথম দিকে বয়স একটা ফ্যাক্টর ছিল এবং কিছুটা ধাক্কা খেতে হয়েছিল। তবে ধাক্কাটা সামলে উঠতে বেশি দেরী হয়নি।

''চ্যালেঞ্জটা ছিল মূলত মানুষকে বোঝা এবং মানুষের মানসিকতাটা বোঝা। একেকজন কলিগের সাথে যোগাযোগ ছিল একেক রকম,'' তিনি বলেন।

মিস জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তখন তিনি ভাবেননি যে পাবলিক রিলেশনস্‌ হবে তার পেশা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে তিনি তার সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তার ধারণা ছিল এই বিষয়ে পাস করতে খুব একটা পড়া-শোনা করতে হবে না, খবরের পত্রিকা পড়াটাও এখানে সহায়ক হবে (তবে এখানে বলে রাখা ভাল, যারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ডিগ্রি নিয়েছেন, তারা এই কথা শুনে মোটেই খুশি হবেন না যে, আই আর একটি সহজ সাবজেক্ট!)

সাবরিনা জামান অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যে তিনি আই আরকে 'সহজ' বলছেন না, তবে অর্থনীতি বা ল'র চেয়ে বেশি 'আরামের' বলছেন।

আইআর পড়তে গিয়ে মিস জামান দেখলেন যে তিনি বেশ বাক পটু।

''ওখানে পড়া-শোনা করে যেটা বুঝলাম, আমি খুব কথা বলতে পছন্দ করি এবং মানুষ আমার কথা শুনতেও পছন্দ করে। কাজেই, মার্কেটিং, সেলস এসব জায়গাতেই আমার চলে যাওয়া উচিত,'' তিনি বলেন।

তবে পর্যটন, হসপিটালিটি বা সেলস-মার্কেটিং জগতে মিস জামানের প্রবেশ হয় বেশ ছোট-খাটো একটি চাকরী দিয়ে।

''আমি যখন মাস্টার্স পরীক্ষা দেই তখন পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখি, ডাচ এয়ারলাইন্স কেএলএম তাদের সেলস টিমে লোক নেবে। সেখানে আমি ইন্টারভিউ দেই এবং চাকরিটা পাই।

''বাংলাদেশে কেএলএম-এর অপারেশন বেশ ছোট ছিল এবং তাদের সেলস আর মার্কেটিং একই টিম করতো,'' তিনি বলেন।

সেখানেও মিস জামান দেখলেন তিনি সহজেই তার কথা মানুষকে পৌঁছে দিতে পারছেন, এবং বুঝলেন গণসংযোগের পেশাটাই তার জন্য উত্তম হবে।

সাবরিনা জামানের বাবা ব্রিটেনে পড়া-শোনা করতে এসেছিলেন। তিনি ডাক্তার ছিলেন এবং ব্রিটেনে দশ বছর বাস করেছিলেন। পড়া-শোনা করে তার বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের দেশে বড় করবেন বলে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলেন।

''আমরা বাংলাদেশেই বড় হয়েছি,'' তিনি বলেন।

সাবরিনা জামান পরবর্তীতে ব্রিটেনে আসেন মার্কেটিং, কমিউনিকেশন এবং হিউম্যান রিসোর্স বা এইচ আর নিয়ে পড়াশোনা করতে।

ইমপ্যাক্ট পিআর-এর মালিকদের একজন, এম শামসুর রহমানের সাথে তার আগেই পরিচয় ছিল। মিঃ রহমান তখন বাংলাদেশে বিদ্যমান পিআর থেকে ভিন্ন একটি কনসেপ্ট নিয়ে আসার কথা ভাবছিলেন।

''আমরা এই নিয়ে অনেক কথা-বার্তা বলছিলাম। আমি খুব ইন্সপায়ার্ড ছিলাম যে এরকম একটা শিল্প বাংলাদেশে আসবে। কারণ, অনেক বিজ্ঞাপন সংস্থা আমাদের বলেছিল যে শিল্প হিসেবে পিআর-এর কোন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে নেই।

''আমার কাছে এটা বড় চ্যালেঞ্জ মনে হলো। আমি আমার বন্ধুকে বললাম বেতন না দিতে পারলেও আমি এখানে কাজ করতে চাই, কারণ আমি এই লাইনেই আসতে চাই,'' তিনি বলেন।

কিন্তু পাবলিক রিলেশনস্‌কে নতুন কনসেপ্ট বলা হচ্ছে কেন? বাংলাদেশে অতীতে প্রায় সকল সরকারী দফতর এবং অনেক বেসরকারি কোম্পানির নিজস্ব পাবলিক রিলেশনস্‌ অফিসার বা পিআরও ছিল। তফাৎ কোথায়?

সাবরিনা জামান বলেন, সরকারী বা বেসরকারি পিআরও-দের কিছু মৌলিক কাজ থাকে, যার ৯০ শতাংশ ইমপ্যাক্ট পিআর ও করে।

''সেটাও আমাদের মৌলিক পিআর কাজ। কিন্তু আমরা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখন আমরা প্রেস রিলিজ তৈরি করা বা পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখার চেয়ে শিল্প বা কনটেন্ট বা কৌশল নিয়ে বেশি কাজ করি,'' তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন।

''আমি যদি আপনার সাথে পাঁচ বছর আগে কথা বলতাম, তাহলে আমিও বলতাম আমরা খুব ভাল প্রেস রিলিজ লিখি, আমাদের আর্টিকেল সাংবাদিকরা খুব পছন্দ করেন।

''এখন আমি বলবো, আমরা স্ট্র্যাটেজি নিয়ে অনেক বেশি কাজ করি, দীর্ঘ মেয়াদী ব্র্যান্ডিং বা যেটাকে একটা কোম্পানির রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট বলা হয়, সেদিকে আমাদের মনোযোগ বেশি,'' বলেন মিস জামান যিনি নিজেকে একজন কমিউনিকেশনস কনসালটান্ট হিসেবে দেখেন।

পাবলিক রিলেশনস্‌ কাজে মিডিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু এখানে সাবরিনা জামানের ক্ষেত্রে একটি 'দ্বন্দ্ব' দেখা যাবার সম্ভাবনা থাকে। তাঁর স্বামী এম শামসুর রহমান একটি পত্রিকার সম্পাদক এবং একই সাথে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক। মিডিয়াতে স্বামীর এরকম প্রভাব এবং স্বার্থ থাকাটা কি সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?

''কোন কোন সময় দ্বন্দ্ব দেখা যেতে পারে, যেহেতু আমাদের দেশের মিডিয়া জগতে সবাই সবাইকে চেনে। কিন্তু সেখানেও ঐ বিষয় চলে আসে - আপনার কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি কী? আপনি তো একজন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করছেন, কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে না।,'' তিনি মনে করেন।

তাঁর মতে, একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনি যদি নিজের কাছে পরিষ্কার থাকেন, আপনি যদি জানেন আপনি যে কাজটি করছেন সেটার মধ্যে অপরিষ্কার কিছু নেই, তাহলে আপনার স্বামী কোথায় কাজ করেন, সেটা কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না।

''তবে তাঁর পরিচিতিটা আমার জন্য সহায়ক হয়েছে। তাঁকে চেনে বলে আমাকে অনেক সহজ ভাবে নিতে পেরেছে,'' বলেন সাবরিনা জামান।  সূত্র: বিবিসি বাংলা

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত