logo
শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭
 

স্মরণের আবরণে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ

স্মরণের আবরণে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ

নেছার আহমদ, ১৫ জুলাই, এবিনিউজ : চল্লিশ দশকে চট্টগ্রামের রাজনীতির ময়দানে যে কয়জন উজ্জ্বল নক্ষত্রসম রাজনীতিতে আবির্ভাব হয়, তাঁর মধ্যে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদের নাম অন্যতম। চল্লিশের দশকে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও পেশীশক্তি বিস্তার ঘটে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দালালীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করে নিন্দিত ও বিতর্কিত হন। তিনি হলেন সে সময়কালের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতা মুসলীম লীগের অন্যতম নীতি নির্ধারক ফজলুল কাদের চৌধুরী। সে সময়ে আরো একজন রাজনৈতিক নেতার নাম চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়, তিনি হলেন “সালারে জিলা” হিসাবে পরিচিত শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ। তিনি অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা (চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ) আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। চট্টগ্রাম শহরের পাঠানটুলির কাপুড়িয়া পাড়ায় ১৯০৮ এর ২২ ফেব্রুয়ারি এক মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদের জন্ম। তাঁর বাবা প্রবাসে বসবাসকারী ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নজু মিয়া এবং মা মোসাম্মৎ কুলসুমা খাতুন।

স্থানীয় স্কুলে মোজাফ্‌ফর আহমদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি।

শেখ মোজাফ্‌ফর অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পিতার আকস্মিক তিরোধানে পরিবারের সমস্ত দায়িত্বভার তাঁর ওপর এসে পড়ে। ফলে লেখাপড়া ছেড়ে তাঁকে জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয়। ১৯২৭ সালে মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে চট্টগ্রাম বন্দরে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের জেটিতে তিনি চাকরী নিতে বাধ্য হন।

শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ ছাত্র জীবন হতে নাটক, কবিতা, গল্প লেখা শুরু করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা স্বভাবের মানুষ। সে সময়ে জাতির পরাধীনতা তাঁর নিদারুন মর্মবেদনায় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তি জীবনেও বাঁধা ধরা চাকরী তাঁর পছন্দ হয়নি। ফলে মাত্র দু’বছর যেতে না যেতেই জেটির চাকরীতে হাফিয়ে উঠেন। ১৯২৯ সালে চাকরী ছেড়ে দিয়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম টেরিটেরিয়াল ফোর্সের হায়দ্রাবাদ রেজিমেন্টের অধীনে সামরিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য ভর্তি হয়ে যান। সামরিক বাহিনীতে কৃতিত্বের জন্য তিনি বাংলার গর্ভণরের পক্ষ হতে বিশেষ পদক এবং ১৯৩২ সালে বেস্ট এ্যাডওয়ার্ড খেতাব লাভ করেন।

১৯৩০ সালে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ আমর্ড গার্ডে যোগদেন। ১৯৪০ সালে তিনি আবার বন্দরের জেটিতে চাকরী নেন। এ সময় তাঁকে সিভিল গার্ডের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি সিভিল গার্ডকে সু সংগঠিত করেন।

শৈশব হতেই নাট্যচর্চার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। স্কুলে লেখাপড়া করার সময় অভিনয়ে যথেষ্ট দক্ষতা প্রদর্শন করেন। সে সময়ে পলাশীর যুদ্ধ ও সিরাজউদ্দৌলার পতনকে ভিত্তি করে “বাংলার পতন” নামে একটি নাটক রচনা করেন। এ নাটকটি সে সময়ে (অর্থাৎ ১৯২০ -১৯৩০ সালে) বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। শিশির ভাদুরী সহ অনেক নামিদামী নাট্যকাররা “এক পঞ্চাঙ্ক” এ নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

সে সময় পাকিস্তান আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে। শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ এ সময় মুসলিম লীগে যোগদেন। মুসলিম লীগ “ন্যাশনাল গার্ড” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করলে সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদকে এ বাহিনীর “সালারে জিলা” বা জেলা কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়।

কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রাম জেলায় পঞ্চাশ হাজার সদস্যের “ন্যাশনাল গার্ডের” এক বিশাল সংগঠন গড়ে তোলেন।

সে সময়ে চট্টগ্রাম মানুষের কাছে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ “সালারে জিলা” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ সময়ে তাঁর নামের সাথে “সালারে জিলা” অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৫ সাল হতে ১৯৫৮ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ অত্যন্ত কর্মব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। ১৯৫৫-৫৮ মেয়াদের পাকিস্তান কেন্দ্রীয় গণ পরিষদের নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। এ নির্বাচনে তিনিই একমাত্র গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময়ে গণ পরিষদে আওয়ামীলীগের মাত্র ১৩ জন সদস্য ছিলেন। যাদের সমর্থন নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগ্রামী পুরুষ।

বাংলা ভাষার মর্যাদায় তিনি রাজপথে লড়াই করেছেন, তেমনি সংসদেও বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে মাতৃভাষার সম্মান ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। সে সময়ে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্যরা ইংরেজিতে বক্তৃতা করতেন। শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদই সর্বপ্রথম বাংলা বক্তৃতা দিয়ে পাকিস্তানের সংসদে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

গণপরিষদের সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন। ১৯৫৮ এর ৭ অক্টোবর ইস্কান্দর মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করেন। গণপরিষদ বিলুপ্ত করা হয়। ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দর মির্জাকে হঠিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক শাসনকালীন সময়ে সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে রাজনীতিকদের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অফুরন্ত অবসর জুটে যায়। শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদেরও রাজনীতি হতে অবসর জুটে। তখন তিনি পরিবারের সচ্ছলতা ফিরে আনার জন্য ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন।

আগ্রাবাদ বাদামতলীর মোড়ে নিজের জায়গায় একটি বিস্কুট তৈরীর কারখানা খুলেন, তাঁর চার সন্তানের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বেকারীর নাম রাখে “জ্যাকস”। সে সময়ে “জ্যাকস” শহরের একটি রুচিশীল অভিজাত বেকারী হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করে। ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি বেকারীটি চট্টগ্রামের রাজনীতির এক তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা এম এ আজীজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর নিত্য উপস্থিতি ছাড়াও দলের অন্যান্য নেতা কর্মীদের আনাগোনায় “জ্যাকস” আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পরিণত হয়।

“জ্যাকস” প্রতিষ্ঠার পর তিনি সীতাকুণ্ডে একটি ইট ভাটা স্থাপন করেন। ইট তৈরীর ব্যবসায়ও তিনি সফলতা লাভ করেন। পাকিস্তান বিরোধী বাংলাদেশ সংগ্রামের সূচনাকালীন সময়ে তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে প্রথম সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সে হিসেবে তিনি অবিভক্ত (অর্থাৎ চট্টগ্রাম মহানগরী, উত্তর ও দক্ষিণের) চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন হতে শুরু করে সকল আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদের গভীর সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তাঁকে খুবই সম্মান, শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী চট্টগ্রাম আসলে ষ্টেশন রোডে বর্তমান বিআরটিসি বাস টার্মিনালের পূর্ব পার্শ্বে “ওয়ালেস” নামে একটি হোটেলে উঠতেন। চট্টগ্রামের নেতাদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদকে ডেকে নিতেন এবং পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে তিনি এতই শোকাবির্ভত হয়ে পড়েন যে, তিনি রাজনীতিই ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্থাল আন্দোলন শুরু হলে তিনি আর ঘরে থাকতে পারেন নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিসংগ্রামকে সংগঠিত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসন্ন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে নেন। ২৫ মার্চ ৭১ এ লালদিঘী ময়দানে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কুচকাওয়াজের আয়োজন করে জহুর আহমদ চৌধুরী ও এম আর সিদ্দিকীর সাথে কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণায় দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ যুদ্ধ পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করেন। ৩০ মার্চ ৭১ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে চট্টগ্রাম শহরের পতন ঘটলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আলমগীরকে সাথে নিয়ে রাউজানের এয়াছিন নগরে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। সেখান হতে গোপনে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এরিমধ্যে তাঁর গোপন আস্তানার সংবাদ ফাঁস হয়ে যায়। ফলে তাঁর পক্ষে গোপন স্থানে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি পুত্রকে নিয়ে শহরে ফিরে আসার পথে পাকিস্তান বাহিনীর দোসর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পোষা কুকুররা তাঁর পিছু নেয়। তাঁদের বাস হাটহাজারী পৌঁছার পর সেখানে আগে হতে পাকিস্তানী বাহিনী নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকা সাকা চৌধুরী বাস থামিয়ে পিতা পুত্রকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেয়। পাক বাহিনী তাঁদেরকে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যায়। এরপর আর তাঁদের কোন খোজ পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার জন্য শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ তাঁর জীবনের মূল্য দিয়ে তা প্রজন্মের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন।

সম্ভবত শেখ মোজাফ্‌ফরের ন্যায় এত বড় স্তরের নেতাদের কেউ শহীদ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে। কিন্তু কোন জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিকে জীবন দিতে হয়নি। এখানে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ একজন স্বাধীনতার বীর শহীদ হিসেবে অনন্য সম্মানের অধিকারী।

শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ দল মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাজনীতিতে স্বমহিমায় সিদ্ধি লাভ করে ছিলেন, তেমনি সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে অনন্য স্থান দখল করে নিয়েছেন। একজন বীর শহীদ, রাজনীতিবিদ্‌ এবং একজন সাহিত্যিক হিসেবে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ এক অনন্য সম্মানের অধিকারী।

বর্তমান ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদের ন্যায় বিশাল ব্যক্তিত্বসম রাজনীতিতে বড়ই প্রয়োজন ছিল। প্রজন্মের কাছে মহান এ ব্যক্তিত্বকে পরিচিত করে দিতে পেরে গর্ব অনুভব করছি।

“যাদের রক্তে মুক্ত এদেশ / তাঁদের কোনমতে ভুলার নয়”।

সূত্র : ১। সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী লিখিত ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ। ২। একে এম এমদাদুল ইসলাম রচিত এদেশে যারা স্মরণ ও বরণ যোগ্য। ৩। স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধাদি।
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত