logo
বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
 

সৎ সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই

সৎ সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই

প্রভাষ আমিন, ০১ সেপ্টেম্বর, এবিনিউজ : শোকের মাস আগস্টে এবার যুক্ত হয়েছে আরো শোক, একের পর মৃত্যুসংবাদ কাঁদিয়েছে আমাদের। আগস্ট তার শেষ বেলায় ধাক্কা দিল কাজী সিরাজকে নিয়ে। সিরাজ ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। কারণ বয়স ৭০ হলেও তিনি ছিলেন মানসিকতায় সতেজ, মধ্যরাত পর্যন্ত দাবড়ে বেড়াতেন টিভি টকশো। অসুস্থতার অভিযোগও কখনো শুনিনি। ফোন করে নাম বললে বলতেন, নাম বলতে হবে না, খোদাই করা অাছে। মানে সেভ করা অাছে। ঠিকানা চাইলে বলতেন, বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালের পাশে। এত পাশে থাকা হাসপাতালও বাঁচাতে পারেনি তাকে।

পরে জেনেছি ৩১ আগস্ট দুপুরেই সাপ্তাহিক রোববার'এর উপদেষ্টা সম্পাদকের পদ থেকে অবসর নিয়েছিলেন কাজী সিরাজ। কর্মজীবন থেকে অবসরের দিনে অবসর নিলেন জীবন থেকেই। কাজ করতে করতে, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পরিবারকে না ভুগিয়ে এভাবে চলে যাওয়াটা আমার পছন্দের। কিন্তু মাত্র ৭০ বছরেই, যখন সিরাজ ভাইয়ের অভিভাবকত্ব আরো কিছুদিন দরকার ছিল, তখন তার চলে যাওয়া শুন্যতা তৈরি করে।

কাজী সিরাজ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন। পরে করেছেন ভাসানী ন্যাপ। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। পালন করেছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়কের দায়িত্ব। দলে তিনি ছিলেন মান্নান ভুইয়ার অনুসারী। ওয়ান-ইলাভেনের পর মান্নান ভু্ইয়ার সাথে কাজী সিরাজও বিএনপির রাজনীতির কক্ষচ্যুত হন। তবে তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দল বদলাননি, আদর্শ বদলাননি। তার আদর্শের সাথে আপনার না মিলতে পারে, ভিন্নমত থাকতে পারে; কিন্তু একজন আদর্শিক সৎমানুষের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতেই পারে। কাজী সিরাজের অনেক ভিন্নমতের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন।

কর্মজীবনে তিনি বিএনপির মুখপত্র দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ছিলেন। শেষ সময়ে সক্রিয় ছিলেন লেখালেখিতে। তার ক্ষুরধার লেখনী ছাড় দিতো না কাউকেই। বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের ধারক হলেও বিএনপির বর্তমান রাজনীতি এবং নেতৃত্বের তীব্র সমালোচক ছিলেন তিনি। তবে বর্তমান নেতৃত্ব তাকে দূরে ঠেলে রেখেছে, এ থেকে সৃষ্ট কোনো বিদ্বেষ আমি তার সমালোচনায়, লেখায়, কথায় পাইনি। তিনি জামায়াতের সাথে বিএনপির সখ্যতা, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সমালোচক ছিলেন তিনি। তার প্রত্যেকটি সমালোচনার আদর্শিক ভিত্তি ও যুক্তি ছিল। তার ভাষায় 'কর্মচারি' দিয়ে দল চালানোর তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। আর আদর্শিক ভিন্নতার কারণে তীব্র সমালোচনা করতেন আওয়ামী লীগেরও। আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন সরকারের নানা ভুল-ত্রুটি, দুর্নীতি, অনিয়ম। সোচ্চার ছিলেন গুম-খুন-ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধেও।  দলমত নির্বিশেষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এমন মানুষের সংখ্যা এথনকার সমাজে বিরল, নেই বললেই চলে।

এই স্পষ্ট সত্য বলার কারণেই কি তিনি বন্ধুহীন ছিলেন? ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে তার জানাযায় গিয়ে এই প্রশ্নটি মনে হয়েছে আমার। জীবনে কখনো আওয়ামী লীগ করেননি বলে আওয়ামী লীগের কেউ আসেনি। ইদানিং বিএনপির কট্টর সমালোচক ছিলেন বলে বিএনপির কেউও আসেনি। ভুল ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে বিএনপি ভুলে গেল তার প্রতিষ্ঠাকালীন একজন কর্মীকে।

বিএনপি বা আওয়ামী লীগের নেতাদের না হয় এ ধরনের ব্যক্তির জানাযায় গেলে দলের নীতিনির্ধারকদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু সাংবাদিকদের? জাতীয় প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ ছিলেন কিন্তু দুই ইউনিয়নের কাউকে চোখে পড়েনি। ভিন্নমতের কারো জানাযায় যেতেও কি সাংবাদিক নেতাদের রাজনৈতিক অনুমতি লাগে? হায়, প্রশ্নহীন দলীয় আনুগত্য ছাড়া কিছুই এখন সমাদৃত নয়; না রাজনীতিতে, না সাংবাদিকতায়।

তবে কাজী সিরাজ প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের সাংবাদিকের কোনো বন্ধু থাকে না। কাজী সিরাজ ভাইয়ের স্পষ্টবাদিতা আমি মিস করবো। যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত