logo
বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮
 

সাংসদ ইউসুফ : নষ্ট রাজনীতির শুদ্ধ সততার প্রতীক

সাংসদ ইউসুফ : নষ্ট রাজনীতির শুদ্ধ সততার প্রতীক

অজয় দাশগুপ্ত, ১২ জানুয়ারি, এবিনিউজ : হাসান ফেরদৌস খুঁজে পেয়েছেন তাঁকে। আমরাও পেয়েছিলাম এক সময়। তারপর ভুলে গেছি। আমরা ভুলে গেলে কোন সমস্যা ছিলো না। সমস্যা হয়েছে রাজনীতি ভুলে যাওয়ায়। কারণ এখন যারা রাজনীতি করেন যারা কোনভাবে সাংসদ বা তেমন কিছু হতে পারেন তাদের পকেটে থাকে চেক বই। আর সে চেক কত অংকের হতে পারে আমাদের ধারণায়ও তা নাই। যারা উপজেলা বা স্থানীয় পরিষদে আছেন তাঁদের দাপটেই টেকা দায় আর এতো এমপি। বাংলাদেশে একবার যাঁরা সাংসদ হয়েছেন বা হতে পেরেছেন আর্থিকভাবে তাঁদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অচিরে হবারও সম্ভাবনা নাই। সেদিক থেকে সৎ বা দরিদ্র সাধারণ এম পি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাস্তবে দুরবিন দিয়ে দেখেও পাওয়া যাবেনা। সে সমাজে একজন এম পি রোগে কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করে আজ সংবাদ শিরোনাম।

তাঁকে দু কারণে স্যালুট দিতেই হয়। প্রথমত তিনি যদি ছিঁটেফোঁটা কামাই বা রোজগারে থাকতেন তাঁর এই হাল হতোনা। শেষত তিনি কারো হাতে পায়ে ধরলেও এই বাস্তবতায় পড়তেন না। যার মানে তিনি সৎ আর আপসহীন। যে রাজনীতিতে তাঁর হাতে খড়ি যে রাজনীতি করে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন সেই বামদের আদর্শই ছিলো তা। তাঁদের জীবন ছিল ভাঙলেও মচকাবেনা। সেই নামচকানোর দায়ে আজ তিনি হতদরিদ্র এক রাজনীতিবিদ। আমার বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের মারফত জানলাম শেষ জীবনে ভাইয়ের চায়ের দোকানের উপার্জনে জীবন নির্বাহ করতেন সাংসদ ইউসুফ। এই ক দিন আগেও আমি যখন চট্টগ্রামে প্রাক্তন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর কুলখানিতে এক ডজনের ওপর হল ভাড়া করে ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। সে কি রমরমা। সে আয়োজনের পরিণতিতে করুণ বিয়োগান্তক ঘটনাও দেখেছি আমরা। কিন্তু তখনো কেউ জানতোনা মহিউদ্দীন চৌধুরী যেবার হেরেছিলেন সেবার প্রতাপের সাথে জিতে আসা একজন সাংসদ খাবার দাবার ও রোগকষ্টে ভুগে জীবন শেষ করছেন। এই যে বাস্তবতা এইযে অমানবিক আচরণ এটাই এখনকার রাজনীতি। কেউ কারো খবর রাখেনা। কারো সময় নাই পিছিয়ে পড়া বা কষ্টে থাকা কাউকে সামনে আনে। ধান্ধাবাজ নাহলে কোথাও টেকা যায়না দেশে। আজ মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়লেও কেউ জানতে চায়নি কেমন আছেন তিনি? খবরে দেখলাম রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ চেক কেটে দিচ্ছেন। হায়রে বদান্যতা। আপনি তো সে এলাকার সাংসদ। আপনি জানবেন না আপনার পূর্বসূরি কেমন আছেন? বিশেষত যিনি কঠিন সময়ে হাল ধরেছিলেন।

এটাই এখনকার বাংলাদেশ। ডিসেম্বরে মাত্র কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশে থাকার সুবাদে আমি দেখেছি মানুষ কতটা স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। যেকোনো উন্নত দেশের মানুষই স্বার্থপর। বিশেষত আপনি যদি কলকাতায় যান তো দেখবেন তারা স্বার্থের বাইরে এক পাও ফেলবেনা। পার্থক্য এই তাদের স্বার্ধপরতার ভেতর একধরনের দেয়া নেয়া আছে। কেউ দেয় কেউ নেয় যার কারণে কাজ হয়ে যায়। দেশে দেখলাম সব একতরফা। সবাই নেবে দেবার মানুষ এত কম দুরবিন দিয়ে খুঁজেও পাবেননা। এই স্বার্থপর সমাজ সাংসদ ইউসুফের খবর রাখেনা। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কি বলুনতো? আওয়ামী লীগের অত্যাচারী নেতারা। তারা অবশ্য বলেন এরা নামধারী। নামধারী হোক আর কামধারী হোক এরা দেশের মানুষকে কিভাবে বিরক্ত করছে আর মানুষ কতটা রেগে আছে সেটা নির্বাচন এলেই বোঝা যাবে। চাঁদা টেন্ডার দলবাজী সবার ওপরে দুর্ব্যবহার। এসব মিলিয়ে মানুষ আছে মহাবিরক্তিতে। রাতারাতি এত আওয়ামী লীগ এত বঙ্গবন্ধুপ্রেম আর এত নেতা আগে দেখিনি। এ প্রবণতা মারাত্মক। এই অপব্যবহার দলকে ছেড়ে কথা বলবেনা।

তারচেয়েও ভয়ংকর শেখ হাসিনার ইমেজ ও ভাবমূর্তির ব্যবহার। বাহ্যত তাঁর কাছে না যাওয়া অবধি কোন সমস্যার সুরাহা হয় না। আমার যদি সে সুযোগ থাকতো আমি তাঁকে বিনয়ের সাথে বলতাম কিছু কিছু বিষয়ে না বলতে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় মানবিক বিষয়গুলো ও তাঁর কাছে যাবার আগে মানবিক হতে পারছেনা। চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর মৃত্যুর পর এতগুলো কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে মেজবান খাওয়ানোর কি দরকার ছিলো? কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন করেনি। যখন মানুষগুলো পায়ের তলায় পড়ে মারা গেলো দেখলাম জনমত ভাগ হয়ে গেলো। কেউ বলছিলো ষড়যন্ত্র, হিন্দুদের মারার। এইসব পাগলেরা সবাই আবার আওয়ামী লীগার। কেউ বলছিলো ঠিক হয়েছে। আর কারো মতে এমন ঘটনা অপরিকল্পনার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিন্তু কিছুই কিছু না যে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালেন। এটা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবেদনশীলতা আর মানবিকবোধ সবার জানা। তিনি নরম মনের পরিচয় বহুবার দিয়েছেন। এবারও তাই। কিন্তু সবকিছু তাঁর প্রতিক্রিয়ার পর হবে এটা কোন ধরনের মানসিকতা? আজ যখন তিনি ইউসুফের পাশে দাঁড়িয়েছেন অমনি বদান্যতার প্রতিযোগিতা চালু হয়ে গেছে। একা তিনি যতটা সামাল দিচ্ছেন ততটাই দুর্গ। বাকীটা কিন্তু খোলা মাঠ। আর সে মাঠে গোহারা হারবে সরকারি দল।

ইউসুফ এম পি একসময় বাম দল করতেন। ৮৬ সালে বাম টিকেটে দাঁড়িয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে জিতেছিলেন জোটের হয়ে। সে নির্বাচনে আমরা ভেবেছিলাম নৌকা জিতবে। বহুকাল পর আওয়ামী লীগ আসবে ক্ষমতায়। হয়েছিল উল্টো। এরশাদ পতনের পর বিপুল বিজয়ে বিএনপি এলো দেশশাসনে। সেই নির্বাচনের পর জননেত্রী শেখ হাসিনার সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ বিতর্কে কামাল হোসেনের মত নেতাও ছিটকে পড়লেন দল থেকে। অথচ বামদল থেকে আসা ইনি ছুটলেন না। এর কৃতিত্ব আপনি কি দিয়ে মাপবেন? মহাশক্তিধর একদা অপরাজিত দাম্ভিক রাজাকার সা কা চৌধুরীকে হারিয়ে এম পি হওয়া মুখের কথা? বাঘা বাঘা আওয়ামী নেতারা যখন লেজেগোবরে তখন রাঙ্গুনিয়া থেকে জিতে আসা ইনি আওয়ামী লীগে থাকলেও সহজ জীবন আর আদর্শবোধে অবিচল থাকায় আজ প্রায় ভিখারীর মত হয়ে চোখে পড়লেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

এই ভদ্রলোক প্রমাণ করলেন সততার পুরস্কার আজ নিঃস্ব আর ভিখারী হওয়া। আমার মনে হয়েছে এম পি ইউসুফ একটি প্রতীক। দেশ ও সমাজের এক পোস্টমর্টেম। যারা অসৎ অসাধু ভণ্ড আর তেলবাজ তারা থাকবে তেলে ঝোলে। আর সৎ মানুষ এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরার আগে হয়তো এমন নিউজ আইটেম হয়ে সবার চোখে পড়বে। তখন দেশবাসী মরবে আত্মগ্লানিতে। মানুষ আঁতকে উঠে বলবে, বাবারে সৎ হবার কোন কারণ নাই। সৎ করার মন্ত্রণা বা পরামর্শ দিতে ভয় পাবে সন্তানদের। আর অসাধুদের ভেতর হিড়িক পড়ে যাবে দানবীর হবার। উদার হবার। আমরা দেখেও শিখিনা। পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখবো সেখানে চোর ডাকাতের পাশাপাশি বড় বড় নেতারা এখনো সরল সাদামাটা জীবনযাপন করছেন। এক লালু যাদব যেমন জেলে আরেক বাজপেয়ী নিজের চা নিজে বানিয়ে খান।

এখনো রাহুল হেলিকপ্টার চড়ে ভাড়া পরিশোধ করেন। আমাদের দেশেও এককালে ছিলো। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল. মাওলানা ভাসানী, মনি সিংহ. ফরহাদ বা কাজী দানেশদের জীবন ছিলো সরল। সে জীবনে তাঁরা ত্যাগ করেছেন নিজেদের কর্ম। তাঁদের ত্যাগের ফসল যে জন্মভূমি তার আগপাশতলা চেটেপুটে খাওয়া রাজনীতি ত্যাগ ভুলে ভোগে মত্ত। আপনি হিসেব করে দেখুন কজন রাজনীতিবিদ পাবেন যাদের রাজনীতির বাইরে আর কোন পরিচয় আছে?

রাজনীতি করতে আসা আর করার পর আঙুল ফুলে কলাগাছ হবার রাস্তা খুলেছিল জিয়াউর রহমানের আমলে। পরে এরশাদ তা প্রাতিষ্ঠানিক করে যান। আর এখন এর নাম সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের আওতায় যারা আছেন তারাই ভালো আছেন। বাকীদের হাল হকিকত বড় খারাপ।

ইনি প্রমাণ করে দিলেন সৎ ও সহজ মানুষেরা আজ অচল। তাঁদের জীবন মূলত শেয়াল ও শকুনের খাদ্য। মানুষ তাহলে কিসের জন্য সন্তানদের রাজনীতিতে পাঠাবে? আর রাজনীতি যদি না থাকে তো দেশ চলবে কিভাবে? সাংসদ ইউসুফ কিন্তু কঠিন একটা প্রশ্ন রেখে গেলেন জাতির সামনে। মুখে আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেও রাজনীতিতো লাগবেই। কি হবে সে রাজনীতির রূপরেখা?

মুখে মুক্তিযুদ্ধ দিলে পাকিপ্রেম সমাজে মধ্যপ্রাচ্য আর জীবনে হিন্দী সিনেমা? পকেটে টাকা ঢাকায় বাড়ি আর সময়মতো সিঙ্গাপুরে বা থাইল্যান্ডে যাওয়া? আদর্শ বা নিষ্ঠা এসব কি তাহলে আর থাকবেনা? যদি থাকেও যারা ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যত কি সাংসদ ইউসুফের মত পায়ে ঘা মুখে বেদনা নিয়ে বোকার মত বসে থাকা? তবু ভরসা তিনি আছেন। তিনি খবর রাখেন। ধন্যবাদ শেখ হাসিনা। তবে এটাও বলি,ধিক বাম রাজনীতি, ধিক আওয়ামী রাজনীতি। মানুষ এরপরও রাজনীতি করবে? কোন সুখে?

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত