logo
বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
 

রোহিঙ্গা সংকট: জাতিসংঘের আরো জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন

রোহিঙ্গা সংকট: জাতিসংঘের আরো জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু, ১৭ অক্টোবর, এবিনিউজ : বছর কুড়ি আগে বার্মার সামরিক সরকার সাবেক বার্মার নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রেখেছিল কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে এখনো বার্মা নামটি প্রচলিত রয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র।৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও মিয়ানমার বাংলাদেশের পক্ষে কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং বুদ্ধিজীবি মিয়ানমারে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সীমান্তঘেষাঁ এই দুই দেশের মধ্যে সীমিত বাণিজ্য হয়, যোগাযোগ হয়। নাফ নদী সংক্রান্ত বিরোধ বাদ দিলে স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকের ইতিহাসে বোধহয় দুই দেশের মধ্যে তেমন একটা উল্লেখযোগ্য মনোমালিন্য হয়নি। একসময় দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে সীমিত যোগাযোগ থাকলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার পরস্পরের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান না হলে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কুটনৈতিক কোন সম্পর্কই যে টেকসই হবে না সেটা পরস্পর প্রতিবেশী এই দুই দেশকে আরো বেশি উপলব্দি করতে হবে। বিশেষ করে মিয়ানমারকে।

বাংলাদেশের সাথে সত্তরের দশকে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ এবং স্থায়ী কোন সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশকে এখনো চরম ভুগতে হচ্ছে। মিয়ানমারে ১৯৭৮ সালে ‘কিং ড্রাগন অপারেশন’ চালানোর মাধ্যমে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা নিপীড়ন সময়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। সত্তরের দশক থেকে কখনো দাঙ্গা কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অবয়ব ২০১২ সাল থেকে চরম উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। গত বছরের অক্টোবরের দমন-নিপীড়নের রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৪ আগস্ট থেকে আবার রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। চরম উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠার বিষয় হল এবারের নিপীড়ন সবথেকে ভয়াবহ এবং দানবীয়। এক বছরের মাথায় পরপর দুই বার একই ঘটনার জের ধরে একই অভিযোগে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্বিচারে নিপীড়ন করা হচ্ছে। চরম হতাশার দিক হল নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বিশ্ব প্রতিবাদমূখর হলেও মূলত এখনও মিয়ানমারের উপর তাদের কার্যকর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর (বাংলাদেশ সময় ২৯ সেপ্টেম্বর) নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বের নজর ছিল ঐ বৈঠকের দিকে।

আমরা মনে করি মানবিক এই সংকট কাটাতে হলে জাতিসংঘের আরো জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

একটি জাতিগোষ্ঠীর উপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যুগ যুগ ধরে যে নিপীড়ন চালাচ্ছে এটা ঘোর মানবাধিকার লংঘন। রাখাইনে জঙ্গি, বিদ্রোহী এবং সন্ত্রাসবাদী দমনের নামে সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সামরিকজান্তার নির্দয় অভিযানে সৃষ্ট মানবিক এই সংকটকে কোন অজুহাত কিংবা যুক্তিতে আড়াল করা যাবেনা। মূলত, মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে।

পৃথিবীর উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত কোন দেশে অপরাধ হয়না? অপরাধকারীরা জাতি এবং ধর্ম পরিচয়ে কোন না কোন জাতির জনগোষ্ঠীভুক্ত হয়ে থাকে। তাদের গুটি কয়েক লোকের জন্য এভাবে সমগ্র জাতি গোষ্ঠীর উপর নিপীড়ন চালানো যায়না। এটাকে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাশূন্য করার একটি পরিকল্পিত দমন-পীড়ন অভিযান বলা যেতে পারে।

আমরা আশা করি মিয়ানমার মানবাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করতে সচেষ্ট হবে এবং নিপীড়ন বন্ধ করে রাখাইন থেকে বিতাড়নের শিকার বাংলাদেশে আশ্রিত তাদের দেশের সকল রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্মানের সাথে ফিরিয়ে নিতে আন্তরিক এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক: প্রজ্ঞানন্দ শ্রমণ (ভিক্ষু); কক্সবাজারের রামু বৌদ্ধ বিহারের ধর্মীয় গুরু। এর বাইরে নিয়মিত লেখালেখি করেন। মূলত লিখেন কবিতা ও প্রবন্ধ। এছাড়া পত্রপত্রিকায় আর্টিকেলও লিখে থাকেন। ‘রামু’ নামে একটি ত্রৈমাসিকের সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি।

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত