বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫
logo
feb18  

আজকের তুরস্ক ও প্রেসিডেন্ট এর্দোগান

আজকের তুরস্ক ও প্রেসিডেন্ট এর্দোগান

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী, ১৮ অক্টোবর, এবিনিউজ : ২৯ অক্টোবর তুরস্কের জাতীয় দিবস। এ দিন তুরস্ক ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের সালতানাত থেকে প্রজাতন্ত্রে ফিরিয়ে আসে। যা ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর দিনগত রাত তথা ২৯ অক্টোবর। তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ যুগ যুগ যাবৎ সুসম্পর্ক। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এর্দোগানের স্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। এখানে এসে গমন করেন উখিয়া। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের করুণ অবস্থা অবলোকন করে তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন।

তুর্কি সুলতানী আমল থেকে আমাদের দেশের সাথে সুসম্পর্ক। সে সময় এর মূলে তিন কারণ। (১) মুসলিম দেশ (২) বর্তমান সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা তাদের নিয়ন্ত্রণে (৩) তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজ ক্রয় করা।

১২৮৮–১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩৭ জন সুলতান ৬৩৬ বছর ব্যাপী ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। প্রথম ৩ শ’ বছর সুলতানগণের যোগ্যতার কারণে জয় জয়কার অবস্থা ছিল। ইউরোপ, আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়ার বিশাল অংশ নিয়ে ছিল তাদের সাম্রাজ্য। শেষের ৩ শ’ বছরে যোগ্য শাসক ছিল মাত্র কয়েকজন। অপর শাসকগণ ছিলেন অযোগ্য। ছিল না তাদের চারিত্রিক গুণাবলী। এমনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যের বহু অংশ হাত ছাড়া হয়ে যায়। তুরস্কের নাজুক পরিস্থিতিতে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী সামরিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল পাশা তুরস্কের হাল ধরতে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে আসতে থাকেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ২৭ সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুল থেকে আঙ্কারায় সরিয়ে নেন রাজধানী। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর মোস্তফা কামাল পাশা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ বছরই ২৮ অক্টোবর দিবাগত রাত নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও অনুমোদনের মাধ্যমে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয়। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর জাতীয় পরিষদ কর্তৃক আইন পাস করে আতাতুর্ক তথা তুর্কি জাতির পিতা হিসেবে ঘোষিত হন মোস্তফা কামাল পাশা। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।

বর্তমান তুরস্কের পরিধি ১০ লক্ষ ১ হাজার ৫ শত বর্গ কি.মি.। যা আমাদের দেশের প্রায় ৬ গুণ বড়। মোস্তফা কামাল পাশার পিপলস পার্টি দীর্ঘ সময় ধরে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তার ইন্তেকাল পরবর্তী ক্ষমতায় আসেন ইছমত পাশা ইনুনু। পিপলস পার্টি দীর্ঘ প্রায় ৪০/৪৫ বছর যাবৎ তুরস্ককে ধর্মীয় আরবী অনুশাসন থেকে দূরে রেখেছিল। তুর্কিরা মুসলমান বিধায় তাদের মাঝে আরবী শিক্ষা, ধর্মীয় আচার–আচরণ দানা বাধতে শুরু করে। সে এক ইতিহাস। এ নিয়ে অনেক ঘাত–প্রতিঘাতের কথাও রয়েছে। তুর্কিদের মাঝে ধর্মীয় দিকে অবদানের দিক দিয়ে ক’জনের মধ্যে ফতুল্লা গুলেনকেও একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি আমেরিকায় অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। এ ফতুল্লা গুলেনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এর্দোগান।

তুরস্কে তিনি অন্যতম একজন সাহসী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলামী কল্যাণ পার্টি থেকে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে একটি ভাষণের কারণে তিনি ৪ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মধ্যপন্থি রক্ষণশীল এ.কে.পি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে নির্বাচনে জয়লাভ করে এর্দোগান প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৩–১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে এসে রাষ্ট্রপতি হন। শাসনতন্ত্র সংশোধন এবং তাঁর অনুকূলে ভোট দিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হন।

গত বছর তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হন। কিন্তু তার আহ্বানে জনগণ সাড়া দিলে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অভ্যুত্থান নিয়ে তিনি ফতুল্লা গুলেন ও তার অনুসারীদের দুষছেন। এতে তার সরকারকে উৎখাত করার জন্য আমেরিকার ষড়যন্ত্র বলে বলা হচ্ছে।

সিরিয়া ও ইরাকে গৃহযুদ্ধের কারণে তুরস্কে প্রভাব পড়ছে। এ দু’দেশের সাথে তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে। আইএসের উত্থান ইরাকে কুর্দিস্তানের গণভোটে এর্দোগানের পক্ষে নীরব থাকা কঠিন। অপরদিকে, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যায় তিনি অবদান রাখতে চায়। যেমনণ্ডকাতার নিয়ে সৌদি আরবের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তিনি তৎপর। সে লক্ষ্যে তিনি সৌদি আরব এসে বাদশাহ সালমানের সাথে বৈঠক করেন। গত ২৫ আগস্ট থেকে আরাকানে বার্মার সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কারণে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে আসতে থাকে। গতবারে তাদের ফিরিয়ে দিলেও এবার বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দেয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখের অধিক রোহিঙ্গা উখিয়া, টেকনাফে অবস্থান করছে। এর্দোগানের স্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে বাংলাদেশে আগমনের কথা আগে উল্লেখ করেছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা বিষয়ে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। তুরস্ক কোন ধনী দেশ নয়। রয়েছে কুর্দিসহ সে দেশের নানান প্রতিকূলতা। সম্প্রতি ইরাকী কুর্দিস্থানের গণভোট তুরস্ককে ভাবিয়ে তুলে।

বস্তুতঃ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এর্দোগান নিজ দেশের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের স্বার্থে ভূমিকা রাখতে চায়, রাখতে চায় অবদান। আগেই উল্লেখ করেছি তুরস্কের সাথে রয়েছে বাংলাদেশের প্রাচীনকাল থেকে সুসম্পর্ক। তার যোগসূত্র চট্টগ্রাম বন্দর। তুরস্কের সুলতানগণ সামুদ্রিক নৌযানের জন্য চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ নির্মাণ ও খরিদ করতেন। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় (তখন মিশর তুর্কি ওসমানি শাসনের নিয়ন্ত্রণে)। তুর্কি সালতানাতের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ কারখানা ছিল। তারপরেও চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজের কাঠ ও নির্মাণ প্রযুক্তি তথাকার চেয়ে মজবুত, টেকসই এবং সস্তা মনে করতেন তুর্কি সুলতানরা।

২৯ অক্টোবর তুরস্কের জাতীয় দিবস উপলক্ষে সে দেশের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি। আরও কামনা করছি তুর্কি জনগণের মহান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এর্দোগানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত