logo
বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭
bijoy
  • হোম
  • সারাদেশ
  • বুড়িমারী স্থল বন্দর এখন ধুলো-বালির শহর: বাড়ছে সিলোকোসিস রোগ

বুড়িমারী স্থল বন্দর এখন ধুলো-বালির শহর: বাড়ছে সিলোকোসিস রোগ

বুড়িমারী স্থল বন্দর এখন ধুলো-বালির শহর: বাড়ছে সিলোকোসিস রোগ
লালমনিরহাট, ২৪ নভেম্বর, এবিনিউজ : লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর এখন ধুলো-বালির শহর হয়ে গেছে। পাথর ক্রাশ মেশিনের জন্য পুরো স্থল বন্দর জুড়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। খোলা জায়গায় পাথর ভাঙ্গার কারণে সারাদিন ধুলোয় ভরা থাকে বুড়িমারি স্থলবন্দর ও তার আশপাশের এলাকা। এ কারণে ব্যবসায়ী, পথচারী, পাথর গুড়োর কাজে কর্মরত শ্রমিক, স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ মরনব্যাধি সিলিকোসিস রোগে আক্রান্তসহ সর্দি কাশি, জ্বরসহ নানাবিধ শ্বাসকষ্টে ভুগছে। মাক্স ও সানগ্লাস ছাড়া পাটগ্রাম উপজেলা শহর থেকে বুড়িমারী স্থল বন্দর পর্যন্ত রাস্তায় চলাচল করা দুস্কর হয়ে পড়েছে। ফলে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে বিদেশি নাগরিকরা এ স্থলবন্দর দিয়ে ঢুকেই দেশের পরিবেশ আইনের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডে প্রবেশ করছেন।
সড়ে জমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা শহর থেকে বুড়িমারী স্থল বন্দরগামী পুরো মহাসড়কের দুই পাশে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত পরিবেশে চলছে অসংখ্য পাথর ক্রাশ মেশিন। ওই মহাসড়কটির দু’পাশে রয়েছে আবাসিক ভবন, হোটেল-রেস্তোরা, বিভিন্ন দোকানপাট ও বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করে ভারত ও ভুটান থেকে আমদানিকৃত লাইমস্টোন, বড় পাথর, ডলোমাইটসহ বিভিন্ন জাতের পাথর। আর এসব পাথর ক্রাশিং করা হচ্ছে মহাসড়কের দুই পাশে বড় বড় মেশিন বসিয়ে। এ কারণে এখানে বসবাসরত মানুষ, পাথর গুড়োর কাজে নিয়জিত শ্রমিক ও দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সিলোকোসিস রোগে ও শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।
সুত্র মতে, ধুলো না উড়তে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহারে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করছে না কোনো প্রতিষ্ঠানই। ফলে বুড়িমারী জনপদের লোকজন সিলোকোসিসের মত মরণ ব্যাধির ঝুঁকিতে রয়েছেন। জনবসতিহীন এলাকায় এসব পাথর ক্রাশ মেশিন সড়িয়ে নেয়ার দাবি সাধারণ মানুষের। ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সিলোকোসিস রোগে এই এলাকার ৬৭ জন পাথর শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ বুড়িমারী ইউনিয়নের উফারমারা ঠাকুরপাড়া এলাকার দুলাল হোসেন নামে এক শ্রমিক সিলিকোসিস রোগে মারা যান। এছাড়া এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন অনেকেই।
 
বুড়িমারী স্থল বন্দরের শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরুষরা দৈনিক ৩শ’ ও নারীরা ১৮০ টাকা মজুরিতে করছেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বুড়িমারী এলাকায় যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব পাথর ক্রাশ মেশিনে শত শত শ্রমিক কাজ করছেন মাক্স বা বিশেষ পোশাক ছাড়াই। ফলে তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন সিলোকোসিস রোগে। পাথরের সিলিকন মানবদেহে প্রবেশ করে লিভার ও ফুসফুসে জমাট বেঁধে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এভাবে মানবদেহে সিলোকোসি রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে শ্রমিকরা।
 
বুড়িমারী স্থল বন্দর হাসর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজেদুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, সামসুজ্জামান জানান, মাক্স আর সানগ্লাস ছাড়া বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া শুধু নয়, ক্লাস করাও কষ্টকর। বাতাসের সাথে মিশে পাথরের ধুলো ক্লাসে পর্যন্ত প্রবেশ করছে। বিদ্যালয় থেকে বাসায় ফিরেই পোশাক ধুতে হয় ও গোসল করতে হয়। ফলে সর্দি কাশি লেগেই থাকে।
বুড়িমারী স্থল বন্দরের শ্রমিক সাদেকুল ইসলাম ও আকতার আলী জানান, ক্রাশিং মেশিনে ভাঙ্গানো পাথর গুড়ো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ধুলো শরীরে প্রবেশ করে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, জ্বর, সিলোকোসিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তারা। বিশেষ করে বিদ্যালয়গামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম বিপাকে। তাদের সারাক্ষণ রোগব্যাধি লেগেই আছে।
 
সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত ভিক্টোরিয়া মোজাইক ফ্যাক্টরির পাথর ভাঙা শ্রমিক আমজাদ হোসেন জানান, প্রথমে শ্বাসকষ্ট হয়, পরে পরীক্ষা করে জানতে পারেন সিলিকোসিস হয়েছে। বহুদিন ধরে চিকিৎসা নিলেও কার্যত কোনো উন্নতি হচ্ছে না তার।
 
বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ নিশাত জানান, ধুলো না উড়াতে প্রতিটি পাথর ক্রাশ মেশিনে ও আশপাশের এলাকায় পর্যপ্ত পানি ঢালার নির্দেশনা দেয়া হলেও অনেকেই তা মানছেন না। এসব মেশিন জনবসতিহীন স্থানে সড়িয়ে নিতে প্রয়োজনীয় জায়গা খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
 
পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আবু হাসানাত জানান, ক্রাশিং মেশিনসহ যে কোনো ধরনের পাথর গুড়ো (ধুলা) শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ভিতরে প্রবেশ করলে মরণ ব্যাধি সিলোকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করতে পারে রোগি। এছাড়াও সিওমিটি, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, জ্বরসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয় ক্রাশিং মেশিনে পাথর গুড়ো করা এলাকার ভুক্তভোগীরা।
পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম জানান, ক্রাশিং মেশিনে গুড়োর কারণে বুড়িমারীতে শুধু শিশুরা না সাধারণ নাগরিকরাও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।  এখানে যেন ধুলা-বালি না উড়ে তার জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের বলেছি। যেসব মেশিনে পানি না ছিটিয়ে পাথর ভাঙা হচ্ছে বা শ্রমিকদের মাক্স ব্যবহার করা হচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত পারিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা বেশ কয়েক দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। আমরা বলেছি আপনারা যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব বন্ধ না করেন তা হলে আমরা প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করব। জনবসতিহীন স্থানে এসব মেশিন সড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
 
এবিএন/আসাদুজ্জামান সাজু/জসিম/নির্ঝর

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত