logo
শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
 
  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • উদ্ভাবন ও প্রাযুক্তিকীকরণ সামনের দিনে ব্যাংকিং খাত বিকাশের হাতিয়ার হবে

উদ্ভাবন ও প্রাযুক্তিকীকরণ সামনের দিনে ব্যাংকিং খাত বিকাশের হাতিয়ার হবে

উদ্ভাবন ও প্রাযুক্তিকীকরণ সামনের দিনে ব্যাংকিং খাত বিকাশের হাতিয়ার হবে

ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর, এবিনিউজ : আহমেদ কামাল খান চৌধুরী। ২০১৪ সাল থেকে প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি কথা বলেন ব্যাংকিং খাতের নানা বিষয় নিয়ে—

সারা বিশ্বেই ব্যাংকিং খাত চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। চ্যালেঞ্জ অতিক্রমে উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। গুরুত্ব দিতে হবে প্রাযুক্তিকীকরণেও। এজন্য বাড়াতে হবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। যেসব ব্যাংক এগুলো করতে পারবে, তারাই আগামীতে গ্রাহক আস্থা অর্জন করে ব্যবসায়িক সাফল্য পাবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকিং খাত বহু আগেই সেন্ট্রালাইজেশনে চলে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো যত বেশি শাখা তত বেশি ব্যবসা— এ মডেলে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদেরও এ মডেল থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রালাইজেশনের দিকে যেতে হবে। এক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে থাকবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রাইম ব্যাংক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রিটেইল ব্যাংকিংয়ের জন্য। পরে সেখান থেকে করপোরেটে বেশি ফোকাস করে। এটি করতে গিয়ে আমরা দেখলাম, সব ব্যাংকের বিনিয়োগ ২০ থেকে ৩০টি কোম্পানির কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এটি বড় ধরনের ঝুঁকি।

আমাদের ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংকই একটা সময় গার্মেন্ট খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। কারণ এ খাতে আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাংকের ভালো ব্যবসা হয়। এটি করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর অনেক ঋণ আটকে গেছে। ফলে যে ব্যাংকগুলো গার্মেন্ট ফোকাস ব্যবসা করেছে, তাদের খেলাপির পরিমাণ বেড়ে গেছে। গার্মেন্ট সেক্টরের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতারণাগুলোর বিষয়ে ব্যাংকারদের ধারণা না থাকায় এমনটা হয়েছে।

আমাদের উপলব্ধি হয়েছে যে, গার্মেন্টের সঙ্গে ব্যবসা করতে হলে আমাদের ওই খাতের যুক্ত জনবল নিতে হবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা একটি ইউনিট গঠন করেছি। ওই ইউনিটে মার্চেন্ডাইজিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১০-১৫ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গার্মেন্ট খাতে যেকোনো বিনিয়োগের আগে ওই ইউনিট অনুসন্ধান করে মতামত দেয়। এর ফলে আমরা অনেক প্রতারণামূলক ঘটনা ধরতে পেরেছি। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়াটাই আসল।

সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিনিয়োগ করেও অনেক ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণেই এমনটা হয়েছে। অনেক ভালো বিনিয়োগকারী এ শিল্পগুলোয় আটকে গেছে। দাম বাড়ার অপেক্ষায় থাকার কারণে দুটি খাতের ব্যবসায়ীরা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অনেক সময় দেখা যায়, যে দামে পণ্য আমদানি করা হয়েছে, তার চেয়ে কম দামে বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীকে বসিয়ে দেয়ার জন্য বড় ব্যবসায়ীরা এ ধরনের কাজ করেছেন বলে মনে হচ্ছে। বছরে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার টার্নওভার আছে এ খাতের এমন কোম্পানিগুলো দুর্দিনে আছে। আমরা দেখছি বছরে হাজার কোটি টাকা টার্নওভারে থাকা কোম্পানিগুলো স্থিতিশীল।

সার্বিকভাবে সবাই মনে করছেন, ব্যাংকগুলো এসএমই ও রিটেইল খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে এটা প্রমাণিত যে, এসএমইতে বিনিয়োগ বাড়ালে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। কারণ এসএমই খাতের সব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না।

কৃষি খাতে আমরা এনজিওর মাধ্যমে বিনিয়োগ করছি। কিন্তু কিছু এনজিওর ঋণ বিতরণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এটি শনাক্ত করাও অনেক কঠিন। এটি ঠিক যে, শস্য খাতে বিতরণ করা ঋণ আদায় হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বন্যায় শস্যঋণের আদায় প্রক্রিয়া যে থমকে যাবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, ভালো ব্যাংক হতে গেলে করপোরেট ও এসএমই বিনিয়োগে ভারসাম্য থাকতে হবে। অনেকে বলেন, এটির হার ৬০/৪০ শতাংশ হলে ভালো। এসএমই ও রিটেইল মিলিয়ে মোট ঋণের ৪০ শতাংশ হলে সন্তোষজনক বলা যায়। এছাড়া ডিজিটালাইজেশন ও সেন্ট্রালাইজেশন ছাড়া ব্যাংকগুলোর সামনে এখন কোনো বিকল্প নেই। প্রাইম ব্যাংক এক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং করতে হলে শর্ট কেওয়াইসি দরকার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে ‘আধার’ কার্ডকেই কেওয়াইসি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সে ধরনের একটি কেওয়াইসি প্রত্যাশা করছি। এত লম্বা কেওয়াইসি আমাদের কৃষক-শ্রমিকরা বুঝতে পারবেন না।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়, তার সবই ডেবিট কার্ডে সরবরাহ করতে হবে। তা হলে নগদ টাকার সরবরাহ অনেক কমে যাবে।

ব্যাংকগুলো যত বেশি ডিজিটাল হবে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়বে। এজন্য আইটি খাতে ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। গ্রাহকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে হলে ধারাবাহিক ও সীমাবদ্ধতা না রেখেই আইটি খাতে খরচ করতে হবে।

প্রাইম ব্যাংকের ১৪৫টি শাখা। শাখাগুলোয় হিসাব খোলার জন্য একজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হয়। সে হিসেবে আমাকে হিসাব খোলার জন্য ১৪৫ জন কর্মকর্তাকে কাজে লাগাতে হচ্ছে। কিন্তু একটি শাখায় সারা দিনে মাত্র ৫ থেকে ১০টি হিসাব খোলা হয়। যদি সেন্ট্রালাইজেশনের মাধ্যমে হিসাব চালুর প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয় অফিস থেকে করা যায়, তা হলে ৫০ জন কর্মকর্তা দিয়ে ওই কাজ করা সম্ভব। এভাবেই সব কাজে জনবল কমিয়ে এনে ব্যাংকের ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শাখা ব্যাংকিং থেকে ব্যাংকগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে থাকবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সারা বিশ্বেই এখন ব্যাংকগুলো সেন্ট্রালাইজেশনের দিকে যাচ্ছে।

আমাদের মার্কেট সাইজের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি। আমি জানি না, আমাদের অর্থনীতির জন্য এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন আছে কিনা।

আগে ব্যাংকে যোগদানের পর একজন কর্মকর্তাকে প্রথম দিনই ডেবিট-ক্রেডিট শিখতে হতো। সে ব্যবস্থা এখন আর নেই। বর্তমানে কোনো প্রবেশনারি অফিসারকে চিঠি ইস্যু করতে বললে, তিনি ব্যাংক ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু সে সময় আমরা সেটাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিতাম।

ডেবিট-ক্রেডিট সম্পর্কে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীদের ভালো জ্ঞান থাকলেও অন্য ডিসিপ্লিন থেকে আসা শিক্ষার্থীরা সেটি জানেন না। ফলে কোত্থেকে ডেবিট হচ্ছে, কোথায় গিয়ে ক্রেডিট হচ্ছে, এ ব্যাপারে কর্মকর্তাদের কোনো ধারণা নেই। আগে আমরা ম্যানুয়ালি ব্যালান্সশিট, ক্লিন ক্যাশবুক তৈরি করতাম। এর মাধ্যমে আমরা পরিচ্ছন্ন ধারণা পেতাম। এখন সেটি না হওয়ায় বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে ঘাটতিটা পূরণের চেষ্টা করছি। এর পরও কাঙ্ক্ষিত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন স্ট্যাটাস অনেক বেড়েছে। অনেক কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বহুমুখী তত্পরতার কারণে ব্যাংকিং খাতের স্কিল ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাধ্য হয়েই ব্যাংকগুলোকে স্বচ্ছতার পথে হাঁটতে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হাঁটতে হবে।
সৌজন্যে: দৈনিক বণিক বার্তা

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত