মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫
logo
 
বার্তা সংস্থা এপি’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

স্বামীর সামনেই রোহিঙ্গা নারীদের নির্বিচারে ধর্ষণ!

স্বামীর সামনেই রোহিঙ্গা নারীদের নির্বিচারে ধর্ষণ!

ঢাকা, ১১ ডিসেম্বর, এবিনিউজ : রোহিঙ্গা নারীদের মিয়ানমারের সেনারা নির্বিচারে ও পদ্ধতিগতভাবে ধর্ষণ করতো। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ধর্ষণের শিকার ২৯ রোহিঙ্গা নারীর সাক্ষাৎকারের পর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

এক তাদের এক অসুন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কখনও সামনে স্বামীকে বেঁধে রেখে, কখনও আবার স্বামী-সন্তানকে হত্যার পর ধর্ষণ করা হয় ওই নারীদের। ধর্ষণের আগে-পরে রোহিঙ্গা নারীদের যোনিতে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও জানতে পেরেছেন এপির প্রতিবেদক। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত ২৯ রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে পৃথক পৃথক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের সংখ্যা বিস্মিত করেছে এপির প্রতিবেদককে। তবে নিজেদের অনুসন্ধান সম্পর্কে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অবস্থান জানার চেষ্টা করলেও তাদের কাছে কোনও সাড়া পায়নি এপি। এরআগে জাতিসংঘ এবং দুই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও গার্ডিয়ানের পৃথক তিন অনুসন্ধানে একইরকম বাস্তবতা উঠে এসেছিল।

মিয়ানমারের সেনাদের নিপীড়নের শিকার এসব রোহিঙ্গা নারী বেশ কয়েকটি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। পালিয়ে আসা এমন ২৯ জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে এপি। তাদের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। ২০১৬ অক্টোবর থেকে চলতি বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই নিপীড়ন চলে। পৃথকভাবে তাদের সাক্ষাতকার নেওয়া হলেও সবার ঘটনা প্রায় একই বলে জানায় তারা। প্রত্যেকেই নিজের নামের প্রথম অক্ষর বলতে রাজি হয়েছেন। এপি জানায়, রোহিঙ্গাদের ওপর ধর্ষণ ছিলো পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ।

এসব নারীদের প্রত্যেকের গল্পের ধরণ প্রায় একই। এদের ধর্ষকদের প্রত্যেকেই সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত ছিল। এদের অনেকের পোশাকে তারকা ব্যাজ ছিল, আবার কারো পোশাকে তীরের ব্যাজ ছিল। এর মানে হচ্ছে এসব ধর্ষক মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্য।

পুলিৎজার সেন্টার অন ক্রাইসিস রিপোর্টিংয়ের অর্থায়নে বিশেষ এই প্রতিবেদন তৈরি করে এপি। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বলে চিহ্নিত করেছে। রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগেই বসবাস এখন বাংলাদেশে। তাদের সঙ্গেই কথা বলেছে এপি। তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাদের আশঙ্কা এতে করে তাদের পরিবারকে খুন করতে পারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

‘এফ’ আদ্যাক্ষরের এক নারী জানিয়েছেন, জুন মাসের এক রাতে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি ও তার স্বামী। হঠাৎ মাঝ রাতে তাদের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে সাতজন সেনা। তখনই বুঝে যান কি ঘটতে চলেছে তার সঙ্গে। তার বাবা-মা ও ভাই খুন হয়েছে এই সেনা সদস্যদের হাতে। আর এবার আসলো তার জন্য। এসেই তার স্বামীকে বেঁধে ফেলে, মুখে কাপড় গুজে দেয়। অসহায় হয়ে পড়ে দুজনই। এরপর সংঘবদ্ধ ধর্ষনের শিকার হন ওই নারী। একইসঙ্গে চলতে থাকে বেত্রাঘাত। একটা সময় মুখের কাপড় ফেলতে চিৎকার করতে সক্ষম হয় তার স্বামী। কিন্তু তখনই সেনারা গুলি করেন। একজন কেটে ফেলেন গলা। আর ধর্ষণের পর তাকে বাইরে এনে পুড়িয়ে দেন বাড়ি। দুই মাস পর এফ জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী।

পরবর্তীতে ওই নারী এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তিন মাস পর পাঁচ সেনা ওই বাড়িতে হামলা চালায় এবং প্রতিবেশীনির সন্তান ও তার স্বামীকে হত্যা করে। এসময় তারা ওই প্রতিবেশীনি ও তাকে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে চলে যায়।

গাইনোকোলজিস্ট আরজিনা আখতার এই হত্যাযজ্ঞের ফল দেখেছেন। আগস্টের পর থেকে এত নারী তার হাসপাতালে আসতে শুরু করে যে তিনি ফর্ম পূরণ করতে না করেছেন। এতে করে দ্রুত চিকিৎসা করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।

কিন্তু এখনও অনেক রোহিঙ্গা বাচ্চা নিতে চাইছেন না বলে জানান আরজিনা। তবে ২৫ আগস্ট পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ধর্ষণের পর তার প্রতিবেশীরা ‘এফ’ এর সেবা করেছিলেন। তিন মাস পরেও তার দুর্দশা কাটেনি। তার বাড়ি পুড়ে গেছে। স্বামী মারা গেছে। পেটের সন্তান নিয়ে নিশ্চিত নন। তার চাওয়া ছিলো পরিস্তিতি যেন আর খারাপ না হয়।তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়। প্রতিবেশীর বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকার সময় সেনারা বাড়িতে হামলা চালায়। এবার ছিলেন পাঁচজন। ঢুকেই ৫ বছরের ছেলেকে জবাই করে সেনারা। হত্যা করে পুরুষকে। এরপর তার স্ত্রী ও এফ এ দিকে এগোতে থাকে সেনারা।

আবারও সেই দুঃস্বপ্ন শুরু হয় ‘এফ’ এর। দুইজন সেনা এফ এর পেট চেপে ধরে। অন্য নারী প্রতিরোধের চেষ্টা করলে তাকেও মারতে থাকে সেনারা। একটা সময় হাল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না তার। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন সে নারী। এরপর তাদের ফেলে চলে যায় হামলাকারীরা। মাটিতেই পড়েছিলেন তারা। ব্যাথা ও মানসিক যন্ত্রণায় উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও ছিলো না তাদের। কিন্তু একটা সময় জেগে উঠেন। দুই বন্ধু হাতে হাত রেখে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। খুড়িয়ে খুড়িয়ে যান পাশের গ্রামে। সেখানে পাঁচদিন থেকে তারপর যাত্রা করেন বাংলাদেশের পথে।

এর আগে জাতিসংঘ অভিযোগ করেছিল, রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধর্ষণকে ‘সন্ত্রাসের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বার্তা সংস্থা এপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। অবশ্য গত মাসে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করেছিল রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি।

সেনা কর্মকর্তা তিন্ত সোয়ে বলেছিলেন, রোহিঙ্গা নারীরা ধর্ষণের মতো আকর্ষণীয় না। তবে চিকিৎসক ও ত্রাণ কর্মীরা জানিয়েছেন তারা ধর্ষণের সংখ্যা দেখে বিস্মিত। মূল সংখ্যার অল্প কয়েকজনই হয়তো সামনে এসেছেন। মেডিসিন স্যানস ফ্রন্টিয়ার জানায়, তারা ধর্ষণের শিকার ১১৩ জনের চিকিৎসা করেছেন। তাদের এক তৃতীয়াংশই ১৮ বছরের নিচে। সবচেয়ে কম বয়সীজনের বয়স ৯ বছর।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত