logo
শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
 
  • হোম
  • সারাদেশ
  • চিলমারীতে খাদ্য সংকট: ত্রাণ না পাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশী

চিলমারীতে খাদ্য সংকট: ত্রাণ না পাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশী

চিলমারীতে খাদ্য সংকট: ত্রাণ না পাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশী
চিলমারী(কুড়িগ্রাম), ১৭ আগস্ট, এবিনিউজ: পরেশ চন্দ্র (৮০) রমনা ইউনিয়নের মুদাফৎথানা গ্রামের মৃত কৈলাশ চন্দ্রের পুত্র। তার বাড়ীতে ৬ দিন ধরে বুক সমান পানি। স্ত্রী ও ১ নাতীকে নিয়ে উঠেছেন পাউবো বাঁধে। পেশায় বাই-সাইকেল মেকার এই বৃদ্ধের এখন কোনো আয় নেই। ঘরে কোনো খাবারও নেই। বুধবার দুপুরে জোড়গাছ নতুন বাজার এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে অনুনয় বিনয় করছেন একটা রিলিফের স্লিপের জন্য। দীর্ঘ প্রতিক্ষায়ও ত্রাণ না পেয়ে এ প্রতিবেদকের কাছে আকুতি জানায়।‘ বাবা সকাল থাকি না খায়া আছং বাহে, মোর এ্যাহনা ইলিপের বেবস্তা করি দ্যাননা ক্যাঁ।’ একই রকম আকুতি জানান, রমনা খামার গ্রামের কায়েছ উদ্দিনের স্ত্রী হাজিরন (৬০) ও তরুণা বালা (৬৫)। তাদের আক্ষেপ গরীব মানুষ রিলিফ পায়না। যাদের আছে তারাই বারবার পায়।
চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন ৬দিন ধরে বন্যার পানিতে ভাঁসছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে উপজেলা শহরে। ফলে উপজেলার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ২৭ হাজার ৩০২টি পরিবারের প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ পড়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে।দেখা দিয়েছে ঘরে ঘরে খাদ্য সঙ্কট। নেই বিশুদ্ধ পানি ও গো খাদ্যের ব্যবস্থা। ছড়িয়ে পড়েছে চর্ম রোগসহ পানিবাহিত নানা রোগ। সরকারী ত্রাণ আসলেও তা একে বারেই অপ্রতুল। বন্যাক্রান্ত হওয়ার ৬দিন পর ৬৫ মেট্রিক টন চাল ৬ হাজার ৫’পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হলেও ত্রাণ বঞ্চিত রয়ে গেছে ২০ হাজার ৮০২ পরিবার। ফলে ত্রাণের জন্য হাহাকার সর্বত্র। 
সরেজমিন,উপজেলার রমনা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ চত্ত্বরে থৈ থৈ পানি। বন্যার ৬দিন পর ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে জোড়গাছ নতুন বাজারের অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে। কাঁদা পানিতে দাড়িয়ে শত শত নারী-পুরুষ অপেক্ষা করছিল ত্রাণের জন্য। কিন্তু সবার ভাগ্যে জোটেনি ত্রাণের স্লিপ। বুক পানি ভেঙ্গে আসা ত্রাণ বঞ্চিতরা ক্ষোভে ফেঁটে পড়েন। হন্যের পাড়ের নুরভানু বেগম(৬০), সকিনা (৫০), তেলিপাড়ার আব্দুর রহমান (৫০), ভট্টপাড়ার মালেকা বেগম(৪৮), মিস্ত্রিপাড়ার রাহেনা (৪৪), ওয়াপদা বাঁধের মেহেনা (৩৯), নুর নাহার (৪২), মাজেদা (৪৭) ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করে বলেন, চেয়ারম্যান মেম্বারদের কাছের মানুষ না হওয়াতে তারা ত্রাণ বঞ্চিত হয়েছেন। রমনা মাষ্টার পাড়ার দিনমজুর ছক্কু মিয়ার স্ত্রী ইয়ারন বেগম (৫০) বলেন, তিন সন্তান নিয়ে ৬দিন ধরে পানি বন্দি জীবন যাপন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা মেলেনি। রমনা ইউনিয়নের অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে দশ কেজি করে চাল বিতরণ করছেন, ট্যাগ অফিসার কবিরুল ইসলাম।সঙ্গে ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি আবু হানিফ ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মিনারুল ইসলাম দোলন। চাল মাপার ঝামেলা এড়াতে তিনজন মিলে দেয়া হচ্ছে ৩০ কেজি ওজনের একটি বস্তা। ট্যাগ অফিসার কবিরুল ইসলামের দাবি, রিলিফ বিতরনের বির্তক ও অভিযোগ এড়াতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইউপি সচিব মিনারুল ইসলাম দোলন জানান, গত সোমবার ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার জাতীয় শোক দিবস থাকায় মাল উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। তাই বুধবার ৮০০ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এই ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল কাদের অভিযোগ করেন, তার ওয়ার্ডের বন্যা আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা ১হাজার ৪ শত। অথচ ত্রাণ পেয়েছে মাত্র ১’শ ৫০ জন। ফলে ত্রাণের জন্য হাহাকার রয়ে গেছে। 
রমনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজগর আলী সরকার জানান, ভয়াবহ বন্যায় ৮ হাজার পরিবার বানভাঁসি। ৮’শ মানুষকে ত্রাণ দেয়া সম্ভব হলেও ত্রাণ বঞ্চিতের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। গত ৬দিন ধরেই এই ইউনিয়নের ৯০ভাগ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত।
নয়ারহাট ইউপি চেয়ারম্যান আবু হানিফা জানান, তার ইউনিয়নে ৩হাজার ৫’শ পরিবার পানি বন্দি। এখন পর্যন্ত তিনি ১০ মেট্রিক টন চাল পেয়েছেন। যা বুধবার ১ হাজার পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়। ত্রাণ অপ্রতুল হওয়ার কারণে হতদরিদ্র আড়াই হাজার পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। এসব পরিবারের মাঝে খাদ্য সংঙ্কট বিরাজ করছে।
চিলমারী ইউপি চেয়ারম্যান গওছল হক মন্ডল জানান, তার ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্থ ২ হাজার ৩’শ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে পেরেছেন মাত্র ১ হাজার পরিবারকে। 
রাণীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তিনি মাত্র ১০ টন চাল বরাদ্দ পেয়েছেন। এই ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ৭ হাজার। প্রতিদিন শত শত মানুষ ত্রাণের জন্য ভিড় করে বাড়িতে। 
অষ্টমীর চর ইউপি চেয়ারম্যান আবু তালেব ফকির ১১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জানান, এখনো বন্যার্ত আড়াই হাজার পরিবারকে ত্রাণের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
থানাহাট ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মিলন জানান, ৩ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ত্রাণ বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ১২টন চাল। যা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মির্জা মুরাদ হাসান বেগ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ২৭ হাজার ৯১ এবং নদী ভাঙ্গনের শিকার ২১১ পরিবার। বুধবার ৬হাজার ৫’শ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে ৬৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়।
 
এবিএন/গোলাম মাহবুব/জসিম/নির্ঝর

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত