logo
বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
bijoy
চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি

কিশোর অপরাধ রোধে প্রতিরোধ ও প্রতিকার : ভাবনা-চিন্তা

কিশোর অপরাধ রোধে প্রতিরোধ ও প্রতিকার : ভাবনা-চিন্তা

ডা. হাসান শহীদুল আলম, ০৫ ডিসেম্বর, এবিনিউজ : অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। নতুন ব্রীজ বাস টার্মিনাল। শহরের কাজ সেরে পটিয়া অভিমুখী বাসে উঠবো। উচ্চস্বরে ক্রন্দনধ্বনি কানে বাজলো। উৎস অনুসরণ করে ত্রিকোণাকার মোড়ের জটলাপানে তাকালাম। তের-চৌদ্ধ বৎসরের ছেলেটাকে সমানে পিটাচ্ছে হাতের লাঠি দিয়ে ত্রিশোর্ধ যুবক ট্রাফিক পুলিশ কর্মী। সূর্য থেকে বালির তাপ যেমন বেশী অনুভূত হয়, তেমন দেখা যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের চেয়েও ট্রাফিক পুলিশ কর্মীর (যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য বাড়তি নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশ কর্মী) হাঁকডাক বেশী। জটলার কাছাকাছি হয়ে যা জানলাম তার সারমর্ম হচ্ছে : ছেলেটি টেম্পো সহকারীর কাজ করে। যাত্রীর মোবাইল সেট চুরি করে হাতে নাতে ধরা পড়েছে।
যথারীতি বাসে উঠে বসলাম। ছেলেটার ক্রন্দনধ্বনি এখনও কানে বাজছে। ওর অসহায় মুখখানা মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। ছেলেটা চুরি করেছে কেনো? টেম্পো সহকারীর যৎসামান্য বেতনে তার কি পোষাচ্ছে না? মা-বাবার হাতে টাকাটা তুলে দিতে হয়? বাকীটুকুতে তার হাত খরচ পোষাচ্ছে না বিধায় সে চুরি করছে? আবার এমনও হতে পারে কোন গডফাদারের ছত্রছায়ায় থেকে টেম্পো সহকারীর চাকুরীর আবরণে সে মোবাইল সেট চুরির পেশায় নেমেছে? বয়স হিসেবে তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর বলা যায়। তাহলে তাকে কিশোর অপরাধী হিসেবে ধরা যায়।
বাস চলতে শুরু করেছে। আমি কিশোর অপরাধ সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লাম। প্রথমেই কিছু সংবাদচিত্র তুলে ধরছি। দেশের দুই কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী সেখানে থাকা কিশোরদের ২০ শতাংশ খুনের মামলায় আর ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামী। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বেশীর ভাগই ধর্ষণের অভিযোগে করা। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানু যায়ী কেন্দ্র দুটিতে ছিলো ৫৯৭ জন কিশোর। তাদের মধ্যে ১২০ জন হত্যা মামলার আসামী। ১৪২ জন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলা এবং ৯ জন তথ্য প্রযুক্তি ও পর্ণোগ্রাফি আইনে করা মামলার আসামী। এর বাইরে চুরির মামলায় ৮৯, ডাকাতি ১৬, ছিনতাই ৬, মাদক মামলায় আছে ৫ জন। অন্যরা সাধারণ ডায়রি সহ বিভিন্ন মামলার আসামী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের হিসেব অনুযায়ী শতকরা ৪৪ ভাগ পথ শিশু মাদক চালানের সঙ্গে, ৩৫ ভাগ পিকেটিং এর সাথে, ১১ ভাগ মানব পাচারের সাথে এবং ২১ ভাগ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত। ২০০৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে করা গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী শিশু অপরাধীদের গড় বয়স ছিলো ১৪.৯ বছর।
কিশোর, অপরাধ, অপরাধী, কিশোর অপরাধী বলতে কি বুঝায়?
শৈশবের শেষ ও যৌবনের সূচনার মধ্যবর্তীকালকে সাধারণ চলতি বাংলায় কৈশোর এবং শারীরবৃত্তিক দৃষ্টিতে বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়। বয়ঃসন্ধি হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি শিশুর শরীর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে রূপান্তরিত হয় এবং প্রজননের ক্ষমতা লাভ করে। ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯’-এর প্রস্তাবনা ও অনুচ্ছেদ -১ এর মর্মানুসারে ভ্রুণ সৃষ্টি সময় থেকে ১৮ বৎসরের নিচে প্রতিটি মানব সন্তানই শিশু। যদি না শিশুর জন্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় ১৮ বৎসরের আগের শিশুকে সাবালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ শৈশব এর শেষার্ধটি কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকাল বলে ধরে নেয়া হয়। কৈশোর প্রাপ্ত ছেলেদের কিশোর এবং মেয়েদেরকে কিশোরী বলা হয়। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। অপরাধ বলতে বোঝায় এমন কোন সমাজ বিরোধী বেআইনী কাজ যা ক্ষতিকর হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। এ ধরনের কাজ যাদের দ্বারা সংঘটিত হয় সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করে থাকে।
কিশোর অপরাধ হচ্ছে প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুনের উপর অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের অবৈধ হস্তক্ষেপ এর ফলে সংঘটিত বিশেষ ধরনের অস্বাভাবিক ও সমাজবিরোধী কাজ যেগুলোর প্রতিবিধানে আইনগত ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর-কিশোরীদের বলা হয় কিশোর অপরাধী।
কিশোর অপরাধ : বৈশিষ্ট্যসমূহ :
অপরাধী অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরী ২) অপরাধের ধরন সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়ম শৃংখলার পরিপন্থী ৩) অপরাধী নিজের চিন্তা ও কাজকে সঠিক বলে প্রাধান্য দেবে ৪) অপরাধীর মধ্যে বিষণ্ণতা এবং অস্থির আবেগীয় ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যায় ৫) অপরাধের পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অতি উৎসাহ ও কৌতুহল কাজ করে ৬) অপরাধী বিবেকতাড়িত হয়ে সংশোধিত হয় না বিধায় কালক্রমে আরো অপরাধ প্রবণ হয়ে পড়ে।
কিশোররা কেন কিভাবে অপরাধী হচ্ছে ?
বিশ্বায়ন এর ফলে পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতির ছোঁয়া কম-বেশী দেশের সর্বত্র লেগেছে। মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ফলে দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ন বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিভাবক রোজগার করতে দিনরাত ব্যয় করছে। পরিবারে সময় দিচ্ছে কম। সন্তানকে সময় দিতে পারছে না। অভিভাবক জানছে না সন্তান কি করছে, কার সঙ্গে মিশছে, ইন্টারনেটে কি দেখছে। সন্তানকে টাকা দেয়া হচ্ছে হাত খরচের। সন্তান অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে অভিভাবকদের সাথে সন্তানদের দূরত্ব বাড়ছে। কিশোর চারিপাশে প্রতিবন্ধকতা দেখছে। সে প্রতিবন্ধকতা পেরুতে চায়, সমস্যা শেয়ার করতে চায়। এ অবস্থায় সে অভিভাবক থেকেও বন্ধুদের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের ব্যবস্থা নেই। পাঠাভ্যাস নেই। সে বন্ধুবান্ধবদের সাহচর্যে বন্ধনহীন জীবনের ছোঁয়া অনুভব করে। সঠিক বন্ধু-বান্ধব না হলে সে অস্থিরতা, রোমান্টিসিজম, এ্যাডভেঞ্চারিজম, হিরোইজম ইত্যাদিতে মজে যায়। বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা-খাওয়া দাওয়া করতে গিয়ে গড়ে উঠে গ্যাং কালচার। মাদক ব্যবসা, ভাড়ায় খেটে অপরাধ সংগঠন, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে আড্ডাবাজির খরচ মেটানোর জন্যে। এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে ফেইসবুক, মোবাইলের মাধ্যমে গডফাদারদের সাথে যোগাযোগ করে। ভয়ংকর সামাজিক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে। গডফাদারদের অর্থ ও ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাস করেও থানা থেকে ছাড়া পেয়ে যায়। সমাজে তার মর্যাদা আরো বেড়েছে বলে মনে করে সে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরো কিশোররা তার সাথে জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসে। মুনাফার লোভে আন্তর্জাতিক পুঁজি খাটছে চোরাচালন, অস্ত্রব্যবসা, মাদক ব্যবসা, নারী পাচার, যৌন ব্যবসা ইত্যাদিতে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের সুযোগে মোবাইলের মাধ্যমে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ছে পর্নো ছবি ভিডিও। কিশোর-কিশোরীরা যৌন বিকৃতিতে আক্রান্ত হচ্ছে। সমাজে যৌন অপরাধ বাড়ছে।
দৈহিক হরমোন এর প্রভাবে বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্ক থেকে গোনাডে (ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয়) হরমোন সংকেত যায়। বিবিধ হরমোনসমূহের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া চলতে থাকে। শারীরবৃত্তিক নিয়মানুযায়ী মিথস্ক্রিয়ায় বিশৃংখলা হয় পরক্ষণেই তা আবার শৃংখলাবদ্ধ হয়। এমনি ধরনের বিশৃংখলা যখন শারীরি বৃত্তিক সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলে তখন তা সময়মতো শৃংখলাবদ্ধ হতে পারে না। এ অবস্থায় মস্তিষ্ক থেকে হৃদযন্ত্র ও শরীরের অন্যান্য প্র ধান অঙ্গসমূহে ভ্রান্ত সংকেত যেতে থাকে। জাংকফুড সমূহে মিশ্রিত অস্বাস্থ্যকর দ্রব্যাদি সমূহ এমনি বিশৃংখলাকে বাড়িয়ে তোলে। এ কারণে দেখা যায়, জাংকফুড সমূহে অভ্যস্ত কিশোর কিশোরীরা শারীরিক মানসিক অস্থিরতায় বেশী ভুগে থাকে। সঠিক সাহচর্য না পেলে এ অস্থিরতা পরিণত হয় মানসিক বিকৃতিতে। তখন আর মাত্রাজ্ঞান থাকে না। এ পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীরা পারিবারিক হত্যাকা-ে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ন এর ফলে পারিবারিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে। একান্নবর্তী পরিবার সমূহ ভেঙ্গে একক পরিবার তৈরী হচ্ছে। আবাসন সংকট বাড়ছে। বস্তিবাসী বাড়ছে। বেকারত্ব বাড়ছে। ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা বাড়ছে। সমাজজীবনে হতাশা, নৈরাজ্য, অপসংস্কৃতি বাড়ছে। চুরি, ছিনতাই, পকেটমারি বাড়ছে। কিশোর অপরাধ বাড়ছে। মা কর্মজীবী হওয়ায় শিশুযতেœর অভাব হচ্ছে। দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স, মা বাবার পুনর্বিবাহ, ভগ্ন পরিবার বাড়ছে। জোরপূর্বক শিশুশ্রম বাড়ছে। পরিবারে আবেগ, ভালবাসা, নিরাপত্তার অভাব হচ্ছে। হতাশাগ্রস্থ কিশোর অসৎপথে পা বাড়াচ্ছে। সমাজে কিশোর অপরাধ বাড়ছে।
সমাজে কিশোর অপরাধের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ : পিতামাতা ও বয়োজ্যৈষ্ঠদের প্রতি অবাধ্যতা ও অসম্মান প্রদর্শনের ফলে পারিবারিক জীবনের শৃংখলা নষ্ট হয় ২) রাস্তাঘাটে সংঘটিত কিশোর অপরাধ এর কারণে জনগণের আর্থসামাজিক নিরাপত্তায় বিঘœ ঘটে। ৩) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শান্তি শৃংখলার অবনতি ঘটায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হয় ৪) স্কুল কলেজগামী ছাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার ফলে নারী শিক্ষার অবনতি ঘটে এবং বাল্যবিবাহের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় ৫) মাদকাসক্তি ও যৌন অপরাধ বৃদ্ধি পায় ৬) কিশোরদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবার ফলে দেশ, জাতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে পড়ে।
কিশোর অপরাধ বিষয়ক কর্তৃপক্ষীয় তৎপরতাসমূহ :
ক) কিশোর আদালত : প্রেক্ষাপট
১) ১৯৭৪ : শিশুদের জন্য পৃথক বিচার ব্যবস্থার সূচনা শিশুদের জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইন -১৯৭৪ সালের শিশু আইন ২) ১৯৭৬ : প্রথম শিশু নীতি -১৯৭৬ সালের শিশুনীতি ৩) ১৯৭৮ : ১৯৭৪ সালের আইনের অধীনে দেশের প্রথম কিশোর আদালত প্রতিষ্ঠিত হয় টঙ্গী কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে ৪) ১৯৮৯ : ‘১৯৮৯ সালের শিশু অধিকার সনদ-এ বাংলাদেশ সাক্ষর করে। কিশোর অপরাধ বিচারে মূলত এই সনদ এর উপর জোর দেয়া হয় ৫) ২০০৩ ” সর্বশেষ কিশোর আদালতটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৬) ২০১৩ : ১৯৭৪ সালের শিশু আইন সংশোধিত হয়ে আরও পূর্ণাঙ্গরূপ ধারণ করে।
খ) কিশোর আদালত : সংখ্যা : অবস্থান : কিশোর আদালত মোট ৩টি। ১) টঙ্গি : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ অনুসারে ২) যশোহর : খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগ অনুসারে ৩) কোনাবাড়ী : শুধু মেয়েদের।
গ) কিশোর সংশোধনাগার : মোট ৩টি। দুইটি ছেলেদের, একটি মেয়েদের।
আইনের দৃষ্টিতে কিশোর অপরাধ : ক) অপরাধীদের আচরণ ও কাজকে কম অপরাধমূলক ভাবা হয় খ) অপরাধের কারণকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় গ) কৃত অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান না করে সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শিশুবান্ধব হচ্ছে না কেন? ক) অপ্রতুল পুলিশ প্রবেশন কর্মকর্তা : আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় প্রবেশন কর্মকর্তা আছেন খুবই কম। এর ফলে বিচার ও আদালতের কার্যক্রমে কিশোর অপরাধ জনিত গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ অবহেলিত হচ্ছে। খ) আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া : ২০১৩ সালে শিশু আইনটি সংশোধন হলেও এর পুরোপুরি বাস্তবায়ন এখনো হচ্ছে না। গ) কিশোর আদালতের সীমাবদ্ধতা : উক্ত আদালত কোন গুরুতর অপরাধ আমলে নিতে পারে না। গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর বিচার করে ফৌজদারী আদালত।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে পদক্ষেপসমূহ :
ক) প্রতিরোধ : ১) পিতামাতাকে সন্তান পালনের জন্য সুশিক্ষা অর্জন করতে হবে এবং গৃহের পরিবেশ শিশুবান্ধব করতে হবে  শিশুতোষ ম্যাগাজিক পাঠ এর ব্যবস্থা রাখতে হবে ২) বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ শিশুবান্ধব করতে হবে ৩) পাঠক্রম ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রাথমিক যৌনশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে ৪) এলাকাভিত্তিক নজরদারী : সরকারের প্রতিনিধি অভিভাবক, আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নাগরিক সমাজ ইত্যাদির সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন করে এলাকাভিত্তিক নজরদারীর ব্যবস্থা করা : ভাসমান শিশুদের নজরদারী, হারিয়ে যাওয়া শিশু সংগঠন গুলোকে চাঙ্গা করে এলাকার শিশুদের সৃষ্টিশীলতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়া, সন্ত্রাসের গডফাদারদের তালিকা প্রণয়ন করা, এলকাভিত্তিক পাঠাগার গড়ে তোলা, মাদক কেনাবেচার স্পটগুলোতে নজরদারী, বাচ্চাদের ফেইসবুক একাউন্টগুলোতে নজরদারী করা, এলাকাভিত্তিক খেলাধুলার ব্যবস্থা করা ৫) শিক্ষক প্রশিক্ষণ : শিশুকিশোরদের মানসিকতা অনুধাবন করার মতো বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করা ৬) বিদ্যালয়ে বাৎসরিক রুটিন মেডিকেল চেক আপ এর ব্যবস্থা করা ৭) স্কুল কলেজে জাংকফুড নিরুৎসাহিত করা ৮) দারিদ্র দূরীকরণ ৯) গৃহে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় নৈতিক চর্চা করার ব্যবস্থা ১০) আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া ১১) স্কুল-কলেজে কিশোর-কিশোরীদের সমস্যায় কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করা ১২) কিশোর সংশোধনাগার এর সংখ্যা বৃদ্ধি করা ১৩) অমানবিক শিশুশ্রম রোধে শ্রম পরিদর্শন দপ্তরের তদারকির ব্যবস্থা করা ১৪) কিশোর আইন রিফর্ম সেল গঠন।
খ) প্রতিকার : ১) কিশোর অপরাধীকে সামাজিকভাবে একঘরে না করা ২) মনোবিজ্ঞানী, মনোচিকিৎসাবিদ, শিশু স্নায়ুবিদ, শিশুবিশেষজ্ঞ ও হরমোনবিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে রোগ নির্ণং করে চিকিৎসা প্রদান ৩) সংশোধন ও পুনর্বাসন ৪) ২০১৩-এ সংশোধিত শিশু আইন এর ১৬ ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কিশোর আদালত প্রতিষ্ঠা করা।
উপসংহার :মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায় হলো কৈশোরকাল। এটি এমন এক সময় যখন একজন শিশু বয়স ও বুদ্ধি উভয়দিক থেকে ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে থাকে বটে, তবে যথার্থ অর্থে প্রাপ্ত বয়স্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে উঠেনা। তাই কিশোর অপরাধীরা পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হচ্ছে তা অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে। নতুবা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে।

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত