logo
শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
 

তিনি ড্রাকুলা সুন্দরী

তিনি ড্রাকুলা সুন্দরী

ফজলুল হক, ১১ সেপ্টেম্বর, এবিনিউজ : ডি এইচ লরেন্সের এক নায়িকার নাম কনস্ট্যান্স চ্যাটার্লি। সুন্দর একটি মেয়েকে দেখছি আমার দিকে আসছে। হাই? ইউ ফজলুল? আমি বলি, হ্যাঁ। সে বলে আমি টোমাকে উইশ করটে এসেচি। আমার মাথা খারাপ হওয়ার দশা। এই বিদেশিনি টি কে? বলল, টোমার বার্থডে টু ডে? আমি বলি, তুমি কি করে জান? সে বলে, ডেখ, টুমি আর আমি ভিন্ন রুচির, ডিফরেন্ট মেন্টালিটির মানুষ। টুমি পুরুষ, আমি মেয়ে। তাই বলে, আমাডের ফ্রেনশিপ হটে কেন পারে না? প্রেস ক্লাবের পাশে ফুটপাতে টং দোকানে রং চা খেতে গেছি আমি। আমার বুক কাঁপছে। চায়ের মগ দোকানদারের হাতে দিয়ে আমি টিস্যু দিয়ে হাত মুছি। আমি বলি, কেন নয়? অবশ্যই হতে পারে। সে হাত এগিয়ে দেয়, হ্যান্ড শেক করবে। বলে, আই এম কনস্ট্যান্স চ্যাটার্লি। নাইস টু মিট ইউ। আমি বলি, মোস্ট ওয়েলকাম. . .। চ্যাটার্লি বলে, টুমি খুব ভাল লেখ। পট্রিকায় টোমার রিডার অনেক। টারা সবাই টরুন টরুনি। আমি অবাক, তুমি কিভাবে জান? সে বলে, টোমার ফ্যান এক জার্নালিস্ট নেটা আমাকে বলেচে। আমার প্রিয় ছাত্র কবি ও সাংবাদিকদের নেতা নাজিম উদ্দিন শ্যামলের কথা মনে আসে। এক অনুষ্ঠানে শ্যামল বলেছে, আমার স্যার কলাম লিখেন। ওটাকে উঁচু মানের সাহিত্য বলা যায়। দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখাতে স্যার ধারায় পরিবর্তন এনেছেন। কারো পক্ষে বা কারো বিরুদ্ধে না লিখে, পত্রিকায় কলাম লেখার ক্ষেত্রে যে গুনগত পরিবর্তনের সুচনা হয়েছে, তা চাটগাঁ থেকে শুরু হয়েছে। এ জন্য আমরা গর্ব করতে পারি। চ্যাটার্লির সাথে হয়ত শ্যামলের কথা হয়েছে? এই মেয়ে সাংবাদিকটি একটি বিদেশি মিডিয়ার হয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুজ কাভার করতে এসেছে। শ্যামল তাকে কি বলেছে? মেয়েরা এখন ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াতে সাহসের সাথে কাজ করছে। এই মেয়ে চালাক চতুর।

ডি এইচ লরেন্সের নায়িকার নামে কি সে নিজেকে চালিয়ে দিচ্ছে? তার আসল নাম কি? সে বলে, রাইটার টুমি চুপচাপ কেন? আমি বলি, আসলে আমি একদম কোন লেখক নই। তুমি যদি আউট বই পড় – তোমার হাতের কলম তর তর করে চলবে। আমার নিজের কোন থিংকিং নাই। আই এম এ বিগ জিরো। শুন্য। আমাকে থামিয়ে দিয়ে চ্যাটার্লি বলে, আমি জানি, টুমি আর কি কি বলবে। টুমি বলবে, একন সিটিজেন জার্নালিজম, অন লাইন নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অনেক অনেক কিছু জানা যায়। প্রিন্ট মিডিয়া অনেক ফিচার দেয়। একান থেকে কিচু, ওকান থেকে কিচু নিয়ে ইমপ্রেসড করার মটো লেখা টৈয়ার করা যায়। আমি বলি, জেনি তুমি ঠিক বলেছ। সে বলে, জেনি নয়। চ্যাটার্লি। আমি বলি, সরি। চ্যাটার্লি ঠিক বলেছ। আমার মনের কথা সে বুঝতে পেরেছে। আমাকে লেখক বললে লেখককে কি বলবে?

আমাকে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র মাঝে মাঝে “টক্‌” (বক্তব্য) দেয়ার জন্য ডাকতেন। তখন মোহাম্মদ হোসেন খান জীবিত ছিলেন। উনি রস গল্প লেখক। উনি থাকতে আমাকে ডাকল কেন? তাজ্জব ব্যাপার। সত্যি সত্যিই আমাকে রম্য রচনা পাঠ করার অফার দেয়া হয়েছিল। আমি দীর্ঘ দিন বেতারে “টকার” হিসাবে কাজ করেছি, ৩৯০ টাকা করে মজুরিও নিয়েছি, একদিন প্রডিউসার আমাকে বল্লেন, স্যার, আপনাকে “রস–রচনা” বানাতে হবে এবং তা আমাদের অনুষ্ঠানে পড়তে হবে। আমি অবাক হয়ে বলি, আমি? আমি তো কোন লেখার যোগ্য লোক নই।

তো সেই থেকে আমি বেতারে রস গল্প পড়ি। বেতারে দীর্ঘ দিন রস গল্পের “টকার” ছিলাম। মনে হয় তরুণরা রেডিও শোনেনা। শুনলে অনেক আগে রাস্তায় আমাকে ঝাঁটা পেটা করত। তো, গতকাল এক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় একটি রস গল্প পাঠ করলাম। ইস্‌, কি সুন্দর না লিখেছে। আমি যদি লিখতে পারতাম? চ্যাটার্লিকে বল্লাম, মিস্‌ কাছে এসো। তুমি না বলেছ, তুমি আর আমি ভিন্ন রুচির, ডিফরেন্ট মেন্টালিটির? এটা কেন বলেছ? তুমি আর আমি ডিফরেন্ট দেশের বাট্‌ ডিফরেন্ট রুচির না। সে বল্ল, মে বি। আমি বলি, দেখ তুমি তোমার চ্যানেলের হয়ে রোহিঙ্গা কিলিং এন্ড টর্চার কাভার করতে এসেছ। বল, রোহিঙ্গারা, রাখাইনরা কোন্‌ দেশের মানুষ? সে বলে, অবভিয়াসলি মিয়ানমারের যাকে টোমরা বল বার্মা। আমি বলি, তারা এক দেশের মানুষ। বাট হোয়াই দে আর টর্চারড? এবিউজ্‌ড? কেন তাদের পশু পাখির মতো মারা হচ্ছে? ভিন্ন দেশ আর এক দেশ হয়ে লাভ কি? কিছু মানুষ হচ্ছে কিলার। তারা মানুষকে মারে। বল, যারা আনবিক বোমা বানাচ্ছে, তারা কি সাপ আর বাঘ মারার জন্য হাইড্রোজেন, অনু বোমা আর জীবাণু বোমা ব্যবহার করবে? মানুষ–ভেরি ইনসিকিউরড। মানুষ– মানুষকে মারে। সেইম দেশের হলেও মারে। আমাদের সেম রিলিজিয়ন মুসলমান– একাত্তরে আমাদের ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে অট্টহাসি হেসেছে?

তো যাক মিস্‌ – তুমি আর আমি সেম্‌ রুচির কিনা তা কি ভাবে বুঝব? কি ভাবে বুঝব ডিফারেন্ট রুচির কিনা? সে বলে, তাই তো? পাজেলড্‌ হওয়ার মটো কটা? আমি বলি, এক কাজ করো। একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। চ্যাটার্লি বলে, টার মানে? হোয়াট টাইপ অফ্‌ এগজাম? আমি (একটি রস গল্প অনুকরন করে) বলি, ধরো, হাম তোম এক জাঙ্গল মে বন্দ হো, অর টাইগার আ গিয়া। টর্নেডো আনে ওয়ালা, সব কুচ্‌ ছিন্‌ লেনে ওয়ালা হ্যায়, আওর এক মোকান মিল গিয়া। তুম কেয়া করোগী? চ্যাটার্লি বলে, টেক শেল্টার ইন বিল্ডিং? আমি বলি, বিল্ডিং এ দুটি বেড রুম আছে। একটিতে আধ শোয়া হয়ে আছে, ভয়ংকর চেহারার কুদর্শন এক পুরুষ। দাঁত দেখা যাচ্ছে ড্রাকুলার মতো। তোমাকে ডাকছে জেনি এসো। চ্যাটার্লি রেগে যায়। জেনি কেন বলছো? নো নো সরি, বলছে চ্যাটার্লি এসো। আমার সাথে শুতে হবে। আমি আরো বলি, দ্বিতীয় কামরায় আছে, কি আছে? চ্যাটার্লি বলে, ডারাও ওঁকি দিয়ে দেকে আসি। কি আছে? লাবন্যে ভরা এক সুন্দরী। চিক্‌ চিক্‌ রৌপ্য বিন্দু চাঁদের আলোর মতো আভায় ঝিকমিক করছে। দারুন সুন্দরী। আমি বলি, সে আমাকে ডাকছে, তার বিছানায় শুতে। আমি বলি, চ্যাটার্লি? আমি কি করব? কিছুক্ষণ চুপ থেকে চ্যাটার্লি বলে, আমি হলে, সুন্দরীর পাশে শুতে যাব। আমি বলি, আমি তো সুন্দরীর পাশে শুতে না পারলে মরে যাবো। সুই সাইড করবো। ব্যাপারটা কি হলো? আমি বলি, মিস্‌ তুমি স্বভাবতই ড্রাকুলার সাথে শোবে না। শোবে সুন্দরীর সাথে। আমিও তাই করব। তাহলে তোমার রুচির সাথে আমার রুচির পার্থক্য কোথায়? মানুষ মানে মানুষ। আওয়ামী লীগের মানুষ আর বিএনপির মানুষের রুচির বেশ কম হচ্ছে কেন? বার্মার মানুষ কেন বার্মার মানুষকে মারছে? আমি তো বোকা, আমি এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর জানি না।

কথা ঘুরিয়ে, চ্যাটার্লি অন্য দিকে যাচ্ছে, বললো, তুমি অন্য মেয়ে মানুষের সাথে শোবে– ওহ মাই গড? আমার (চ্যাটার্লির) প্রশ্ন হচ্ছে তুমি লক্ষ্মী বাবুর মতো শুয়ে শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়বে? তুমি আর কি করতে সত্যি করে বলতো? আমি বলি, মিস্‌ তুমি আমার দোষ খুঁজছ কেন? আমাকে কাছে পেয়ে সুন্দরী কি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি কিংবা আয় আয় চাঁদ মামা– গুন গুন করে গাইত? তাহলে না হয় ঘুমিয়েই পড়তাম। কিন্তু যদি. . .? চ্যাটার্লি বল্ল, খায়েশ কত? আমি বলি, ঠিক আছে আমি ওই ভয়ংকর ড্রাকুলার পাশে শোব। চ্যাটার্লি বল্ল, তুমি কি “ওয়ান হানড্রেড এন্ড ওয়ান ওয়েজ টু স্যাটিসফাই ইয়োর ওয়াইফ” বই পড়েছ? তাতে ১০১ নং টিপস কি জান? আমি বলি না। সে বলে, তোমার স্ত্রী যে রুপসী তা কিছুদিন পর পর তোমার স্ত্রীকে আদরের সাথে জানাবে। তা না করে তুমি এটা কি করছ? ঝড়ের রাতে সুন্দরী খুঁজছ? আমি বলি, কনস্ট্যান্স চ্যাটার্লি যদি সুন্দরীর পরনে বুক ফাড়া ম্যাক্সি থাকে? সে ছটফট করে? সে অবস্থায় আমি ঘুমিয়ে পড়ব?

চ্যাটার্লি নামে এক লেখিকাকে চিনি, তিনি কিন্তু লিখেছেন, “হানড্রেড এন্ড ওয়ান ওয়েজ টু ডিল উইথ ওয়াইফ্‌স সিস্টার” মানে শ্যালিকা। শালী। বাট আমার সামনে যে চ্যাটার্লি আছে সে কোকের বোতল বের করে কোক খাচ্ছে, তার গলা দিয়ে কোক নামছে, আমি সে অপরূপ দৃশ্য তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। চ্যাটার্লি অপরূপা– লাবন্যময়ী। রূপকথার রাজকন্যা পানি খেলে স্বচ্ছ কণ্ঠনালী দিয়ে তা দেখা যেতো। আমি চ্যাটার্লির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি।

অংসান সূচি যৌবনে কেমন ছিলেন দেখতে? নিশ্চয় অপরূপা? তিনি পানি খেলে গলা দিয়ে পানি নামার চিত্র দেখা যেতো। অঞ্ঝরী। ফেসবুকে সে অঞ্ঝরীকে দেখা যাচ্ছে বিকট দাত বের করে আছে ড্রাকুলার মতো। জানি না, এই বিকট সূচির পোষ্ট কে দিয়েছে? কোন ঝড়ের রাতে সূচি কি ড্রাকুলার সাথে শুয়েছিল? আপনারা যারা ড্রাকুলার কাহিনী পড়েছেন বা সিনেমায় দেখেছেন কিংবা “দ্যা হুইপ এন্ড দ্যা ফ্ল্যাশ” দেখেছেন, তারা জানেন ড্রাকুলা যাকে ছোয় তার দেহ ধারন করতে পারে। ড্রাকুলা মানুষ মারে। সূচিও মানুষ মারে। সূচি এখন ড্রাকুলা। ছিঃ ছিঃ–

আমাদের সরকার বিপদে পড়েছে। সুন্দরীর সাথে শুতে গেলে মানুষ বদনাম করবে। আর ড্রাকুলার সাথে শুতে গেলে মারা পড়বে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে “হরন্‌স্‌ অফ ডিলেমা” হল, এই জনস্রোত এসে দেশের অবস্থা খারাপ করে দিতে পারে। এই দেশকে আফগানিস্তান বা ইরাক বানানোর চক্রান্ত থাকতে পারে। আর রোহিঙ্গাদের মানবিক সমস্যা না দেখলে তা অমানবিক দেখাবে। আমার সমস্যাটা বুঝুন– আমি কি সুন্দরীর ঘরে যাব? না ড্রাকুলার কাছে যাব? আমি যদি রোহিঙ্গা রিফিউজির চাপে এই দেশের কি কি হতে পারি সেটা বলি অনেকে রাগ করবেন। আর যদি বলি, যত রোহিঙ্গা আসুক তাদের বড় বড় এপার্টমেন্টে যায়গা দেন তাহলে অনেক লোক মারতে আসবে।

আমার মাথায় যেটা আসে সেটা হলো, সব দল এক হয়ে সমস্যার সমাধান বের করুন। এ ওকে গালি দেবেন না। সরকারের সব কাজের সমালোচনা করা কি বিরোধী দলের কাজ?

দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া রাজনীতিবিদের কাজ নয়। তিনি বিএনপি হোন আর আওয়ামী লীগ হোন। মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে তা দেখে দেখে হা হুতোশ করা রাজনীতিবিদের কাজ নয়। মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যেতে হবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, উপায় বের করুন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দলীয় স্বার্থ দেখা থেকে বিরত থাকুন।

লেখক :
সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত