logo
বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
 

অতঃপর বাঙালির ‘আণ্ডা’ কাহিনি

অতঃপর বাঙালির ‘আণ্ডা’ কাহিনি
আবদুল মান্নান, ১৭ অক্টোবর, এবিনিউজ : ১৪ অক্টোবর সকালে দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের ডাইনিং রুমের খাওয়ার টেবিলে বসে মাসালা ওমলেটের ছোট একটা পিসে কামড় দিয়ে নোটপ্যাডে বাংলাদেশের একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার একটি উল্লেখযোগ্য খবরে চোখটা আটকে গেলো। ঢাকায় নাকি ১২ টাকা হালি দামে ডিম কিনতে গিয়ে কয়েক হাজার মানুষ ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেট এলাকা অচল করে দিয়েছিল। আমরা চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ডিমকে ‘আণ্ডা’ বলি। গ্রামে ‘বদা’। চট্টগ্রামের ভাষার বৈশিষ্ট সর্বজন স্বীকৃত। ১৩ তারিখ নাকি ছিল বিশ্ব ‘আণ্ডা’ দিবস আর সেই দিনটিকে স্মরণ করে রাখতে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল রাজধানীর খামার বাড়িতে ১২ টাকা হালি দরে ডিম বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল। আয়োজকরা ভাবতে পারেনি যে বাঙালি ‘আণ্ডা’ নিয়ে এমন একটা তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দাঙ্গা পুলিশ এসে লাঠি চার্জও করেছিল। ‘আণ্ডা’ কিনতে ডাণ্ডার থেরাপি সম্ভবত বিশ্বে এই প্রথম। এই আণ্ডা বিষয়কে আবার নানাজনে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নতুন প্রজন্মের একজন সাংবাদিক বাঙালির প্রোটিন ও পুষ্টি  প্রীতি দেখে বেশ আনন্দিত হয়েছেন। একজন আয়োজকদের সমালোচনা করেছেন ‘আণ্ডা’র কারণে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মানুষের মাথা হেঁট হয়েছে সেই কারণে। একজন কট্টর বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বিশ্লেষক ‘আণ্ডা’ নিয়ে এই যুদ্ধকে এই বলে বিশ্লেষণ করেছেন যে ‘আণ্ডা’ নিয়ে এই যুদ্ধ প্রমাণ করে বাংলাদেশে শোষক ও শোষিতের মাঝে কী চরম বৈষম্য বিরাজ করে। তিনি লিখেছেন বাংলাদেশে এখন ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটতরাজের মধ্যে ২০ শতাংশ মানুষ ভালো অথবা খুব ভালো আছে। বাকি ৮০ শতাংশের অবস্থা খারাপ অথবা খুব খারাপ। এই ৮০ শতাংশ মানুষই ১৩ অক্টোবর ‘আণ্ডা’র যুদ্ধে সামিল হয়েছিল। সংবাদমাধ্যম খবর দিচ্ছে সেই দিবস ‘আণ্ডা’র যুদ্ধে সামিল হতে উত্তরা, আবদুল্লাহপুর পুরান ঢাকা হতেও অনেকে গাড়ি নিয়ে খামার বাড়িতে এসে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলেন। ৮০ শতাংশ মানুষের মধ্যে যে গাড়ির মালিকও আছে তা জেনে বেশ আনন্দিত হয়েছি।
 
‘আণ্ডা’ নিয়ে আমার স্মৃতি অম্লমধুর এবং বেশ চমকপ্রদ। ছোটকালে আমার মা বাড়িতে গরু আর হাঁস-মুরগি পালতেন। গরুর দুধ আর ‘আণ্ডা’ পাড়ার কয়েক গৃহস্থের কাছে মা বিক্রি করতেন। তখন এক টাকায় পনেরো থেকে ষোলটা ডিম পাওয়া যেত। হাঁসের হলে গোটা দুই বেশি মিলতো। যেদিন বাবা বাজারে যেতে পারতেন না সেদিন মা পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে একটি আস্ত ‘আণ্ডা’ ভেজে আমাদের তিন ভাই-বোনকে ছোট ছোট পিস করে ভাতের সঙ্গে খেতে দিতেন। একই ডিমের আরও দুটি পিস হতো যার একটি বাবার জন্য অন্যটি মার জন্য তুলে রাখতেন। একটি আস্ত ‘আণ্ডা’ কদাচিৎ পাতে পড়েছে। এটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকা। সে সময় বামপন্থীদের তেমন একটা উত্থান হয়নি। হলে আমরা নিশ্চয় সর্বহারার দলে থাকতাম। একটি আস্ত ‘আণ্ডা’ কিনে খাওয়ার সৌভাগ্য হলো যখন মধ্য ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তাও দুই শত ত্রিশ টাকা বৃত্তি পাওয়ার কল্যাণে। বাবা মাসে দেড় শত টাকা মনিঅর্ডার যোগে পাঠাতেন। মোট তিনশত ত্রিশ টাকা নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে হলে থাকি। হল কেন্টিনে সকালের নাস্তা হিসেবে ডবল ‘আণ্ডা’ ওমলেট। চট্টগ্রামের মানুষ সবসময় ওমলেটকে মামলেট বলে। ঢাকায় এসে প্রথম জানলাম মামলেট নয় ওমলেটই শুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা করার সময় একবার এক চীনা রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে এগ ফুইউং অর্ডার দেই। সুন্দরী ওয়েট্রস সামনে হাজির করে দুটো কুচো চিংড়ি দেওয়া একটি ওমলেট। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে মামলেট-ওমলেট হয়েছে আর যুক্তরাষ্ট্রের চীনা রেস্তোরাঁয় ওমলেট হয়েছে এগ ফুইউং। আমার ছাত্র আসিফ যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। হার্টের সমস্যা হয়েছে মনে করে ডাক্তার দেখাতে গেলো। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধ লিখে বললেন ‘আণ্ডা’ খাওয়া যাবে না। আসিফ ডাক্তারকে বলে যখন অর্থভাব ছিল তখন ‘আণ্ডা’ খাওয়ার জন্য খুব ইচ্ছে করতো। ‘আণ্ডা’ ক্রয় করার ক্ষমতা ছিল না বলে খেতে পারিনি। এখন পয়সা কামাচ্ছি। দিনে কয়েকটা ‘আণ্ডা’ কিনে খেতে পারি। আর তখন আপনি বলেন খাওয়া যাবে না। এটি কেমন বিচার? একবার একজন সরকারি কর্মকর্তা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শর্ট ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলেন। ছয়মাস সকাল বিকাল ‘আণ্ডা’র ওপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছেন। তার হালাল-হারামের সমস্যা।
 
কারও রক্তে কোলেসটোরেল পাওয়া গেলে ডাক্তারের প্রথম পরামর্শ ‘আণ্ডা’ খাওয়া বন্ধ। খেলেও কুসুম খাওয়া যাবে না। আমার বাল্যবন্ধু শহীদ যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি চাকরি করে। তার বাড়িতে কয়েকদিন অবস্থান করার সুবাদে দেখি সে আর তার স্ত্রী সকালে একটা করে ‘আণ্ডা’ কুসুমটা আলাদা করে ওমলেট করে খায় আর কুসুমটা একটি কাঁচের পাত্রে ফ্রিজে রেখে দেয়। শনিবারে দু’জনই ওই কুসুম মাথায় মেখে ঘণ্টা খানেক বসে থাকে। ওতে নাকি চুল গজায়। এই বয়সে তাদের এই শখ কেন তা জানতে পারিনি। বছর দু’এক আগে দেখেছি সেই বন্ধুর মাথা অনেকটা ফতুল্লা স্টেডিয়ামের আকার ধারণ করেছে। হঠাৎ করে একদিন দেখি ‘আণ্ডা’ নিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মত পাল্টেছে। যে কোনও বয়সেই যে কেউ দৈনিক একটি ডিম খেতে পারে। কুসুমটা অবশ্যই খেতে হবে কারণ আসল পুষ্টি ওই কুসুমে। ভারতের ‘আণ্ডা’ বোর্ড ‘আণ্ডা’ খাওয়াকে জনপ্রিয় করার জন্য একটি বিজ্ঞাপন চিত্র বানিয়ে তাতে একটা গান জুড়ে দিয়ে বললো ‘আণ্ডাকে ফান্ডে হার রোজ এক আণ্ডে সানডে হো এয়া মান্ডে’ । এই প্রচার চিত্রের কারণে ভারতে নাকি ‘আণ্ডা’র চাহিদা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার কলকাতার বন্ধু কাজলকে জিজ্ঞাসা করি দুপুরে কী দিয়ে খেয়েছে। তার চটলদি উত্তর ‘আজ একটা ডিমের অর্ধেকটাই খেয়ে ফেল্লুম’। সঙ্গে নাকি কুচো চিংড়িও ছিল। দেখি তাতেই সে বেশ আনন্দে আছে। একবার এক টিভি প্রযোজককে প্রস্তাব দেই আমি তাদের একটা রান্নাবান্নার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাই। সে অবাক হয়ে আমার কাছে জানতে চায় আমি কী রান্না করবো। বলি ‘আণ্ডা’ সিদ্ধের বিভিন্ন পদ্ধতি। যেমন হাফ বয়েল, নরমাল বয়েল আর মিলিটারি বয়েল। প্রযোজক বলেন প্রথম দুটিতো বুঝলাম, মিলিটারি বয়েল কী। তাকে বলি ‘আণ্ডা’কে এমনভাবে সিদ্ধ করতে হবে যে তা পাথর হিসেবে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর দিকে ছুঁড়ে মারা যাবে। যখন আধুনিক অস্ত্রের প্রচল হয়নি তখন নাকি এই রেওয়াজের প্রচলন ছিল। প্রযোজক জানালো তিনি আমাকে জানাবেন। এখনও তার ডাকের অপেক্ষা করছি।
 
১৩ তারিখের ‘আণ্ডা’র লড়াই না হলে আমাদের অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত। যেমন গাড়িওয়ালা সর্বহারা। পুষ্টির জন্য বাঙালি ‘আণ্ডা’ যুদ্ধের ময়দানে নামতেও প্রস্তুত। দুধও খুবই পুষ্টিকর খাবার। বিশ্ব দুগ্ধ দিবস আছে কিনা জানি না। না থাকলে তা বাংলাদেশ চালু করতে পারে। হাত ধোওয়া দিবস থাকেল দুগ্ধ দিবস কেন থাকবে না? এমন একটি দিবস ঘোষণা করে সে দিন পাঁচ টাকা লিটারে দুগ্ধ বিক্রির ব্যবস্থা করা হোক। তখন বিশ্ব দেখবে বাংলাদেশে দুধের নহর বইছে। কথায় বলে বিনা পয়সায় পেলে বাঙালি আলকাতরাও খেতে চায়। সেটারও ব্যবস্থা হোক না। চাহিদা থাকলে জোগান দিতে অসুবিধা কোথায়? এটা অর্থনীতির কথা। সব শেষে ‘আণ্ডা’ জিন্দাবাদ।
 
লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত