logo
মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭
 

শান্তির নোবেল ও পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব

শান্তির নোবেল ও পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব

মুহাম্মদ মুসা খান, ১৯ অক্টোবর, এবিনিউজ : এবারের বহুল আলোচিত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে International Campaign to Abolish Nuclear Weapons awarded (ICN)। নোবেল জয়ী হিসেবে আইকন’ রক্ষার ঘোষণার প্রাক্কালে নোবেল কমিটি বলেছে, “পারমানবিক সংঘাতের বড় ধরনের ঝুকির মধ্যে রয়েছে বিশ্ব”। উত্তর কোরিয়ার কথা উল্লেখ করে নোবেল কমিটির নেতা বেরিট–রিজ–আন্ডারসন বলেন, “আমরা এমন একটি বিশ্বে বাস করি, যেখানে পারমানবিক অস্ত্রের ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশী”। তিনি বলেন, ‘এই পৃথিবীর বুকে মানুষ এবং সব ধরনের প্রাণের জন্যই পারমানবিক অস্ত্র একটি হুমকি। আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ এর আগে ল্যান্ডলাইম, ক্লাষ্টার বোমা, রাসায়নিক ও জীবানু অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে পেরেছে। কিন্তু তার চেয়েও আরও ভয়াবহ যে অস্ত্র, সেই পারমানবিক বোমার ব্যবহার বন্ধে এখনো কোন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়া সম্ভব হয়নি”। কমিটি আরও বলেছে, “ওই আইনী ঘাটতি পূরণ করার জন্য এক্ষেত্রে ‘আইকন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তাঁরা সামনে এনেছে, আর তা হলো– এ ধরনের অস্ত্র মানুষের যে অবর্ণনীয় দুদর্শার কারণ ঘটায়, তা কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে”। মূলত এই কারণেই নোবেল কমিটি “আইকন”কে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করেছে।

“আইকন” সীমিতভাবে প্রথমে কাজ করে অষ্ট্রেলিয়ায়। ২০০৭ সনে আনুষ্ঠানিক ভাবে অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে বিশ্বের শতাধিক দেশের শত শত এনজিও এই জোটে যুক্ত হয়ে পরমাণুু অস্ত্র বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও দুইটি এনজিও আইকন’র সাথে যুক্ত রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এবছর যে পরমাণুু অস্ত্রের বিরোধী প্রচারনার জন্য নোবেল দেয়া হলো, সেই পরমাণুু অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কতটুকু অবগত? পরমাণুু অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কিছুটা অবগত হলেও আসলেই পুরোপুরি অবগত নই। বর্তমান বিশ্বে মাত্র ৯টি দেশের কাছে যে পরিমাণ পরমাণুু অস্ত্র আছে তা দিয়ে গোটা বিশ্বকে ৩৮ বার ধ্বংস করা যাবে বলে এক তথ্যে জানিয়েছে “ষ্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনষ্টিটিউট”। এস.আই.পি.আর.আই’র তথ্যানুযায়ী মাত্র ৭টি দেশের কাছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজারের অধিক পরমাণুবিক বোমা মজুদ আছে। যেমন– আমেরিকার কাছে ৪৫০০টি পারমানবিক বোমা আছে, যার মধ্যে ১৯০০ বোমা সক্রিয়। রাশিয়ার কাছে বোমা আছে ৪৯০০টি, যার মধ্যে ১৭৮০টি সক্রিয়। ফ্রান্সের কাছে পারমানবিক ওয়ারহেড আছে ৩০০। ফ্রান্সের ১টি সাবমেরিন সার্বক্ষণিক পারমানবিক বোমা নিয়ে টহল দেয়। যুক্তরাজ্যের কাছে পারমানবিক বোমা আছে ২১৫টি, তার মধ্যে ১৫০টি এখনও সক্রিয়। চীনের কাছে আছে ২৬০টি, চীন ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বাড়াচ্ছে। ভারতের কাছে বোমা আছে ১১০ থেকে ১২০টি। ১৯৭৪ সনে ভারত পারমানবিক বোমার অধিকারী হয়। পাকিস্তানের কাছে বোমা আছে ১২০ থেকে ১৩০টি। ইহা ব্যতিতঃ উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০টি পারমানবিক বোমা আছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ইসরাইল ও ইরানের কাছেও পারমানবিক বোমা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ইসরাইল অস্বীকার করে থাকে।

প্রথম পারমানবিক বোমা বিস্ফোরন : পৃথিবী গ্রহের মানুষ প্রথম পারমানবিক বোমার ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছিল ১৯৪৫ সনের ৬ আগষ্ট। আমেরিকা যখন জাপানের হিরোশিমায় ৯ * ২ ফুট ব্যাসের ৯ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘লিটলবয়’ নামের আনবিক বোমাটি নিক্ষিপ্ত করে। দ্বিতীয় বোমাটি নিক্ষেপ করা হয় ৩ দিন পর ৯ আগষ্ট নাগাশাকিতে, ‘ফ্যাটম্যান’ নামের এই বোমার ওজন ছিল ১০ হাজার পাউন্ড। প্রথম বোমায় হিরোশিমায় ৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ মারা যায়। দ্বিতীয় বোমায় ৩৯ হাজার হতে ৮০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। এই দুই পারমানবিক বোমায় প্রায় ২ লক্ষ ৪৬ হাজার মানুষ নিহত হয়। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মারা যান ২ লক্ষ ১৪ হাজার মানুষ। আর পঙ্গুত্ববরণ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এই পারমানবিক বোমার ক্ষত এখনও বয়ে চলেছে জাপান। এই দুই বোমা সেদিন জাপানের কোমড় ভেংগে দিয়েছিল। জামার্নীর সাথে জোট বেঁধে ক্রমঃ অগ্রসরমান জাপানী সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তিতে মিত্র বাহিনীর হাতে লজ্জাজনক পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

হিরোশিমায় যখন আনবিক বোমা ফেলা হলো, তখন এর বিস্ফোরনের আলো দু’শ কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। বিস্ফোরনের আলো এতোটাই উজ্জ্বল ছিল যে, দূর দূরান্তের মানুষ ভাবলো সূর্য কি আজ দু’বার উঠলো নাকি? মুহূর্তেও মধ্যে কমলা রংয়ের আলোর কুন্ডলির মেঘ সেকেন্ডে ৩৬০ ফুট হতে উঠে গেল ৩০ হাজার ফুট উঁচুতে। আনবিক বোমার জনক ‘ওপেন হেইমার’ সে সময় স্মৃতিচারন করেছিলেন, “উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ হেসেছিলেন, কয়েকজন কেঁদেছিলেন তবে বেশীর ভাগ মানুষ ছিলেন স্তব্ধ”। বিস্ফোরনের ভয়াবহতা প্রত্য করে বিজ্ঞানী “ইসিডর বারি” প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে যে, “প্রকৃতির সমস্ত নিয়ম আজ উল্টে গেলো, মানুষ আজ থেকে পৃথিবী ধ্বংসের বিধাতা হলো”।

১৯৪৫ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রযুক্তি আজকের মত উন্নত ও শক্তিশালী ছিল না। সে সময়ের লিটলবয় নামের প্রথম আনবিক বোমাটি বানাতে ৬০ কেজি ইউরেনিয়াম–২৩৫ লেগেছিল। এটার মতা ছিল ২০ কিলোটন টিনএনটির সময়। আর আজকাল কিলোটন তো বটেই, ৫ মেগাটনও ডালভাত।

হাইড্রোজেন বোমা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমানবিক বোমার ব্যবহার আর হয়নি। কিন্তু বোমা তৈরির কাজ অব্যাহত আছে। অনেক দেশ এই বোমার অধিকারী হতে চাচ্ছে। আগের চেয়ে অনেক গুণ বেশী শক্তিশালী ও ভয়ংকর পারমানবিক বোমা হলো “হাইড্রোজেন বোমা” ও সর্বাধুনিক “নিউট্রন বোমা” তৈরি করা হয়েছে। যার ধ্বংস ক্ষমতা অনেক গুণ বেশি এবং বলা যায় অকল্পনীয়। আজ যে বোমার জন্য পৃথিবীর মানুষ আতংকিত সেটা হলো “হাইড্রোজেন বোমা”। এই বোমার অপরাম “থার্মোনিউক্লিয়ার ডিভাইস”। একে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের আনবিক বোমা। ২য় বিশ্ব যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রথম প্রজন্মের আনবিক বোমায় একটি মাত্র বিস্ফোরন ব্যবস্থা আর বর্তমানের “হাইড্রোজেন বোমায়” দু’টি বিস্ফোরণ ব্যবস্থা। ফলে এর ধ্বংস মতাও দ্বিগুণ হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাইড্রোজেন বোমাটি আছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। যার ওজন ১.২ মেগাটন বা ১২ লাখ টন। ওজনে—কম হলেও ছোট আকৃতির হাইড্রোজেন বোমা দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের স্থাপন করে ৬ হাজার কি. মি. দূরত্বেও আঘাত করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার মজুদ আছে উত্তর কোরিয়ার হাতে। এসব অস্ত্র দিয়ে চীন, রাশিয়া ও আলাসকায় আঘাত হানা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। যা পুরো পৃথিবীকেই আতংকিত করে রেখেছে।

আনবিক বোমার ভয়াবহতা সামান্য জেনেও নিশ্চয়ই এর ধ্বংস ক্ষমতা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবী যে কেমন অগ্নি চুল্লির উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। এরূপ পরিস্থিতি আনবিক বোমা বিরোধী বা পারমানবিক অস্ত্র বিরুদ্ধে প্রচাররত একটি সংস্থাকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি ‍‍“ভুল করেছেন”–এমন মন্তব্য করা সঠিক হবে কিনা ভেবে দেখতে হবে। আমাদের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। বাসযোগ্য রাখতে হবে। তাই পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত পৃথিবী আজ খুবই প্রয়োজন। ক্রমাগতঃ প্রচার প্রচারনার মাধ্যমে যদি মজুদ পারমানবিক অস্ত্রসমূহ ধীরে ধীরে ধ্বংস করে পারমানবিক অস্ত্রমুক্ত একটি পৃথিবী নিশ্চিত করা যায়, সেটাই হবে আজকের নোবেল পুরস্কারের সার্থকতা।

পারমানবিক বোমার ভয়াবহতা নিয়ে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনষ্টাইনের একটা সুন্দর উক্তি পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে চাই। বিজ্ঞানী আইনষ্টাইনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে কি ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে বলতে পারবো না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ যে লাঠি এবং পাথর দিয়ে হবে তা খুব ভাল ভাবেই বলতে পারি”। সুতরাং পারমানবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ আজকের পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র যদি ৩য় বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করে, তাহলে সেটা যে কি ভয়াবহ হবে–তা আইনষ্টাইনের উক্তি হতে সহজে বুঝা যায়।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত