logo
সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭
 

ভারত-চীনকে সুরক্ষা দিতেই এমন খড়্গ চালিয়েছে মিয়ানমার

ভারত-চীনকে সুরক্ষা দিতেই এমন খড়্গ চালিয়েছে মিয়ানমার

ঢাকা, ০২ অক্টোবর, এবিনিউজ : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণা করছেন, লিখছেন রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়েও।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেছন। ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট আন্তর্জাতিক ইস্যু’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় ও জাতিগত দ্বন্দ্ব থাকলেও ভারত, চীন ও রাশিয়ার আগ্রাসী নীতির কারণে এ সঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে।

বাঙালি ইস্যু এবারই শেষ করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছে মিয়ানমার

আপনি বলেছিলেন (গেল পর্বে) বাংলাদেশের প্রতি অবিশ্বাস থেকে ভারত মিয়ানমারে প্রভাব বাড়াচ্ছে, যে প্রভাবের শিকার রোহিঙ্গারা। কিন্তু বাংলাদেশ তো এখন ভারতের অনুগত...

সাখাওয়াত হোসেন : হ্যাঁ। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যে ভারতের নিয়ন্ত্রণে তা ২০ বছর পরও থাকবে- এমনটা ভারত কখনই বিশ্বাস করে না। এ কারণেই ভৈরব-আখাউড়া ট্রানজিট পেয়েও মিয়ানমারে কালাদান নদীর প্রজেক্টে ৫শ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে ভারত। বাংলাদেশের বিকল্প রুট হিসেবে এটা তৈরি করা হচ্ছে।

ভৌগোলিক গুরুত্ব তো বাংলাদেশেরও আছে। অবিশ্বাসের কারণে কি সে গুরুত্ব অস্বীকার করা যায়?

সাখাওয়াত হোসেন :
সারা পৃথিবীতেই মুসলমানদের পুনরুত্থান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে। সে আলোচনায় জঙ্গিবাদও গুরুত্ব পাচ্ছে। মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে সে আচরণও প্রকাশ পাচ্ছে, এটা তো এখন প্রমাণিত। একই শঙ্কা হয়তো রোহিঙ্গাদের নিয়েও!

রোহিঙ্গারা তো অসংগঠিত, দুর্বল। তাদের একেবারে নির্মূল করার দরকার হলো?

সাখাওয়াত হোসেন :
একেবারে নির্মূল করার সুবিধা আছে। বারবার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা দুর্বল ঠিক আছে, কিন্তু আরাকানে অবস্থান করলে সবল হতেও পারে একদিন। বাইরে থেকেও সমর্থন পেতে পারে। আর একেবারে শূন্য করে ফেলতে পারলে আর কোনো শক্তি মাথাচাড়া দিতে পারবে না।

বাঙালি ইস্যু এবারই শেষ করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছে মিয়ানমার সরকার। ভারত ও চীনকে সুরক্ষা দিতেই রোহিঙ্গাদের ওপর এমন খড়্গ চালিয়েছে দেশটি।

রাশিয়াও তো মিয়ানমারের সুরে কথা বলছে।

সাখাওয়াত হোসেন :
রাশিয়া চাচ্ছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ। বাংলাদেশে যেমন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে বিনিয়োগ করছে রাশিয়া, তেমনি মিয়ানমারেও একাধিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করছে।

তেল ও গ্যাসেও বিনিয়োগ করছে তারা। চায়না থেকে খানিক সরে এসে রাশিয়ায় মুখ ফিরিয়ে অস্ত্র কিনছে মিয়ানমার। রাশিয়া কোটি কোটি টাকার অস্ত্র বিক্রি করছে মিয়ানমারে। এই মুহূর্তে মিয়ানমারের চার হাজার ৭০৫ জন শিক্ষার্থী রাশিয়ায় পড়াশোনা করছে, যার মধ্যে ৭০০ শিক্ষার্থী নিউক্লিয়ার নিয়ে পড়ছে। রাশিয়া নিউক্লিয়ার ইনস্টিটিউট করে দিচ্ছে মিয়ানমারে। ইরান ও সিরিয়া নীতিতে রাশিয়া ও চীন যে নীতি অবলম্বন করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায়ও রাখতে চাইছে। মূলত ভাগাভাগির সম্পর্ক। চায়না ও ভারতের স্বার্থ হচ্ছে রাখাইনে এবং রাশিয়ার স্বার্থ আরও বড় পরিসরে। আর সব স্বার্থের পেছনের স্বার্থ হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি। রোহিঙ্গা সঙ্কটের দায় ভারত, চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্য আর অস্ত্র বিক্রি।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?

সাখাওয়াত হোসেন :
মিয়ানমারে ভারত, চীন ও রাশিয়ার কর্তৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করি। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর শক্তি না কমলে গণতন্ত্র উন্মুক্ত হবে না। আর গণতন্ত্র উন্মুক্ত না হলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বাড়বে না। কারণ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে চীনের সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ভালো।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা মনে করে, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা খর্ব না হলে মিয়ানমারের সঙ্কট কাটবে না। এমনকি একসময় পশ্চিমাদের সমর্থন পেলেও অং সান সু চি এখন সেনাবাহিনীর বলয়ে ঢুকে গেছেন। এ কারণে পশ্চিমাদের ক্ষোভও আছে। রোহিঙ্গা নিধনের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও জাতিসংঘ কথা বলছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

সাখাওয়াত হোসেন :
মিয়ানমার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নাজুক। বাংলাদেশ জোরালো কোনো অবস্থান নিতে পারছে না।

মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেনাবাহিনী ফের ক্ষমতায় আসতে পারে। এতে দেশটির পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

ভারত-চীন-রাশিয়ার সঙ্গে তো বাংলাদেশেরও ভালো সম্পর্ক। সঙ্কট নিরসনে তাদের প্রতি কি জোরালো দাবি জানাতে পারি আমরা?

সাখাওয়াত হোসেন :
গত ১০ বছরের ইতিহাস দেখুন, চায়নাকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্র বন্দর করে দিতে চাইল চীন। ভারতের কারণে সিদ্ধান্ত দিতে পারল না বাংলাদেশ।

ভারত সরাসরি বলছে, মিয়ানমার ছেড়ে এসে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থাৎ ভারত এখনও বাংলাদেশকে অবিশ্বাসের চোখে দেখে। রাশিয়া বাণিজ্যের কারণে চুপচাপ।

তাহলে ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নে বাংলাদেশের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে?

সাখাওয়াত হোসেন :
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আমরা নিজেরাই দ্বিধায় আছি। বঙ্গোপসাগরে আসলে কী হবে তাও আমরা জানি না।

এমনকি মুসলিম দেশগুলোও সাড়া দিচ্ছে না সৌদি আরবের কারণে। সৌদি আরব ত্রাণ দিচ্ছে, কিন্তু কোনো আওয়াজ দিচ্ছে না। তেল বিক্রির কারণেই সৌদি জোটভুক্ত দেশগুলোর কোনো সাড়া নেই।

অনেক মুসলমানও রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়টি বুঝতে চায় না। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জঙ্গিবাদকে মিলিয়ে দিয়ে তাদের নিধনে পরোক্ষভাবে সায় দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভারতের অভিযোগও একই। রোহিঙ্গারা জঙ্গি হলে কোকান, সান, ওয়া, কাচিন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাহলে কী?

এ সঙ্কটের শেষ কোথায়?

সাখাওয়াত হোসেন :
আমি আপাতত কোনো সমাধান দেখছি না। আদৌ সমাধান হবে কি না- তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিধন করে আদৌ ভালো থাকতে পারে সে রাষ্ট্র?

সাখাওয়াত হোসেন :
মিয়ানমারের ভেতরে মুসলিমবিরোধী বুড্ডিস্ট আন্দোলন চলছে এবং সেটা কঠিনতর রূপ নিয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ ভালো বলা যাবে না। আমরা নিজেরাও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সঙ্কটের মধ্যে আছি। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক কোনোদিন ভালো হবে বলেও আমি মনে করি না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব খারাপের দিকে যাচ্ছি আমরা।

যেমন?

সাখাওয়াত হোসেন :
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আর ভালো হচ্ছে না, এর চাইতে আর কী খারাপ সংবাদ থাকতে পারে?

ভারত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক টানাপোড়েন হতে পারে কি না?

সাখাওয়াত হোসেন :
আমরা কারও সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারছি না- এটা প্রমাণ হয়ে গেছে। নইলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত, চীন ও রাশিয়াকে কিছুটা হলেও কাছে পেতাম। অনেকেই অনেক কথা বলছেন। কিন্ত প্রধানমন্ত্রী ঠিকই জানেন। তিনি নানা কথা বলে ইঙ্গিতও দিচ্ছেন।

তাহলে কি রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে কোনো সমাধান মিলছে না?

সাখাওয়াত হোসেন :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরাকানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সেভ জোন (নিরাপদ এলাকা) করার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটাই আপাতত সমাধান হতে পারে। এটা মিয়ানমারকে চাপ দিয়ে করানোর ব্যাপার।

মিয়ানমার কি মানবে?

সাখাওয়াত হোসেন :
সেটাই কথা। যারা চাপ দেবেন তারাই তো মিয়ানমারের সঙ্গে আছেন।

বাংলাদেশ নিজের মধ্যকার এ চাপ কীভাবে সামলাতে পারে?

সাখাওয়াত হোসেন :
আগে নিজের স্বার্থ দেখা। আমরা একটি রাষ্ট্রের কাছে সব বিকিয়ে দিয়ে বন্ধুহারা হচ্ছি। বাংলাদেশ দরকষাকষির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। দরকষাকষির জন্য পায়ের নিচে মাটি রাখতে হয়। আমরা তো অন্যের পায়ে ভর করে দাঁড়াতে অভ্যস্ত।

রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গারা এ অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াতে পারে কি না?

সাখাওয়াত হোসেন :
অবশ্যই বাড়াবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১৩শ’ শিশুর কোনো স্বজন নেই। বাবা-মা নেই। তাদের বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক হবে না। চিন্তাও স্বাভাবিক থাকবে না। ক্রোধ থেকেই ধ্বংসলীলার জন্ম হয়। কক্সবাজারে অস্থিরতা ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের বিপদ বাড়াবে। আমরা নিজেরাও তো ভালো না। অনেক খবরই তো আসছে। ত্রাণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। আরসা (দ্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে যেতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নিজেদের মধ্যেও নানা সমস্যা আছে। কেউ পাহাড়িদের পক্ষে, কেউ বাঙালিদের পক্ষে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও রাজনীতি হচ্ছে। ফলে পানি আরও ঘোলা হবে- এটাই এখন শঙ্কা। সৌজন্যে: জাগো নিউজ

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত