logo
বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
bijoy
  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • অর্থশক্তির কাছে আইনের শক্তি পরাজিত : খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

অর্থশক্তির কাছে আইনের শক্তি পরাজিত : খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

অর্থশক্তির কাছে আইনের শক্তি পরাজিত : খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
ঢাকা, ৩০ নভেম্বর, এবিনিউজ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন হাবিব ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে পেশাজীবন শুরু। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের প্রথম ফ্যাকাল্টি সদস্য ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের প্রথম মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। সোনালী, অগ্রণী, বাংলাদেশ কৃষি ও পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। ১৯৯০ সালে অন্তর্র্বতীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ‘আর্থিক খাত সংস্কার’বিষয়ক টাস্কফোর্সের সদস্য, ২০০১ সালে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ কর্তৃক গঠিত অনুরূপ টাস্কফোর্সের উপপ্রধান এবং ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত ‘ব্যাংকিং সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকলাপ’বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংক আইন সংশোধন, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান, খেলাপি ঋণ, মুদ্রা পাচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি একটি দৈনিকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-
 
ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন) বিল, ২০১৭ নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।
 
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করার জন্য কিছু প্রস্তাব উঠেছে। এগুলো মূলত ব্যাংকের মালিকপক্ষ চেয়েছিল। বর্তমান আইন অনুযায়ী বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে পরিচালক পদে দুজন থাকতে পারবেন। সংশোধনী পাস হলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে চারজনে। আর এখন থাকতে পারেন ছয় বছর, নতুন আইন পাস হলে থাকতে পারবেন টানা নয় বছর। এটি ‘নৈতিকতা’ বিরুদ্ধ চাওয়া। কারণ একজন ব্যক্তি যখন ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকেন, তখন তার চারপাশে এক ধরনের কায়েমি স্বার্থ গড়ে ওঠে। আমাদের দেশের নির্বাচনও পাঁচ বছর পরপর হয়। আমেরিকায় শক্তিধর রাষ্ট্রপতি চার বছর পর পরিবর্তন হয়। একটি ব্যাংকে প্রচুর আমানত থাকে। ব্যাংকের প্রকৃত মালিক ওই ব্যাংকের পরিচালক কিংবা শেয়ারহোল্ডাররা নন, বরং জনগণ বা আমানতকারী। কিন্তু ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করে বোর্ড। সেই বোর্ডে যদি একই পরিবার থেকে অনেক ব্যক্তি থাকেন, তবে অর্থ তো তাদের ইচ্ছামতোই ব্যবহার হবে। অর্থাত্ একেকটি পরিবার জনগণের টাকা ব্যবহার করে সম্পদশালী হয়ে উঠবে। এটিকে যদি অর্থনীতির দিক থেকে দেখা হয়, তবে তা হবে অর্থ পুঞ্জীভূতকরণ অথবা কেন্দ্রীভূতকরণ। দেশের অর্থনৈতিক নীতি হলো, যা আমাদের সংবিধানে রয়েছে— সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র অর্থ কমিউনিজম না। এটা হলো ওয়েলফেয়ার ইকোনমি। এটা নতুন কিছু নয়। ইউরোপের কোনো কোনো দেশে এটা প্র্যাকটিস করা হচ্ছে। কল্যাণ অর্থনীতির মূলকথা হলো, অর্থ-সম্পদ কয়েকটি হাতে পুঞ্জীভূত না রেখে তা অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। এতে সামাজিক সাম্য-শান্তি বজায় থাকে। আবার আমেরিকায় রয়েছে অর্থ পুঞ্জীভূতকরণ। ওটাকে আমরা বলি ক্যাপিটালিজম বা ধনবাদী অর্থনীতি। এর বিপরীতে ইউরোপের অর্থনীতি হলো ওয়েলফেয়ার ইকোনমি বা মানবিক সমাজতন্ত্র। এর মানে অর্থ কেন্দ্রীভূত করা যাবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে। তবে হ্যাঁ, বৈষম্য থাকবে, বেশি নয়, কিছুটা। কমিউনিজম হলো সব সম্পদের একমাত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। সমাজতন্ত্র, কল্যাণ অর্থনীতি ও ধনতন্ত্র— এ তিনটিই বাজার অর্থনীতিতে অবস্থান করে। তবে প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি, যা আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পেয়েছি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায়ই যে কথা বলতেন, তা হলো ইনক্লুসিভ ইকোনমি বা অন্তুর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। এটা মুখে বলা হলেও পালন করা হচ্ছে না। একটি ব্যাংক যদি একটি পরিবারের লোক পরিচালনা করে, তবে তো অর্থ পুঞ্জীভূত হয়েই গেল। আরেকটি বিষয় রয়েছে, এটা একটু টেকনিক্যাল। ব্যাংকের তিনটি কমিটি রয়েছে। ঋণ কমিটি, অডিট কমিটি প্রভৃতি। সব কমিটিতে তিনজন হলেই কোরাম পূর্ণ হয়। যেখানে তিনজন হলেই কোরাম হয়, সেখানে একজন পরিবারের চারজন সদস্য থাকলে তারাই তো সব সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাত্ এতে শুধু আমানতকারীরা নয়, শেয়ারহোল্ডাররাও বঞ্চিত হবেন। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলব, অন্যদিকে অর্থ পুঞ্জীভূত করব, এটা শোভা পায় না। আর এটি গণতন্ত্রের সঙ্গেও মেলে না। গণতন্ত্র মানে তো সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়া। এ আইন পাস হলে যেটা হবে, হয়তো একটি ব্যাংকে ১০ হাজার শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে একটি পরিবার। এর পরও সরকার কেন এটা করছে, তা নিয়ে ভালো ধারণা নেই। তবে নতুন আইনে পরিস্থিতি খারাপ হবে কিনা, তার প্রমাণও দিতে পারব। আমাদের দেশে প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংক রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি যখন সাধারণ আইনে চলত (অর্থাত্ এক পরিবার থেকে দুজন পরিচালক), ওই সময় এটি ছিল দেশের উন্নত চারটি প্রধান ব্যাংকের একটি। এ ব্যাংকটিতে এখন এক পরিবার থেকে পাঁচজন রয়েছেন। এটা কিন্তু আইন ভঙ্গ করে। কারণ এখনো আইন অনুযায়ী দুজন থাকতে পারে। মজার বিষয় এই যে, আইন ভঙ্গ করে পাঁচজন রয়েছেন, তাতে আইন ভঙ্গের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা, কিন্তু সেটা না করে বরং আইন সংশোধন করে তাদের গ্রহণ করা হচ্ছে। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী। কেউ তো আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আইনকেই সংশোধন করে কী বার্তা দেয়া হচ্ছে। পরিষ্কার অর্থ দাঁড়ায়, অর্থশক্তির কাছে আইনের শক্তি পরাজিত। তাহলে আইনের শাসন কেমন করে প্রবর্তিত হবে। সুশাসন কেমন করে প্রতিষ্ঠিত হবে।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) দাবির মুখে ব্যাংক আইন সংশোধন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
 
ব্যাংকের তিনটি পক্ষ রয়েছে, যাদের স্টেক রয়েছে। একটি হলো মালিকপক্ষ, যারা শেয়ার কিনেছেন, এদের শেয়ারমূল্যের পরিমাণ যেকোনো ব্যাংকের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। আর ৯০ শতাংশের মালিক হলো গ্রাহক বা আমানতকারী। তবে এদের কোনো প্রতিনিধি বোর্ডে থাকে না। অথচ তারা আছে বলেই ব্যাংক চলে। এরা হলো দ্বিতীয় পক্ষ। আর তৃতীয় পক্ষ হলো ব্যাংকের এমডি থেকে নিচ পর্যন্ত যারা ব্যাংক পরিচালনা করে। এরাই মূল ব্যক্তি। গ্রাহক বা বোর্ড ব্যাংক চালায় না, পেশাদার ব্যাংকাররাই চালায়। এ তিনটি পক্ষের মধ্যে মালিকপক্ষের মাত্র কয়েকজনের কথায় এ সংশোধন করা হচ্ছে। এটি পক্ষপাতদুষ্ট। বাকি দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের মতামত নেয়া হয়নি। আমার মতে, প্রথমেই মতামত নেয়া উচিত আমানতকারীদের, যাদের স্টেক ৯০ শতাংশ বা অধিক। এদের কারো সঙ্গে কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আলোচনা হয়েছিল? হয়নি। এছাড়া ব্যাংকারদেরও মতামত নেয়া হয়নি। বিএবির প্রস্তাবের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক লিখিত মতামত দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিষ্কারভাবে ও লিখিতভাবে এর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু এ মতামত মানা হয়নি। একটি টকশোয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান উপস্থিত ছিলেন। আমি সেখানে বলেছিলাম, বাংলাদেশ ব্যাংক রেগুলেটর ও জ্ঞান-অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ। এর মতামতের মূল্য দিলেন না। তিনি বললেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কে? আমাদের সংসদ হলো সুপ্রিম। আমি বলেছিলাম, সুপ্রিমের কাছে যাওয়ার আগে বিষয়টি কি বিবেচিত হওয়ার দরকার ছিল না। তিনি বললেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা শুনতে হবে কেন? আমি অবাক না হয়ে পারিনি। এভাবে যদি উন্মুক্তভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খাটো করা হয়, তাহলে তারা তো কোনো কাজই করতে পারবে না। আমি যতদূর জানি, পেশাজীবী ব্যাংকাররাও কেউ এ পরিবর্তন পছন্দ করছেন না। আর আমানতকারীদের এটা পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। তারা এক পরিবারের কাছে জিম্মি হবেন কেন? অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সব মালিকপক্ষও কিন্তু একমত নয়। এ পক্ষের অনেকেই জানিয়েছেন যে, এটা ভালো হচ্ছে না। মালিকপক্ষের সবার নয়, তাদের মুষ্টিমেয় দুরাচার নেতাদের কথা অনুযায়ী এ সংশোধন হচ্ছে।
 
দেশের আর্থিক খাতের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কি হ্রাস পাচ্ছে?
 
নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়া কাম্য নয়। ব্যাংকাররা তো বটেই, জনগণও আস্থা রাখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। কিন্তু মনে হচ্ছে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছে না। গত বছর বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেছিলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে অর্থমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রী মিটিংয়ে ডাকেন না। তাকে ডাকেন একমাত্র ভারতের পার্লামেন্ট অথবা পার্লামেন্টারি কমিটি। তিনি জানিয়েছিলেন, নিজ মেয়াদে তাকে একবার পার্লামেন্টারি কমিটি ডেকেছিল। এ হলো ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের মর্যাদা। গভর্নর একটি প্রতীক, তাকে সম্মান দেয়া মানেই হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সম্মান দেয়া। আমাদের এখানে কি গভর্নরকে এ সম্মান দিতে পারছি? অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী সবাই তাকে ডাকেন। তাকে বিশেষ কোনো সম্মানই দেয়া হয় না। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অসুবিধা। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টের সেকশন ৪৬-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকে যদি আমানতকারীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তবে যাদের দ্বারা বিঘ্নিত হচ্ছে (চেয়ারম্যান, পরিচালক কিংবা এমডি হতে পারেন), বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা রয়েছে তাদের ওই ব্যাংক থেকে অপসারণ করার। এমনকি পুরো বোর্ডকেই দায়ী মনে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই বোর্ড ভেঙে দিয়ে সেখানে প্রশাসক বসাতে পারবে। ওই ধারায় আরো লেখা রয়েছে, যেসব পরিচালক, চেয়ারম্যান সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হবেন; অর্থাত্ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধারার অধীনে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না। এর অর্থ বেসরকারি ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা কিছুটা থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর নেই, আইনেই দেয়া হয়নি। ফলে পার্থক্যটা বোঝা যায়। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গড় ক্ল্যাসিফাইড ঋণ শতকরা ৬ ভাগের কিছু বেশি। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের গড় ক্ল্যাসিফাইড ঋণ হলো ২৮ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা নেই বলেই এটা হচ্ছে। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবমাননা করে নয়, বরং তাকে স্বাধীনতা দিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে উন্নয়ন করা সম্ভব। ডেলিগেটেড অথরিটি, অর্থাত্ সরকার আইন বা ইত্যাদি দ্বারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যেসব ক্ষমতা প্রদান করেছে, সেটি প্রয়োগ করার জন্য এক ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন। প্রথমত. আইন বাধাহীনভাবে প্রয়োগ করতে দিতে হবে, দ্বিতীয়ত. প্রয়োগ করার পেশাগত দক্ষতা অর্জন। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে কৌশল, আবার অনেক ক্ষেত্রে গাটস বা সাহসের প্রয়োজন রয়েছে। সেটি যদি না থাকে, তাহলে কিন্তু হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মেধা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থাকতে পারে। এর চেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে ক্ষমতা প্রয়োগ করার গাটস নিয়ে, যখন প্রবল ক্ষমতাশালীদের সামনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চুপসে যায়।
 
সম্প্রতি একটি গ্রুপের হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক চলে গেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
 
বিষয়টির ভেতরের খবর তেমন জানি না। যেটুকু জেনেছি, তা খবরের কাগজ মারফত। আমি এভাবে বলতে চেষ্টা করব, প্রথম তারা যখন বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক অধিগ্রহণ করল, তখন মানুষ কিছুটা স্বাগত জানিয়েছিল। কারণটা হলো, ওই ব্যাংকের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ ছিল যে, ওই ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা জামায়াতে ইসলামী ও সন্ত্রাসীদের দেয়া হয়েছিল। এজন্য মানুষ খুশি হয়েছিল যে, যাক জ্বালাও-পোড়াও কিছুটা বন্ধ হবে। কিন্তু প্রথম দিন থেকে যা দেখছি তা হলো, এটি গ্রহণ করার ব্যাপারে স্বচ্ছতার বেশ অভাব ছিল। একটি গ্রুপ ব্যাংক কিনতেই পারে। বিশ্বের সবখানেই এটা হয়। তবে কেনার পর পাবলিক স্টেটমেন্ট দেয়া হয়, কেন তারা ব্যাংক কিনল, কী লক্ষ্য অর্জন করতে চায় ইত্যাদি। কিন্তু এমন কোনো বক্তব্য আমরা এ ব্যাংকের ক্রেতার কাছ থেকে পেলাম না। সবকিছু মিলে একটা অস্পষ্টতা। অস্পষ্টতা থেকে ভীতি তৈরি হয়েছিল। তবে প্রথম ব্যাংক হিসেবে তেমন সমালোচনা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ওই গ্রুপ আরো ব্যাংক কিনল, তখন কিন্তু একই সমাজের মধ্যে একটু ভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলাম। অনেকে বলতে শুরু করেছেন, চুপেচাপে রাতের অন্ধকারে ব্যাংক কেনা কেন? বিদেশে যেভাবে হয়, অর্থাত্ শেয়ার কিনে ঘোষণা দেয়া হয়। এতে বোঝা যায়, খারাপ কিছু নেই। কিন্তু গ্রুপটি বক্তব্য দিয়ে অস্পষ্টতা পরিষ্কার করল না। এতে একটু ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যেহেতু অর্থ কেন্দ্রীয়করণের বিপক্ষে, সেখানে একটি গোষ্ঠীর কাছে যদি অনেকগুলো ব্যাংক চলে যায়, তাহলে তো সেটা সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ হলো। এটি আমাদের দেশের অর্থনীতির মূলধারা বা মূল চিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না। আবার গ্রুপটি কিন্তু ইসলামী ব্যাংক বাদে ট্র্যাডিশনাল ব্যাংক একটিও কেনেনি। সবই ইসলামী ব্যাংক। এটিও বক্তব্য দিয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার। কেন্দ্রীয়করণ যাতে এক হাতে বেশি না হয়, সেটাও দেখা দরকার। গ্রুপটি ‘গুড সেন্সে’ একটি সিন্ডিকেট গঠন করতে পারে কয়েকটি ব্যাংক নিয়ে। দেখাতে পারে, আমরা আটটি নিলেও আমাদের রয়েছে বিশাল শেয়ারহোল্ডার সংখ্যা। তেমন তথ্য পাচ্ছি না। কোনো বক্তব্যই পাওয়া যাচ্ছে না। এ গোষ্ঠীর যারা শেয়ার কিনছেন, তাদেরও স্বচ্ছ পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। সেদিক থেকে একটু ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। এগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
 
এতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব হবে না?
 
এখনই হচ্ছে। একজন প্রকৃত লোক, যার তদবির বা ঘুষ দেয়ার ক্ষমতা নেই, সে কি লোন পাচ্ছে? যদি পেত, তাহলে এসএমই সেক্টরের লোকেরা ঋণ পেত। এত লেখালেখির পরও বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারের পক্ষ থেকে চাপ থাকার পরও এটি এগোচ্ছে না। এখন একটি প্যাটার্ন তৈরি হয়ে গেছে, তবে সব ক্ষেত্রে নয়। ঋণের জন্য তদবির লাগে, ঘুষ দিতে হয় কখনো ব্যাংকের লোককে, আবার কখনো বাইরের কোনো শক্তিশালী লোককে। সব মিলিয়ে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার পরিবর্তে এ ধরনের ব্যবস্থা ক্ষতিকর। এজন্য ব্যাংকের মন্দ ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হচ্ছে, তার অর্থ আমরা ভালো করছি। তবে অর্থনীতি কিন্তু শুধু ব্যাংকিং সেক্টরকে নিয়ে নয়, অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে সেবা খাত, (যেটা সবচেয়ে বড়) শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য অনেক কিছু মিলেই। এ সবকিছু মিলে যদি বলেন, তাহলে আমাদের নির্দেশক ভালো। কিন্তু এর একটি অংশ হলো ব্যাংকিং, যা সংকটে রয়েছে। আমি সার্বিকভাবে ভালো করছি বলে একটি খাতকে নষ্ট করব, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
 
ঋণখেলাপি বাড়ছেই। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও কাজে লাগছে না...
 
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে পরিসংখ্যান পাই তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকে খুবই বাড়ছে, বেসরকারি ব্যাংকেও বাড়ছে। আজকের যে ঋণটা খেলাপি হলো, সেটা কিন্তু গতকালের দেয়া নয়, এটা অন্তত পাঁচ-ছয় বছর আগের দেয়া। আজকে যারা ব্যাংক চালাছেন, তারা দায়ী নন। এটার জন্য দায়ী পাঁচ-ছয় বছর আগে যারা চেয়ারম্যান, এমডি বা ডিএমডি ইত্যাদি ছিলেন। তারা তো চাকরি শেষ করে চলে গেছেন। তাদের তো ধরা হচ্ছে না। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে সত্যিকারভাবে কিছু করতে চাইলে বড় বড় মন্দ ঋণ কে দিয়েছিলেন, কোন বোর্ড অনুমোদন দিয়েছিল, সেখানে কারা কারা সম্পৃক্ত ছিল, তা বের করে শাস্তি দিতে হবে। তা না দেয়া পর্যন্ত এ প্রসেসটা রিভার্স হবে না। একটা সুখের কথা যে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী— এসব ব্যাংকে আগে যারা এমডি ছিলেন, তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের তুলনায় এখন ভালো অফিসাররা এমডি হয়ে এসেছেন। এটা একটি ভালো লক্ষণ, কিন্তু যে পরিস্থিতিতে কাজ করতে হচ্ছে, তাতে এরা কতটুকু করতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছে। তাই সরকারের একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার যে, ব্যাংকের ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। এটি হলে এখন যারা আছেন, তারা আস্তে আস্তে গুছিয়ে নিতে পারবেন।
 
অভিযোগ থাকলেও বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এটি কি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় নয়?
 
অবশ্যই অন্তরায়। এটা শুধু ব্যাংকিং নয়, সারা দেশের সুশাসনের অন্তরায়। একটা ভালো দিক হলো যে, কয়েক বছর ধরে দুদক কথাই বলত না, এখন কথা বলছে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একজন সত্ ও সাহসী কর্মকর্তা। তিনি শুরু করেছেন। আমরা আশাবাদী যে, দেরিতে হলেও তিনি কিছু করতে পারবেন। তবে এটি হয়েছে হাইকোর্ট রায় দেয়ার পর। হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন যে, পর্ষদের লোকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ভাবতে অবাক লাগে, আব্দুল হাই বাচ্চু কি রাষ্ট্র, দুদক কিংবা বিচারালয়ের চেয়েও শক্তিশালী যে, কেউ তাকে ধরতে পারছে না? এটি দেশের জন্য অশনিসংকেত। দেশের যে অপশক্তি শুভশক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করছে, তার লক্ষণ এটি। এ থেকে দেশ রক্ষা করতে হলে আমাদের সজাগ হতে হবে এবং এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
 
নতুন আরো কিছু ব্যাংক আসছে। এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি? নতুন চালু করা ব্যাংকগুলোর অবস্থা কী?
 
আমরা আগেই বলেছিলাম, লাইসেন্স দেয়াই উচিত হয়নি। সমাজের প্রভাবশালী যেসব ব্যক্তি এসব ব্যাংকের মালিক, তাদের ব্যাংক ভালো চলছে না। এটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ আরো বাড়ানো উচিত। অবশ্য এ কথা বলে লাভ নেই। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না। অপশক্তি অতিক্রম করে কাজ করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্জন করেনি।
 
আমাদের মতো ছোট দেশে এত ব্যাংকের প্রয়োজন রয়েছে কি?
 
এত ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং আরো কম হলে ভালো ছিল। তবে সেক্টরাল ব্যাংক হতে পারে। যেমন বিডিআরকে একটা দেয়া হয়েছে, পুলিশকে যদি একটি দেয়া হয়। এগুলো নিয়ে আপত্তি নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংক আনতে দেয়া শুধু অনুচিতই নয়, বরং বাধা দেয়া উচিত।
 
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা তো খুবই খারাপ। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
 
এটা আমাদেরও প্রশ্ন। এ প্রশ্নের জবাব আমরা জানি না। এভাবে সরকার থেকে সাধারণ সময়ে (এটা যুদ্ধের সময় না বা দুর্যোগেরও সময় না) বাজেট থেকে টাকা দেয়া মেনে নেয়া কঠিন। ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এটা বেসরকারি নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক। এ ব্যাংকের ২৪ হাজার শাখা আর ছয়জন ম্যানেজিং ডিরেক্টর রয়েছে। এ ব্যাংক প্রতি বছর কয়েক হাজার রুপি আয় করে সরকারের বাজেটে যোগ করে। আর আমরা বাজেট থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে ব্যাংকে দিই। কেন? ভারত সরকার পারলে আমাদের সরকার পারবে না কেন? রক্ষক যদি ভক্ষক হয়, তাহলে তো এ অবস্থাই হবে। এর বেশি আর কী বলব।
 
এ থেকে উত্তরণে কী করা যেতে পারে?
 
এ জন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকবেন, তাদের অঙ্গীকার থাকতে হবে যে, তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। যদি এটা না হয়, তখন সাধারণ জনগণকে মিডিয়া, পত্রপত্রিকা, আলোচনা সভার মাধ্যমে সমাজকে জানাতে হবে। গোপনীয়তায় রোগ বাড়ে, আর প্রকাশ হলেই ডাক্তার চলে আসে। সেজন্য আমরা এটিকে প্রকাশ করব, আলোচনা করব, যাতে সমাজ সচেতন হয়। দেশটা তো কোনো রাজনৈতিক দলের না, দেশটা জনগণের। এটা আমার কথা নয়। এটা সংবিধানে লেখা রয়েছে। এ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। এ জনগণকে বোঝাতে হবে। তারা বুঝলে তারা তাদের পদক্ষেপ নেবে।
 
ঋণ খেলাপের সঙ্গে দেশে অর্থ পাচারও বাড়ছে...
 
এটি উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানি না। যেটুকু জানি, তাও বিদেশী সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে। আমাদের এখানে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) রয়েছে। নতুন করা হয়েছে, তাই অভিজ্ঞতা কম। তবে কিছু কিছু কাজ করছে। এদের আরো সজাগ হতে হবে। তবে তারা শুধু একা নয়, দেশের সবাইকে মিলে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। দুদককেও সক্রিয় হতে হবে। এটিকে একেবারে নির্মূল করা যায় না, কোনো দেশই পারে না। তবে এটিকে যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যায়। ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুদক সবাই মিলে চেষ্টা করতে হবে। এটি জানতে ও বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
অভিযোগ উঠেছে যে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডি বেড়ে যাচ্ছে।
 
এটা পুরোপুরি না হলেও কিছুটা প্রমাণিত। আমি নিজেও এটি প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে। তারা এখন পর্যন্ত তিন হাজার ফোন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন ব্যাংকিং ভালো, কিন্তু এটিকে প্রোপার ভিজিল্যান্সের আন্ডারে আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন জানছে, চেষ্টা করছে। এটা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে ফোন ব্যাংকিং আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পক্ষে থাকে, কিন্তু অর্থ পাচারের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।
 
ব্যাংকের নিম্ন সুদহার নিয়ে আপনার মত কী?
 
দেশের মূল্যস্ফীতির যে হার থাকে, তা থেকে যদি কম হারে মুনাফা দেয়া হয় ব্যাংক থেকে সঞ্চয়ের ওপর, তাহলে গ্রাহকের সঞ্চয় কমে যায়। আজকের ১০০ টাকা ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে আগামী বছর হবে ১০৬ টাকা। ৬ শতাংশ সুদ দিতে না পারলে গ্রাহকের মূলধনই কমে যাবে। এখন সুদহার ৪-৫ শতাংশ, এটি বিনিয়োগ সহায়ক নয়। আবার এটা বৃদ্ধি করলে যদি ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যায়, তবে যারা বিনিয়োগ করবে, তাদের ওপর চাপ বাড়বে। মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের এখানে স্প্রেড ৫ শতাংশের উপরে, আর বিদেশে এটা দুই-আড়াই শতাংশের মতো। আমরা এটা ৩ শতাংশে নামাতে কেন পারব না? ব্যাংকের ভেতরের যে অবস্থা, যেমন ক্ল্যাসিফাইড লোন, কাজ না করা, অতিরিক্ত জনবল ইত্যাদি ঠিক করে একটা সুশাসন ফিরিয়ে আনতে পারলে স্প্রেডকে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। তাহলে আমরা কম সুদ ঋণ দিতে পারব, আবার বেশি সুদে আমানত নিতে পারব।
 
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সরকারের ভর্তুকি, ব্যাংক আইন সংশোধন, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি— সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে যে পরিস্থিতি চলছে, তা আগামীতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
 
এর দুটি ডাইমেনশন রয়েছে। একটি হলো, আইন অমান্য করে এক পরিবার থেকে পাঁচজন থাকা। শান্তির পরিবর্তে এটি গ্রহণ করার জন্য আইন পরিবর্তন করা হচ্ছে, এটি আইনের প্রতি অবজ্ঞা। দ্বিতীয় হলো, পরিবারকেন্দ্রিক ব্যাংক গঠন। পাকিস্তান আমলে বলা হতো, পাকিস্তান হলো ২২ পরিবারের, অর্থাত্ ২২ পরিবারের হাতে অধিকাংশ সম্পদ ছিল। ওই ২২ পরিবার কিন্তু ছিল ব্যাংকভিত্তিক। অর্থাত্ ব্যাংককে কেন্দ্র করে তারা বড় হয়েছে। পাকিস্তান পার্লামেন্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দলের লোকেরা, বিশেষ করে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সোচ্চার ছিলেন ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে। তারা পরিষ্কার কণ্ঠে বলতেন, আমরা কেন্দ্রীয়করণ চাই না। অর্থের কেন্দ্রীয়করণ করে এক হাতে পুঞ্জীভূত করতে চাই না। আমরা চাই সম্পদ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। এ নীতিই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিয়ে গেল। এটিই তো মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি। এটি তো সমাজতন্ত্র, কল্যাণ অর্থনীতি সবারই মূলনীতি। আজ তাহলে কি এটিকে আমরা অস্বীকার করছি? সমাজতন্ত্রকে সংবিধান থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এ সরকার ক্ষমতায় এসে তা যুক্ত করল। আমরা প্রশংসা করলাম। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা এর বিরোধিতা দেখছি। সামাজিক আয়ের বিভেদটাকে মাপা হয় জিনি সহগ দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর সময়, ১৯৭৪ সালে জিনি সহগ ছিল দশমিক ২৪। গত বছর ছিল দশমিক ৪৬। চলতি বছর এসেছে দশমিক ৪৮। এর অর্থ, বৈষম্য এখন একটি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। উন্নতি হয়েছে অস্বীকার করি না, কিন্তু কার হয়েছে? ক-খ-গ তিনজনের, জনগণের হয়নি। এ উন্নতি কি আমাদের সুখ-শান্তি দেবে, নাকি হিংসা, অশান্তি ও বিভক্তির দিকে ঠেলে দেবে? আমরা মানবোন্নয়ন সূচকে ভালো করছিলাম, কিন্তু এ ধরনের বৈষম্য আমাদের হিংসাশ্রয়ী করে তুলবে। একের বিরুদ্ধে আরেকজনকে ক্ষেপিয়ে তুলবে। তাই বৈষম্য কমাতে হবে। তবে এ কাজের জন্য যে পরিকল্পনা দরকার, সে রকম কিছু দেখছি না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক— সব নেতার কাছে আহ্বান জানাব, সবাই যেন বিষয়টি মাথায় রাখেন। সোনার বাংলা কিন্তু গুটিকয়েক মানুষের জন্য ভাবা হয়নি। জনগণের জন্য ভাবা হয়েছে। জিনি সহগ বলছে, জনগণ নয়, কয়েকজনই বড় হচ্ছে। এর পরিবর্তন চাই। (সৌজন্যে : বণিক বার্তা)
 
এবিএন/সাদিক/জসিম/এসএ

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত