মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫
logo
 

সন্তান লালন পালনের ব্যাকরণ

সন্তান লালন পালনের ব্যাকরণ

সাদেকা হোসেন, ০৯ জানুয়ারি, এবিনিউজ : ‘নিশাদ তার রুমের একপাশে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। রাতে খাবারটা দেয়া হয়েছে সেই কবে। বুয়া বার বার খেতে বলার পরও সে কোনভাবেই খাবার টেবিলে যাচ্ছে না। বিকেলে একটু দেরিতে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার কারণে মায়ের ছোট্ট একটি তীর্যক মন্তব্যে নিশাদ দারুন আঘাত পেয়েছে।’ উপরের দৃশ্যটিতে মায়ের সুক্ষ একটি ভ্রান্তি আমরা দেখতে পাই কিন্তু তার প্রভাব শিশু মনে হয়তো অনেক নেতিবাচক হতে পারে। মানব মনস্তত্ত্বের পরিভাষায়, বাবা মায়েরা সন্তানকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে ধরনের আচর আচরণ করে থাকেন তাকে ‘পেরেন্টিং’ বলা হয়। খুব যৌক্তিকভাবে মনোরোগবিদগণ এবং মনতত্ত্ববিদগণ ত্রুটিপূর্ণ পেরেন্টিং এর ব্যাপারে সজাগ থাকেন। কেননা গোলমালটা বাঁধে যখন সন্তানের প্রতি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে বাবা মায়েরা ত্রুটিপূর্ণ আচরণ বা মনোভাব প্রকাশ করেন। ত্রুটিপূর্ণ পেরেন্টিং ধরনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : অতিমাত্রায় যত্নশীলতা ((Over protective parenting), অপর্যাপ্ত দেখভাল (Neglected parenting), অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনোভাব (Disorganized parenting), শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব (Hostile parenting), কর্তৃত্বপরায়ন (Authoritarian parenting) মনোভাব ইত্যাদি। ঠিক তার উল্টোপিঠে আছে স্বাস্থ্যকর পেরেন্টিং বা Healthy Parenting। এক্ষেত্রে বাবা মায়ের মনোভাব থাকে স্নেহশীল ও বন্ধুতাপূর্ণ।

অতিমাত্রায় যত্নশীল বা রক্ষনশীল (Overprotective attitude) বাবা মায়েদের ক্ষেত্রে বাচ্চাকে সবসময় সবকিছুতেই বাধা দানের কিংবা খোকা খুকি বানিয়ে রাখার একটা প্রচেষ্টা থাকে। এক্ষেত্রে বাবা মা সবসময় নিজেদের পছন্দ মতো কর্মকাণ্ডেই তাকে নিয়োজিত রাখতে চান। ছোট্ট কোন বিষয়ে তাকে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ না দেয়া, বয়সের তুলনায় কম বয়সী ধরনের কাপড় পড়ানো, ছোটখাট বাড়ির কাজে অংশ নিতে না দেয়া কিংবা বয়স বাড়ার পরও তার সাথে ঘুমোতে যাওয়া, কি করছে না করছে তা বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা ইত্যাদি ত্রুটিপূর্ণ আচরণ বাবা মায়েরা করে থাকেন। ফলশ্রুতিতে শিশু যখন বেড়ে ওঠে তার মাঝে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সংশয়বাদী, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারা, অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা, অন্যদের সাথে মেলামেশা বা খেলাধূলায় অনাগ্রহ, স্বাধীনভাবে নিজের চেষ্টায় কাজ করতে না পারা ইত্যাদি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়।

আবার সন্তানের কর্মকাণ্ডের ব্যপারে একেবারে উদাসীনতা (Neglected/Inadequate parental supervision অপর্যাপ্ত তদারকি) ও অনেক পরিবারে দেখা যায়। সন্তান কখন বাইরে থেকে বাড়িতে আসবে, বাইরে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে তার অবসর সময় কাটাচ্ছে, তার বন্ধুর বাসা কোথায়, বন্ধুর নামটাই বা কি এসব তথ্যও অনেক ক্ষেত্রে বাবা মা জানেন না বা জানা প্রয়োজনীয় মনে করেন না। বাসায় বাবা মায়ের উদাসীনতা যেমন : বাচ্চার সাথে কথা না বলা, প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের ব্যপারে নীরব থাকা, বাচ্চার ইচ্ছা অনুযায়ী সবক্ষেত্রে সম্মতি প্রদান, বাচ্চার নেতিবাচক আচরণে সংশোধনী প্রদানে বিরত থাকা কিংবা সংশোধনী প্রদানে কোন ধারাবাহিকতা না থাকা। আর এসবের কারণে বাচ্চা হয়ে পরে উশৃংখল বেপরোয়া। নিয়ম মেনে না চলার প্রবণতা তার মধ্য দৃঢ় হতে থাকে। অসৎ সঙ্গে ধীরে ধীরে হয় সর্বনাশ। শেষ পর্যায়ে এসে নানাবিধ মাদকাসক্তি, অসামাজিক কার্যকলাপ ইত্যাদিতে সে জড়িয়ে পরে।

শিশুর কাজে প্রশংসা/উৎসাহ প্রদান না করা, তার কোন সাফল্যকে মূল্য না দেয়া, বাঁকা উক্তি করা, অতিথি/সবার সামনে অন্য কোন সমবয়সীর সাথে তুলনা করে কিছু বলা, শিশুকে শারীরিক মানসিকভাবে নিগৃহীত করা ইত্যাদি আচরণকে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব বা Hostile parental attitude বলে। এর ফলে বাবা মায়র সাথে সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, স্কুলের কর্মকাণ্ডে আশানুরূপ ফল না পাওয়া, যেকোন চাপ মোকাবেলা করতে না পারা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ত্রুটিপূর্ণ মনোভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি ধরণ হচ্ছে বাবা মায়ের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব (Authoritarian attitude)। এর মধ্যে– বাচ্চার উপর কোন নিয়ম জোর করে চাপিয়ে দেয়া, নিয়মের প্রাসঙ্গিকতা বা যৌক্তিকতা ব্যখ্যা না করা, নিয়ম পালনে বাধ্য করা, নিজেদের ভুল ভ্রান্তিমূলক আচরন স্বীকার না করা, বাচ্চার ইচ্ছার ব্যাপারে উদাসীন থেকে সর্বক্ষেত্রে ‘না’ বলার মানসিকতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যার ফলে শিশু ভীরু, চাপা স্বভাবের হয়। পরবর্তিতে তার আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল মনোভাব গড়ে ওঠে না।

স্বাস্থ্যকর পেরেন্টিং এর ক্ষেত্রে স্নেহময় মনোভাব বা Loving attitudeগুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে বাবা মা যা করেন তা হলো, সন্তানকে যথোপযুক্ত স্নেহ উষ্ণতা প্রদান, তার যেকোন প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া, চাপ মোকাবেলা করতে দেয়া ও চাপের মুখে সাহস দেয়া, তার সাফল্যে প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান। স্বাস্থ্যকর পেরেন্টিং এর আরেকটি দিক হচ্ছে, স্বাধীনচেতা মনোভাব বা Autonomous attitude এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তার বয়স অনুযায়ী কাজে তার মতো করে করতে ছেড়ে দেয়া, কোন সমস্যা হলে তা নিয়ে আলাপ করা আর কিভাবে সমাধান করা যায় তার দিকনির্দেশনা দেয়া, ভুল থেকে তাদের শেখার সুযোগ দেয়া, তাদেরকে নিজস্ব মতামত প্রদানে উৎসাহ প্রদান করা, তাদের বয়সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দিকনির্দেশনা দেয়া ইত্যাদি।

সন্তানের ভালো চান না এমন নিষ্ঠুর বাবা মা হয়তো এ পার্থিব জগতে খুব একটা পাওয়া যাবে না। তারা তাদের সমস্ত মেধা মনন আর হৃদয়ের নির্যাস নিংড়ে সন্তানকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তোলেন। কিছুটা অজ্ঞতা আর দ্রশুত লয়ের এ সময়ের যাপিত জীবনে সন্তানের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে সঠিক আচরণ করা হয় না। ফলশ্রুততে সন্তান বাবা মায়ের মাঝে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য দুরত্বের। ধীরে ধীরে এক সাথে একই ঘরে থেকেও সবাই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেন। শেষ পর্যায়ে দীর্ঘদিনে ক্ষয়িত ঠুনকো সামাজিক বন্ধন ঘিরে সৃষ্টি হতে থাকে নানা ধরনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যা।

আমরা সবাই জানি, প্রাকৃতিক নিয়মে রোদে জলেই প্রাণের সজীবতা। ভাবুন আপনার সন্তান ছোট্ট একটা সবুজ চারা গাছ, তাদের জন্য আপনার অর্থ উপার্জন বা নানান প্রচেষ্টা শেকড়ে জল ঢালার মতন। আর চারা গাছটার সহজাত বৃদ্ধির জন্য আপনার সঠিক পেরেন্টিং বা আচরণ সূর্যের আলোর সমার্থক। তাই প্রতিদিনকার জল ঢালার সাথে সাথে রোদটাও কিন্তু চাই।

লেখক : এসিস্টেন্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট।

(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত