logo
সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
bijoy

স্তন ক্যান্সার: সচেতনা প্রেক্ষাপট এবং প্রেক্ষিত

স্তন ক্যান্সার: সচেতনা প্রেক্ষাপট এবং প্রেক্ষিত

ডাঃ বন্দনা চক্রবর্তী, ১২ অক্টোবর, এবিনিউজ : অক্টোবর মাস, স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস। বিশ্বের সব দেশের মত বাংলাদেশেও কিছু কিছু স্তন ক্যান্সার সচেতনতা আলোচনা, সেমিনার , সিম্পোজিয়াম হচ্ছে এবং মাস ভরেই। গোলাপি ফিতা, স্তন ক্যান্সার সচেতনতার প্রতীক। অনেকেই এই ফিতার মাধ্যমে তাদের সচেতনতা, সহযোগীতা প্রকাশ করছেন স্তন ক্যান্সার বিষয়ে।

ষোল কোটি জনগোষ্ঠীর এই বাংলাদেশেস্তন ক্যান্সার হচ্ছে, নারী মৃত্যুর অন্যতম  প্রধান কারণ। ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর এক নম্বর কারণ। আমাদের দেশে স্তন ক্যান্সারের ইন্সিডেন্স, মানে একটি নিদৃষ্ট সময়ের মধ্যে (প্রতি বছর ) নুতন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হলো ১ লক্ষে ২২.৫ জন এবং প্রিভেলেন্স বা বিরাজমান স্তন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১ লক্ষে ১৯.৩ আর এদের বয়স হচ্ছে ১৫ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের জরীপে দেখা  যায় বাংলাদেশে ১৬.৯ %  মৃত্যু হয় স্তন ক্যান্সারের জন্য। সারা বিশ্ব জুড়েই স্তন ক্যান্সারের হার বেড়ে চলেছে। দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া তে বলা হচ্ছে স্তন ক্যান্সার এপিডেমিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশে দেখা যায় স্তন ক্যান্সার মেনপোজ হয়ে গেছে এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের হার বেশি। কিন্তু বাংলাদেশ সহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে প্রজনন সক্ষম বা মেনপোজের কাছাকাছি বয়সের মহিলাদের মধ্যে এই হার বেশি। দেখা গেছে ২১ বছর থেকে ৫৩ বছর বয়সী মহিলাদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১%। আরও একটি বিষয় বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত মৃত্যুর হার  বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলের এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মহিলাদের ক্ষেত্রে বেশি।

তথ্য বা উপাত্ত সাজানোর উদ্দেশ্যে এই লেখা নয়, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্তন ক্যান্সার বিরুদ্ধে কিভাবে সচেতন হতে পারি, কিভাবেই কমিয়ে আনা যায়  মৃত্যু হার, অসুখ পরবর্তী রুগ্নতা কমিয়ে আনা। এসবের ক্ষেত্রে দর্শন একটাই, সেটা হচ্ছে ক্যান্সার হচ্ছে কিনা দেখা এবং হলে প্রাথমিক অবস্থায় নির্নয় করা।তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো এর ব্যাপকতাকে বোঝানোর চেষ্টা। যদিও ক্যান্সার একবার হলে রোগীকে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। আশার কথা হলো স্তন ক্যান্সারের খুব ভালো চিকিৎসা এখন আছে এবং তাতে রোগী ভাল থাকার হার অন্যান্য ক্যান্সারের থেকে অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে স্তন ক্যান্সারে সারভাইভাল রেট(বেঁচে থাকার হার) ৫ বছর পর্যন্ত ৯০%, ১০ বছর পর্যন্ত ৮৩%। যদি ক্যান্সার শুধু স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে এই হার বেশি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে ৬১% কেস মেটাস্টাসিস বা অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ধরা পড়ে। সুতরাং আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। দরকার চিকিৎসা। খুব প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে যে স্তন ক্যান্সার হচ্ছে কিনা বা হলে যাতে প্রাথমিক অবস্থায় যাতে  নির্নয় করা যায়  সেদিকে সতর্ক থাকাই হচ্ছে আমাদের নারীদের প্রধান দায়িত্ব।

প্রথমেই জানতে চেষ্টা করি, কেন হয় স্তন ক্যান্সার। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে যে, একজন মেয়ে শুধু মেয়ে বলেই তার স্তন ক্যান্সারের হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের থেকে ১০০% বেশি। পুরুষদের ও স্তন ক্যান্সার হতে পারে। স্তন ক্যান্সার রোগ টা হচ্ছে  স্তনের কোন একটা কোষ হঠাৎ করে স্বাভাবিক বৃদ্ধি অনুসরণ না করে  এলোমেলো ভাবে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পেতে একটা টিউমার বা স্ফীত অংশ তৈরি করে এবং যে বৃদ্ধিকে শরীরের প্রাকৃতিক নিয়ম রুখতে পারে না। কোষ যে কেন এই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে তার প্রকৃত কারণ এখনো আবিষ্কার হয়নি। আর সেইজন্যই ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা বা প্রতিরোধ এতো ভয়াবহ। এ যেন ছায়ার সাথে যুদ্ধ। অনেকটাই অচেনা শত্রু। তবে অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে।যেমন স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রেবিজ্ঞানীরা দেখেছেন দুটো জিন ( বিআরসিএ-১ ও বিআরসিএ-২) যদি  পিতা মাতার কাছ থেকে ত্রুটি নিয়ে সন্তানদের মধ্যে আসে, সেক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৫% থেকে ১০% বেড়ে যায়। সেইজন্য স্তন ক্যান্সারকে বলা হয় হেরিডিটারি বা উত্তরাধিকারিক যোগ থাকে। প্রথম ধাপের আত্মীয় যেমন মা, বোন, কন্যার যদি স্তন ক্যান্সার হয় বা থাকে তাহলে দ্বিগুণ আশংকা থাকে।  মাসি, পিসি, দিদিমা, ঠাকুমা যে কারো থাকলেই আশংকা বেড়ে যায়।বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে স্তন ক্যান্সারের আশংকা বাড়তে থাকে। যদিও আমাদের দেশে স্তন ক্যান্সার অল্প বয়সী মেয়েদের মধ্যে অনেক দেখা যায়। স্তন ক্যান্সার মাসিকের সাথেও সম্পর্কিত। যদি খুব অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয় বা ৫৫ বছরের পরে মাসিক বন্ধ হয়, তাহলে অন্যান্যদের চাইতে কিছুটা রিস্ক বেশি।  কোন কারণে যদি বুকে রেডিয়েশন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, সেটাও একটা আশংকার বিষয়।

মেয়েদের কিছু বিনাইন বা সাধারণ স্তন রোগ আছে, যেগুলোতে খুব সামান্য আশংকা আছে ক্যান্সার হওয়ার।

এছাড়া জীবন যাত্রার সাথে স্তন ক্যান্সার যুক্ত। অতিরিক্ত ওজন, কায়িক শ্রম না করা বা কম করার সাথে বিশেষ ভাবে সম্পর্কিত। যাদের ওজন বেশি এবং যারা কম পরিশ্রম, কম ব্যায়াম, কম হাঁটেন তাদের সম্ভাবনা থাকে বেশি। সন্তান হীনতা বা সন্তানকে স্তন পান না করানো স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা কিছু হলেই বাড়িয়ে দেয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ইনজেকশন বা অন্য কোন হরমোন যুক্ত জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বেড়ে যায়। তবে এসব পদ্ধতি ছেড়ে দেওয়ার পর সেই আশংকা কমে আসে কিছুদিনের মধ্যেই। মেনপোজের পর শরীরে নারীদের হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেষ্ট্রেরন কমতে থাকে ফলে নারীদের লাবণ্য কমা, হাড়ের ঘনত্ব কমা, হঠাৎ করে গরম বোধ করা, ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এর থেকে মুক্তি পেতে অনেকে হরমোন থেরাপি (এইচ আর টি) নেয়। এই থেরাপি নেওয়া স্তন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। আরও কিছু ব্যাপার যেমন পরিবেশের রাসায়নিক এবং আণবিক দূষণ, ধূমপান সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে, মদ্যপান( আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তেমন প্রযোজ্য নয়), রাত্রের শিফটের কাজ, বা খাদ্যের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সামান্য হলেও যুক্ত এবং এসব ব্যাপারে এখনো গবেষণা চলছে।  

আমাদের মত নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে, শিক্ষার হার কম, বিশেষ করে মেয়েদের। আরো নিদৃষ্ট করে বলা যায় স্বাস্থ্য শিক্ষা একেবারে নেই বললেই চলে। অনেকেই  গ্রাজুয়েট বা মাস্টার্স ডিগ্রীধারী হয়েও তাদের বেসিক স্বাস্থ্য ধারণাটা নেই, শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে। একজন মেয়ে জানে না তার স্ত্রী অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নাম বা আকৃতি সঠিক করে। অথবা জানে না বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঠিক কাজ। শিক্ষার ব্যাপারটা এলো এই কারণে যে, শিক্ষা দেয় জানার সুযোগ আর জানলেই তার বিরুদ্ধে অন্তত সতর্ক থাকা যায়।

এই আলোচনায় তাই খুব সংক্ষেপে স্তন ক্যান্সারের মৌলিক কিছু কথা আলোচোনা করলাম। এখানে জেনেটিক যে ব্যাপারটা বলা হয়েছে,সে ক্ষেত্রে একজন নারীর তেমন কিছু করার আছে এমন কিন্তু নয়। কিন্তুযদি একজন নারী জানেন তার পরিবারের নিকট রক্ত সম্বন্ধীয় আত্মীয়ের কেউ স্তন ক্যান্সারে ভুগেছেন বা ভুগছেন তাহলে তিনি নিজে সতর্ক হবেন। তাহলে তাকে ৪০ বছর বয়স হতে বা চিকিৎসকের পরার্মশ অনুযায়ীম্যামোগ্রাম নামক এক্সরে করাতে হবে। উপরন্তু তার করনীয় হবে নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা। যে কোন চিকিৎসকের কাছে গেলেই তিনি দেখিয়ে দিয়ে পারেন বা এখন ইউটিউবে ও কিভাবে পরীক্ষা করতে হয় সেই ভিডিও দেখে সহজ এই পরীক্ষাটা করা যায়। এটা প্রতি মাসে একদিন নিদৃষ্ট সময়ে করতে হয় এবং নিজস্ব ডায়েরীতে নোট রেখে দিলে ভাল হয়।এগুলো করার উদ্দেশ্য হচ্ছে যদি কোন ম্যালিগনান্ট (ক্যান্সার)টিউমার স্তনে হয় এবং নিয়মিত পরীক্ষার ফলে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরে, তাহলে তা চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময় যোগ্য। যত প্রাথমিক অবস্থায় রোগটা ধরা পরবে তত রোগীর জন্য ভাল, মানে জীবনের ঝুঁকি ততই কমথাকবে।

একজন মেয়ের শারীরবৃত্তের কারণেই তাকে হিসাবী হতে হয়। হিসাবটা হচ্ছে, তাকে তার মাসিকের হিসাব রাখতে হয় বা উচিৎ। তার বিবাহিত জীবনের হিসাব, গর্ভধারণের কথা, যৌন মিলনের ক্ষেত্রে অসামাজস্য গুলো মনে রাখা একান্ত দরকার। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কথা,  তার শিশুকে স্তন পান করিয়েছেন কিনা ইত্যাদি হিসাব। এটাকে আমি হিসাব বলছি এই কারণে যে এই অতি সাধারণ কথা গুলো আমাদের নারীরা কিছুদিন আগ পর্যন্ত তো একদমই ঠিকমত বলতে পারতেন না। বেশির ভাগ নারীর কাছে একেবারেই অর্থহীন ছিল। এখন চিত্র অনেকটাই ভিন্ন কিন্তু সেটাও শহর এবং শিক্ষিত সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। নারী পাঠকদের কাছে আমার লেখা বিরক্তিকর হতে পারে, কিন্তু এ আমার চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতা। মনে হতে পারে, হায়রে পুরুষদের তো কোন ঝামেলা নেই। সৃষ্টির সেরা জীব যদি মানুষ হয় তাহলে নারী হচ্ছে শ্রেষ্টতম, কারণ মানব সন্তান  জন্মদান করে নারী। সেদিক থেকে তারা অনন্যা। নিজেদেরকে হেয় না ভেবে শ্রেষ্ট মানুষ হিসাবে ভাবতে শিখতে হবে নারীদেরই। আর দাম্পত্য জীবনে পুরুষেরা অনায়াসেই এই সব হিসাবের সহযোগী হতে পারেন, বন্ধুর মত। অবিবাহিত মহিলার জীবনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য হিসাব রাখার সাথে সাথে এই সাধারণ কথা গুলো মোটেও কঠিন কিছু নয়। শারীরবৃত্তের এই স্বাভাবিক ব্যাপার গুলো যদি একজন নারী ঠিকমত খেয়াল রাখেন তাহলেই এর থেকে যে কোন ব্যাত্যয় বা বিচ্যুতি তার চোখে সহজেই ধরা পড়বে। তখনই স্তন ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার (জরায়ুর মুখের ক্যান্সার) ধরা পড়া একেবারেই কঠিন থাকবে না।

এরপরে আসছে নিজের ওজন, দৈহিক পরিশ্রম তথা দৈন্দিন ব্যায়াম করা, হাঁটা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরকে সচল রাখা একান্ত প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে ওজন এবং কম কায়িক শ্রমের সাথে স্তন ক্যান্সার খুব ভালোভাবেই যুক্ত। শুধু তাই নয় অন্যান্য অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।  একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে আমাদের দেশের খেঁটে খাওয়া নারীদের স্তন ক্যান্সার তুলনা মূলক ভাবে কম। যদিও এ বিষয়ে কোন গবেষণা মূলক তথ্য আমি পাইনি। আমাদের দেশের নারীরা ধূমপানে আসক্ত খুব কম, কিন্তু পুরুষরা নিজেদের ধূমপান বন্ধ করে নিজেদেরকে এবং ঘরের নারীদেরকে রক্ষা করতে পারেন অনায়াসেই। তবে পানের সাথে জর্দা বা দোক্তা, গুল সমান ক্ষতিকারক।

জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার নিয়ে কোন সংশয় না রেখে, পাশে যে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য কর্মীরা আছেন তাদের পরামর্শ মত চললেই হবে। তবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে এইচ আর টি বলে যে হরমোন থেরাপির প্রচলন সমাজের কিছু অংশের নারীদের মধ্যে আছে , সেটা সব সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণ মাধ্যমে নিতে হয়। সব থেকে ভাল হয় ঐ থেরাপি না নিয়ে খাদ্যের মাধ্যমে শরীরের হরমোনের অভাব অনেকটাই পূরণ করে দৈহিক সতেজতা এবং অষ্টোয়ীওপরোসিস থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। তিসি বা সয়াবিন এক্ষেত্রে কার্যকরী। পশ্চিমা দেশের নারীরা ও এখন এইচআরটি থেরাপি ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। শিশুকে স্তন পান করানো উচিত দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত। এতে শিশু এবং মা, দুজনরেই উপকার নানা ভাবে। পরিবেশ দূষণ রোধ সম্মিলিত দায়িত্ব,নারীরাও তার অংশীদার। রোজকার খাবার একটা মুখ্য বিষয় রোগমুক্ত থাকার জন্য। সুষম খাবার বা ফল সবজী খাবারের তালিকায় বেশি থাকতেই হবে।

কারো কাছে বিষয়গুলো অতি সাধারণ মনে হতে পারে আবার কারো কাছে মনে হতে পারে ‘এ আবার এমন কি’, ‘ এইসব দিয়ে কি স্তন ক্যান্সার রোধ করা যায়’?  বাস্তবিক ভাবেই এই সাধারণ ব্যাপার গুলো চর্চার মধ্যে নিয়ে এলে আসলেই স্তন ক্যান্সারের আশংকা এবং মৃত্যু ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। পশ্চিমা দেশের নারীরা এসব চর্চার মাধ্যমেই স্তন ক্যান্সার এবং মৃত্যু ঝুঁকি কমিয়ে এনেছেন উল্লেখ্য যোগ্যভাবে। এই সব সাধারণ ব্যাপার গুলোর সম্মিলিত ফল আমাদের নারীদেরকে বহুলাংশে সুস্থ রাখতে পারে।

আরও একটা ব্যাপার প্রয়োজনীয় ব্যাপার হচ্ছে বাঙালি নারীরা লাজুক এবং নিজের প্রতি যত্নশীল একেবারেই নয়। তাদের কাছে পরিবার মুখ্য, নিজে নয়। লজ্জার কারণে স্তন বা নারী অঙ্গের কোন সমস্যা হলে তারা সহজে মুখ খুলতে চায় না। পুরুষ চিকিৎসকদের কাছে তারা স্বচ্ছন্দ নয়। এই লজ্জা এবং নিজের প্রতি অবহেলা তাদেরকে অনেক সময় মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়। রোগটা এমন পর্যায় পৌঁছায় , তখন কিছু করার থাকে না। পরিবারের পুরুষদের দ্বায়িত্ব এক্ষেত্রে অনেক বেশি। তাদের পাশে থাকার মনোভাব একজন মা, বোন, কন্যা, স্ত্রীকে রোগমুক্ত রাখতে এবং রোগাক্রান্ত হলে সারিয়ে তুলতে পারে। পরিবারের পুরুষদের অবহেলা আমাদের নারীদেরকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, বহুলাংশে। তাই সব ক্ষেত্রে পুরুষদের পর নির্ভরশীল না হয়ে কিছুটা নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার সাধারণ পদ্ধতি মেনে নিজেকেই চলতে হবে। এটুকু সচেতনতা একজন নারীর না থাকেলই নয়। নারীর অঙ্গের অসুখ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। এই অসুখ যে কোন সময় যে কারো হতে পারে। চোখের বা পেটের অসুখ  যদি লজ্জার ঘটনা না হয়, তাহলে স্তনের অসুখ কেন লজ্জার হবে!! পুরুষদের যৌনাঙ্গে বিভিন্ন অসুখ হয়। সেটা কেন লজ্জার নয়! এটা মানসিকতা। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নারীদের নিজেদেরকেই। সাথে সাথে বেরিয়ে আসতে পরিবারের, সমাজের পুরুষদের।

উন্নত দেশে সরকারের চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীদের স্তন ক্যান্সার রোধের স্ক্রিনিং বা ছেঁকে বের করবার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে এমন কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের চিকিৎসকদের দায়িত্ব অনেক। তারই সব থেকে বড় শিক্ষক। একজন নারী রোগী এলে তাদের কিভাবে স্তন ক্যান্সার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে তার জন্য পাঁচ মিনিট সময় ব্যয় করলেই অনেক। কারণ শিশুরা যেমন শিক্ষকদের কথা মেনে চলে বেশি, তেমন যে কোন রোগী চিকিৎসকদের মুখের কথার মূল্য দেয় অনেক বেশি। চিকিৎসকদের ও রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে স্ব স্ব ভাবেই উদ্যোগী হলে আমাদের নারীরা উপকৃত হবে।  অন্যথায় যারা সচেতন মহিলা আছেন, তারা নিজ উদ্যোগে, চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নিয়ে ম্যামোগ্রাম পরীক্ষা (এক্সরে জাতীয়) করিয়ে নিতে পারেন। মনে রাখতে হবে এটা একটা সহায়ক পরীক্ষা তবে শত ভাগ সঠিক নয়। অনেকেই এই এক্সরে জাতীয় পরীক্ষায় আগ্রহী নয়, রেডিয়েশন সম্মুখীন হবেন ভেবে। উন্নত দেশগুলোতে স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে ম্যামোগ্রামই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্বীকৃত।  সহায়ক পদ্ধতি হিসাবে মাসে একবার সব বয়সী মেয়েরা নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করে দেখা। খুব সহজ পরীক্ষা। স্নানের সময় বাথরুমে আয়নার সময় দাঁড়িয়ে করা যায় অনায়াসে। ছবি দেওয়া হলো সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশনের। ইউটিউবে খুব ভাল ভাবে দেখানো আছে। ‘সেলফ এক্সামিনেশন ব্রেষ্ট’ সার্চ দিতে হবে। শুধু মাসে একবার করতে হবে। স্বাভাবিক স্তনে লোবিউলোটেড বা নরম দলা দলা থাকে। একজন নারী নিজের স্বাভাবিক স্তন কেমন হয় বুঝতে পারবেন। সেক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কিছু হলেও নিজের হাতেই ধরা পরতে পারে। অনেক মহিলাই পেরেছেন এভাবে আপনিও পারবেন। শুধু দরকার একটু সচেতনতা, নিজেকে একটু সময় দেওয়া আর নিজেকে একটু ভালোবাসা। মনে রাখতেই হবে পরিবার, সন্তানকে ভালবাসলে নিজেকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব প্রত্যেকটি মানুষের নিজের কর্তব্য।

পরিশেষে বলব, নারী পুরুষের মিলিত ভাবে হয় সংসার, সমাজ। “অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।” তাই পুরুষদের অসুখে নারীরা যেমন পাশে থাকে। নারীদের ক্ষেত্রেও পুরুষদের তেমনি পাশে থাকতেই হবে।

আমার এই লেখা, আমাদের দেশের প্রান্তিক নারীদের হাতে পৌঁছুবে না জানি, তাই আসুন আমরা নারীরা আমাদের আশে পাশের প্রান্তিক নারী সমাজের দিকে হাত বাড়িয়ে দেই।  

এখানে আমি আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং ইউ এস প্রিভেন্টিভ টাস্ক ফোর্সের (ইউ এ পি টি এফ) স্ক্রিনিং প্রোটকল বা  স্তন ক্যান্সার ছাকুনি পদ্ধতি তুলে ধরলাম। কেউ মনে করলে এই মতে স্থানীয় চিকিৎসকের সহযোগিতায় নিজেদের সচেতনতার, সতর্কতার ব্যবস্থা নিজেরাই গড়ে তুলতে পারেন।

আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির প্রোটকলঃ কম রিস্ক গ্রুপ (যাদের পারিবারিক ইতিহাস নাই)
১। ৪০ বছর থেকে ৪৪ বছর পর্যন্ত নারীরা  প্রতি বছর একবার ম্যামোগ্রাম করাতে পারেন, মনে করলে বা চিকিৎসক বললে।
২। ৪৫ বছর থেকে ৫৪ বছর পর্যন্ত নারীদের ম্যামগ্রাম প্রতিবছর করতেই হবে
৩। ৫৫ থেকে অধিক বয়স পর্যন্ত নারীদের দুবছর অন্তর অন্তর করতে হবে।  যতদিন পর্যন্ত স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভালো থাকে অথবা ক্ষেত্র বিশেষ ৭৫ বছর পর্যন্ত করা হয়।
হাই রিস্ক গ্রুপ ( স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস আছে বা জিন পজেটিভ)ঃ  এদের ক্ষেত্রে প্রতি বছর ম্যামগ্রাম সহ এম আর আই করাতে হবে।
ইউ এফ পি টি এফ –এর প্রটোকলঃ
১। কোন নারী যদি ৫০ বছর বয়সের পূর্বে স্কিনিংএর জন্য ম্যামোগ্রাম করে  তাহলে অনেকটাই তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের পর নির্ভর করবে। সেক্ষেত্রে ৪০ বছর থেকে ৪৯ বছর পর্যন্ত দুই বছর অন্তর করতে পারে।
২। ৫০ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত দুই বছর অন্তর করাতে হবে।
৩। হাই রিস্ক গ্রুপঃ এদের ক্ষেত্রে প্রতি বছর ম্যামগ্রাম এবং এম আর আই করাতে হবে।
এগুলো লিখলাম আমাদের নারীদের জানার জন্য। যে কেউ তার নিজের অবস্থা চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে এই ধরণের ছাঁকুনি পরীক্ষা করতে পারেন, যা কিনা আপনার আশংকা মুক্ত জীবনের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। গোলাপি গোলাপের মত বর্ণময় হোক আমাদের নারীদের জীবন।
তথ্য সুত্রঃ নিম্ন লিখিত অর্গানাইজেশনের অন লাইন ভার্সন
১। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি
২। ইউ কে ক্যান্সার সোসাইটি
৩। ব্রেষ্ট ক্যান্সার ফাউন্ডেশন
৪। ক্যান্সারডট নেট
৫। ডাবলু এইচ ও
৬। সি ডি সি আটলান্টা
৭। ওরিয়েন্টাল ফার্মেসি এন্ড এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিন

লেখিকা: সহকারী অধ্যাপক (প্যাথলজি); শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত