logo
মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭
 
বহুমাত্রিক প্রতিভা

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী

নোমান উল্লাহ বাহার, ২৩ অক্টোবর, এবিনিউজ : সরকারের দমননীতির শিকার হয়ে ব্রিটিশ– ভারতের মুসলমানরা যখন অত্যাচারিত– নিপীড়িত হচ্ছিলো তখন মূলত: আলেম সমাজই মুসলিম জাতিকে উদ্ধার ও সম্মুখপানে অগ্রগামী করার জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা করেন। যে সকল আলেম মনীষী উপমহাদেশে ইংরেজের দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং যাদের আবির্ভাবে এদেশের জাতীয় জীবন ধন্য হয়েছে, তাদের মধ্যে মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি শুধুমাত্র পেশাদার ও প্রচার সর্বস্ব আলেম ছিলেন না। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। মাওলানা ইসলামাবাদী একাধারে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, শিক্ষা সম্প্রসারণের অগ্রদূত, সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং বাংলাদেশে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। ইসলামাবাদী সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক আঠারো বছর পরে অর্থাৎ ১৮৭৫ ইং সনে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার শঙ্খ নদীর তীরে অবস্থিত বরমা– আড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মুহাম্মদ মতিউল্লাহ পন্ডিত বহু ভাষাবিদ ও সাহিত্য গুণের অধিকারী ছিলেন। মাতার নাম রহিমা বিবি।

মাওলানা ইসলামাবাদীর কর্ম জীবনের সূচনালগ্নে হুগলী কলেজে শিক্ষকতার প্রস্তাব পান। তিনি আত্নকেন্দ্রিক স্বার্থ ত্যাগ স্বরূপ সরকারি কর্ম প্রত্যাখান করে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার উন্নতি কল্পে রংপুরে একটি নিউস্কিম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি সীতাকুণ্ড নিউস্কিম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মাদ্রাসায় থাকাকালে তিনি সাহিত্য সেবার প্রতি মনোযোগী হন। এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন এবং রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়েন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দালনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক সোলতান এর সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মাধ্যমে সাংবাদিকতার সূচনা করেন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় মুসলিম শিক্ষা ও সাহিত্য সম্মেলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি গঠন করে মুসলিম লেখকদের সাহিত্য ক্ষেত্রে নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য উদ্বুদ্ব করেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রামে মুসলিম সম্মেলন করেন। অবিভক্ত ভারতে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের বাংলা শাখার তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় আনজুমানে ওলামায়ে বাংলা। এ সমিতির মুখপাত্র হিসেবে আল ইসলাম পত্রিকা প্রকাশ হয়। এই পত্রিকার আবির্ভাব বাংলা ১৩২২ তথা ইংরেজি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে। মাওলানা ইসলামাবাদী আল ইসলাম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন। এ পত্রিকায় বাংলা ভাষার খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও লেখকদের মূল্যবান রচনাবলী প্রকাশ হত। বহুমুখি প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী যুগের সামগ্রিক গতিধারা সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতেন। সর্বোপরি চিন্তা–চেতনায় অগ্রসরমান, পরিশ্রমি ও উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনজুমানে ওলামা সাহিত্য সম্মেলন, শিক্ষা সম্মেলন, যুব সম্মেলন ও চট্টগ্রামে যুক্ত মুসলিম সম্মেলন আহবান করেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন ছিল ইসলামাবাদীর জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। মাওলানা ইসলামাবাদী, যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ও চট্টল নেতা মহিম দাশ প্রমুখ কংগ্রেস নেতা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। তিনি ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গ্রেপ্তার হন এবং পাঞ্জাবের মীনওয়ালী জেলে বন্দী অবস্থায় তাকে চরম নির্যাতন করা হয়। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী দেশের জন্য বিশেষ করে মুসলমানদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তির জন্য বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি এরই প্রেক্ষিতে জাতীয় ভিত্তিতে কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চট্টগ্রামে ‘টাউন ব্যাংক’ স্থাপন করেছিলেন। বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের সেবার জন্য খেলাফত স্টোর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বলকান যুদ্ধের সময় ইসলামাবাদী দেশব্যাপী গণ–আন্দোলনর সূচনা করেন। এরপর তিনি ফার্সী ভাষায় সাপ্তাহিক “হাবলুল মতিন” বাংলা সংস্করণ সম্পাদনা করেন। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে যখন উত্তর ভারতে শুদ্ধি আন্দোলন হয় তখন অনেক মুসলমান হিন্দু হয়ে যায়। ইসলামাবাদী এ শুদ্ধি আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও ইসলামের সঠিক পস্থা প্রচারের জন্য প্রাচ্যের গর্ব ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহকে উত্তর ভারতে পাঠান। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা হতে সর্বপ্রথম প্রকাশিত দৈনিক মুসলিম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক সোলতানকে তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় দৈনিক সোলতানে রূপান্তর করেন। এ বছর তিনি কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল বাংলা–আসাম ছাত্র ফেডারেশনের সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে উপমহাদেশে স্বতন্ত্র ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য চট্টগ্রামস্থ দেয়াং পাহাড়ে স্থান নির্বাচন করেন। তিনি লিখেছিলেন:

“দিয়াং পাহাড়ে উচ্চ বিস্তৃত চূড়ায়,/ স্থাপিত হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়”

মাওলানা ইসলামাবাদী পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র জাতীয় ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখালেখি করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব উপস্থাপন করার প্রয়াস চালান। পরবর্তীতে নানা কারণে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হলেও ইসলামাবাদীর আদর্শিক উত্তরসূরীরা এখনও সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে লেখনী চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তা শুধুমাত্র লেখনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এটি বাংলাদেশের একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নারী সমাজের পশ্চাৎমুখী অবস্থান দূরীকরণে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা যথোপযুক্ত করার নিমিত্তে মাওলানা ইসলামাবাদী দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম বীরাঙ্গনাদের আত্মচেতনা বিকাশের লক্ষ্যে ইসলামাবাদী বাংলা ভাষায় মোসলেম বীরাঙ্গনা গ্রন্থ লিখেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল হাই বলে হযরত মুহাম্মদের (স.) সমসাময়িককালে এবং তারপরেও মুসলিম বীরাঙ্গনাগন কিভাবে যুদ্ধ বিগ্রহে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পুরুষদের সুখ– দুঃখের অংশভাগী হয়েছেন তাঁর বর্ণনা করে বাঙালি মুসলিম মহিলারাও যাতে সেভাবে অনুপ্রাণিত হন, তার ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন তার মোসলেম বীরাঙ্গনা বইটিতে। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা ইসলামাবাদী চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম আনজুমানে ওলামায়ে বাংলা সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং ঐ সনে নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠন করেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দৈনিক ‘আমির’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রামেও তিনি হিন্দু মুসলমানদের প্রকাশিত বহু পত্রিকার সাথে নানাভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘সত্যবার্তা’ পরিচলনা কমিটির সভাপতি হন। ইসলামাবাদীর সুদীর্ঘ জীবনের প্রতিটি ক্ষণই ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং কর্মমুখর। তাঁর কর্মময় জীবন সম্পর্কে আবুল ফজল বলেন, “এক সহজাত দুঃসাহসের অধিকারী ছিলেন মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। যার ফলে অতসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় হাত দিয়েছিলেন। হাত দিয়েছিলেন অনেকগুলো সংবাদপত্র পরিচালনার, স্বপ্ন দেখেছেন আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। বলাবাহুল্য, তার বহু পরিকল্পনাই আজো অসমাপ্ত রয়ে গেছে”। মাওলানা ইসলামাবাদীর একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে মুসলিম শিক্ষা ও রাজনৈতিক সম্মেলন করে ‘‘বেঙ্গল–বার্মা ইসলাম মিশন” গঠন করেন। এই মিশনের লক্ষ্য হিসাবে কদম মোবারক ইসলাম মিশন এতিমখানা স্থাপন করেন যা বর্তমানে কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা হিসেবে সুপরিচিত। মাওলানা ইসলামাবাদীর সহকর্মীদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মাওলানা আকরাম খাঁ, মুন্সি মেহেরুল্লাহ্‌ ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অন্যতম। এরা সকলেই বাংলায় মুসলিম জাগরণ ও স্বাধীনতার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সাহিত্য সব ভাব প্রকাশের বাহন এ সত্য সম্বন্ধে মাওলানা ইসলামাবাদী ও তার সহকর্মীরা পূর্ব থেকেই অত্যধিক সচেতন ছিলেন এবং এ বিষয়ে তাঁরা এত স্থির সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন যে এ বিষয়ে পরেও তাদের মনে কোন প্রকার দ্বিধা–দ্বন্দ্ব দেখা যায় নি। তাঁদের সব চিন্তা–ভাবনাকে মাতৃভাষার সাহিত্যের ভিতর দিয়েই রূপায়িত করতে চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত মাওলানা ইসলামাবাদীর পরিচালিত আর সম্পাদিত সব মাসিক, সাপ্তাহিক আর দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধান সুর ধর্মীয় আর জাতীয় চেতনামূলক। উল্লেখ্য, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীই ছিলেন বাংলার দৈনিক পত্রিকার প্রথম মুসলিম সম্পাদক। তিনি ‘নবনূর’, ‘মোহাম্মদী’ ‘কোহিনূও’, ‘বাসনা’ ইত্যাদি পত্রিকার সাথেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মাওলানা ইসলামাবাদী যখন সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন তখনকার মুসলিম জীবনে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অসামঞ্জ্যপূর্ণ ও পশ্চাদমুখী। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তিনি সংবাদপত্র প্রকাশ করতেন। সাংবাদিকতার জন্য এত দুঃখবরণ, সংবাদপত্রের কণ্ঠকে অকম্পিত রাখার জন্য এমন একাগ্র সাধনা আর এমন নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের দৃষ্টান্ত এই উপমহাদেশে বিরল।

মাওলানা ইসলামাবাদী ছিলেন অনলবর্ষী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বক্তা। বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় সভায় তিনি বক্তৃতা দিতেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি সংগ্রামী চেতনায় মুসলিম গণজাগরণ সৃষ্টি করেন। ইসলামাবাদীর ইসলাম প্রচার বা দাওয়াতি কাজের প্রধান মাধ্যম হলো তাঁর বিশ্বস্ত মসী অর্থাৎ কলম। তিনি নিছক সাহিত্য চর্চা বা শিল্প চর্চার জন্যই লেখেন না, তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও উন্নয়ন। মুসলিমরা যখন জ্ঞান–বিজ্ঞান, সভ্যতা–সংস্কৃতি ও মননে–চিন্তনে পশ্চাৎপদ; নানা রকম অবক্ষয়, গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও অজ্ঞানতার কানাগলিতে তারা দিশেহারা; মাওলানা ইসলামাবাদীর লেখায় এসব বিষয়ে সহজ–সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় উত্তরণের প্রত্যাশা এবং উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা প্রতিভাসিত হয়। ইসলামাবাদী প্রধানত ইতিহাস মূলক রচনার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তার সমগ্র সাহিত্যিক জীবনই তিনি ইসলাম, বিশেষত তদানীন্তন ভারতীয় মুসলমানদের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক নব দিগন্তের সূচনা করেন। মাওলানা ইসলামাবাদী কত দূরদর্শী ছিলেন তা তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালেই আমরা সহজে বুঝতে পারবো। তার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ভারতে মুসলমান সভ্যতা, ভারতে ইসলাম প্রচার, নেজামউদ্দিন আউলিয়া, তুরস্কের সুলতান, মুসলমানদের অভ্যুত্থান, সমাজ সংস্কার, ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান, খগোলশাস্ত্রে মুসলমান, কনস্টানটিনোপোল, আওরঙ্গজেব, মোসলেম বীরাঙ্গনা, ইসলামের উপদেশ, পৌরণিক ও বৈদিক যুগ, রাজনীতি ক্ষেত্রে আলেম সমাজের দান, কুরআন ও রাজনীতি, কুরআনে স্বাধীনতার বাণী, ভারত–আরব সম্পর্ক, ভারত–বার্মা ভ্রমন কাহিনী, হযরতের জীবনের আদর্শ, স্পেনের ইতিহাস, ইসলামের পুণ্য কথা প্রভৃতি প্রায় শতাধিক মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। মাওলানা ইসলামাবাদী প্রথম জীবন থেকেই সেবামূলক সুদৃঢ় মনোভাব নিয়ে সমগ্র জীবনই সমাজ সম্বন্ধে ভেবেছেন, স্বপ্নের বীজ বপন করতে চেয়েছেন বহুক্ষেত্রে। পরিবেশ–পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না বলে এসব বীজের অনেকগুলোই অঙ্কুরিত হতে সুযোগ পায়নি। সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ হাবিব উল্লাহ বাহার একবার লিখেছিলেন, “সমাজের কথা ভেবে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সারা জীবন কেঁদেছেন পাগলের মত, কি হবে আমাদের ভবিষ্যত? মুসলমান লেখাপড়া শিখছে না, শিল্প–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আসছে না, খবরের কাগজ পড়ছে না, আসছে না রাজনীতি চর্চায়। উত্তর ভারতে যেমন স্যার সৈয়দ জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে কাজ করেছেন বাংলায় তেমনি কাজ করবার চেষ্টা করেছেন ইসলামাবাদী। সাফল্য হয়ত বিশেষ আসেনি, নানা কারণে কিন্তু তিল তিল করে বিলিয়েছেন তিনি নিজেকে” (দৈনিক ইনসাফ, ১৭ই কার্তিক ১৩৫৭)। মাওলানা ইসলামাবাদীর প্রচেষ্টায় এদেশে বহু পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম শহরে বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া মুসলিম হোস্টেল তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামাবাদীর প্রাণ দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত ছিল। তিনি স্বদেশকে ভালবাসতেন বলেই জনগণ তাকে নিকটের মানুষ ভাবতো। যার ফলে তিনি জনগণের ভোটে বঙ্গীয় আইন সভার ডেপুটি চীফ হুইপ নির্বাচত হন। তিনি নিঃস্বার্থভাবে নিজের অতিরিক্ত আয় পর্যন্ত অপরকে দান করে দিতেন। আইন সভার সদস্যরূপে যে ভাতা পেতেন তাও তিনি বিভিন্ন কবি–সাহিত্যিকদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন।

মাওলানা ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ন। তিনি রাজনৈতিক জীবনে বহু সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেতা হিসাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিখিল বাংলা কৃষক প্রজা সমিতির তিনি ছিলেন অন্যতম সহ–সভাপতি। তিনি এ সংগঠনের মাধ্যমে কৃষক ও মজদুর শ্রেণীকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবর্তীণ হওয়ার জন্যে ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রথমে তিনি চট্টগ্রাম মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু বাস্তবে এই সংগঠনে গরিব–দুঃখী মেহনতী মানুষের কল্যাণে কোন সমাধানের উদ্দেশ্য না দেখে এবং শুধু মাত্র বিত্তশালীদের সংগঠন উপলব্ধি করে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে নিখিল বাংলা কৃষক প্রজা সমিতিতে যুক্ত হন। জমিদারের অত্যাচারে নিষ্পেষিত বাংলার কৃষক সমাজের উন্নতিকল্পে তিনি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান এবং কুষ্টিয়া ও বরকল গ্রামে কৃষক সম্মেলন সম্পন্ন করেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে নিখিল বঙ্গ ওলামা এসোসিয়েশনের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা “ভারত ছাড়” আন্দোলনে যোগদান ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের সমর্থনে এগিয়ে আসা। ১৯৪২–৪৩ সালে নেতাজীর সাথে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তিনি ইস্টার্ন জোন (বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম) এর প্রধান সংগঠক ও সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। নেতাজীর চট্টগ্রাম সফরকালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দেয়াং পাহাড়ে ইসলামবাদীর সাথে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তৎপূর্বে মাওলানা ইসলামাবাদী চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এলাকায় ব্রিটিশ বিরোধী এবং ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের গোপন আস্তানা হিসাবে বিপুল জায়গা জমি নিয়ে এক খামার বাড়ি স্থাপন করেন। এই খামার বাড়ি থেকে তিনি নৌ–পথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতা ও কর্মীদের সাথে যোগাযোগ এবং আর্থিক সাহায্য করতেন। ব্রিটিশ গুপ্তচরেরা মাওলানা ইসলামাবাদীর এই সমস্ত বিপ্লবী কার্যকলাপ বুঝতে পারে। তখন ইসলামাবাদীর চট্টগ্রাম শহরস্থ বাড়ি, চন্দনাইশের বাড়ি, সীতাকুন্ডের খামার বাড়ি এবং কলকাতার বাসভবন একই সময়ে ইংরেজ সার্জেন্টের নেতৃত্বে বিপুল সৈন্যও পুলিশ বাহিনী দিয়ে ঘেরাও করা হয়। এ সময়েই অর্থাৎ ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর তাকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতের বিখ্যাত নেতা মহাত্মা গান্ধী, জওহর লাল নেহেরু প্রমুখের সঙ্গে দশমাস কারাভোগের পর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। গ্রেপ্তার করার পূর্বে ইসলামাবাদীর খামার বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ ব্রিটিশ বিরোধী প্রচারপত্র, বই পুস্তক ও পরিকল্পনার খসড়া নকসা ইত্যাদি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। তিনি কারামুক্তির পর শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও মিয়ানমার মোহাজেরদের জন্য নানা কল্যাণমূলক কাজ করেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী এতকাল সমগ্র উপমহাদেশের বৃহত্তর পরিধিতে কাজ করে আসছেন। তিনি শেষ বয়সে এসে উপলব্ধি করলেন, নিজের জন্মস্থান স্ব–গ্রামের জন্য এবং এখানকার দরিদ্র জনসাধারণের কল্যাণে তেমন কিছুই করেননি। লাহোর সেন্ট্রাল জেলের নিভৃতকক্ষে বন্দী অবস্থায় জন্মভূমি চট্টগ্রামের রূপ যেন ইসলামাবাদীর মানসচক্ষে ভেসে উঠেছিল। তখন তাঁর বয়স প্রায় সত্তর, ১৯৪৫ সন। মানসিকভাবে তিনি সেদিন যে সংকল্পে স্থির হয়েছিলেন তাই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন পদ্যে। তিনি লিখেছেন:

ষাটের উপরে আরো দশ বছর

বৃথায় কেটেছে জীবন আমার

দেশ–দেশান্তরে ভ্রমি সমাজসেবায়

রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য চর্চায়,

ধর্মপ্রচারের কাজে বিস্তারের শিক্ষায়,

এসব কাজেতে মোর কেটেছে সময়।

কিন্তু হায়! জন্মস্থান নিজ বাসভূমে

সাধু কার্য করি নাই, নিজ পল্লীধামে,

সংকল্প করিয়াছি জীবন সন্ধ্যায়

জীবনের অবসান করিব এথায়।

কোরানের শিক্ষা দিব জনসাধারণে

আধ্যাত্মিক দীক্ষা মন্ত্র দিব জনগণে।

দেশ দেশান্তবাসী রুগ্‌ণ লোকজন

খোদার ফজলে হবে রোগ পরিত্রাণ।

বুঁজে আসা পুকুরে পঙ্ক উদ্ধার

করে চারিদিকে ঘাট বাঁধিয়ে দিবেন

স্কুল মাদ্রাসার সাথে সাথে

প্রতিষ্ঠা করবেন পাঠাগার, হাসপাতাল

ইত্যাদি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান”।

ইসলামাবাদী আরো কত কিছু প্রতিষ্ঠায় সে পরিকল্পিত চিন্তা করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। মাওলানা ইসলামাবাদীর জীবনের শেষ পর্যায়ে অন্যান্য দেশসেবকের মত তেমন প্রাচুর্য ছিল না। কিন্তু আল্লাহর উপর বিশ্বাস ছিল অটুট। বহু হতাশা আর ব্যর্থতায়ও এ বিশ্বাসে বিন্দু মাত্র শৈথিল্য দেখা দেয়নি। তাই তিনি এ প্রসঙ্গে বিনা দ্বিধায় বলেছেন:

“এ সকল কাজে হবে লক্ষ লক্ষ ব্যয়,

আল্লাহর ভাণ্ডার তাতে হইবে না ক্ষয়”

উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর নিজের সমাধি ফলকের জন্য তিনি নিজেই যে দু’চরণ ফার্সি কবিতা এবং তাঁর নিম্নলিখিত বাংলা অনুবাদ রেখেছেন তা উদ্ধৃত করে এ অসাধারণ সমাজকর্মীর প্রতি স্মৃতি চারণ শেষ করছি।

“পথিক, ক্ষণেকের তরে বস মোর শিরে-/ ফাতেহা পড়িয়া যাও নিজ নিজ ঘরে

যে জন আসিবে মোর সমাধি পাশে / ‘ফাতেহা’ পড়ে যাবে মম মুক্তির আশে।

অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার/ ইসলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার-”।

তথ্যসূত্র:

১।  মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর রচনাবলী ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমি

২।  স্মরণিকা, কদম মোবারক মুসলিম এতিম খানা

৩।  নতুন ধারা।

৪।  মাওলানা ইসলামাবাদী, সৈয়দ মোস্তফা জামাল।ৎ
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত