logo
শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭
 

মেয়েটি না বলেছিল, না মানে না

মেয়েটি না বলেছিল, না মানে না

কামরুল হাসান বাদল, ১৮ মে, এবিনিউজ : বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনার সাথে ভারতীয় ছবি ‘পিংক’ এর কাহিনির সাযুজ্য আছে। ‘পিংক’ ছবিটির কাহিনিও অবিকল এই ঘটনার মতো। ছবিটি যারা আগে দেখেছেন এই ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরপর তারা তাদের আলোচনা ও যুক্তিতে এই ছবির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। ধনী পরিবারের বখে যাওয়া সন্তানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল তরুণীদের। মামলায় অসাধারণ যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে তরুণীদের আইনজীবী তরুণীদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ (?) সত্ত্বেও প্রমাণ করেছিলেন, ভিকটিম তখন ধর্ষণে বাধা দিয়েছিল। তরুণীটি বলেছিল না। তাদের পক্ষের আইনজীবী বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘মেয়েটি না বলেছিল, ইয়োর অনার। না মানে না। আইনজীবী হিসেবে অমিতাভ অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন এই ছবিতে।

পিংক ছবিটিতে ওই মেয়েগুলোকে যেভাবে বেশ্যা, নষ্টা চরিত্রহীন হিসেবে আখ্যায়িত করার দৃশ্য অবলোকন করেছিলাম এখন বাংলাদেশে বাস্তবে তাই দেখতে পাচ্ছি। ভদ্রলোকের মুখোশ পরা সমাজের কীটরা এখন কতভাবেই না মেয়ে দুটিকে দোষী, কলগার্ল, পতিতা হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে।

এই ঘটনার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এই অপরাধের বিচার দাবি করে যেমন তেমনি করে এই মেয়ে দুটির চরিত্রহানি করেও। ফেসবুকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গড়পরতা মানুষের উপস্থিতি বেশি। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনেকে তাদের ক্ষোভ, বেদনা, আনন্দ প্রকাশ করেন খুব খোলাখুলিভাবে। এখানে সম্পাদনা করার কেউ নেই বলে অনেক ক্ষেত্রে অশালীন, অশোভন, অভদ্র বক্তব্যও প্রকাশ পেয়ে যায় সহজেই।

বাক্য গঠন কিংবা বানান শুদ্ধ হলো কি হলো না এ নিয়ে কেউ চিন্তিত নন এমন ব্যক্তিও দিনে তিন/চারটি স্ট্যাটাস দিয়ে যাচ্ছেন। তবে কোনো কিছুই ফেলে দেওয়ার মতো নয়, এর মাধ্যমে সমাজের সাধারণ কিছু মানুষের মতামত জানার সুযোগ হয়। সুযোগ হয় কোনো ঘটনার সম্পাদনাহীন প্রতিক্রিয়া জানার।

দু’ছাত্রী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা নিয়েও তোলপাড় চলছে ফেসবুকে। এর মধ্য থেকে নুরুল আবসার নামের এক ব্যক্তির স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দিচ্ছি পাঠকদের উদ্দেশে বানান ও বাক্যগঠন তাঁর মতো রেখে “আমি জানি অনেকে আমার সাথে একমত হবে না। গালিও দিবে। আনফ্রেন্ডও করিবে। হ্যাঁ আমি বনানীর ধর্ষণ ঘটনা নিয়েই বলছি। ধর্ষকদের সাজা চাই আমিও তবে সেটা ধর্ষণের জন্য নয়। তাহারা এমন খারাপ কাজের ভিডিও করেছে তাহার জন্য। তাহারা ভয় ভীতি দেখাইয়াছে কিনা জানি না। তবে মেয়ে দুটি যে জেনে শুনেই গিয়াছে তাহাই সত্যি। এদের জীবনে এমন কিছু এই প্রথম নয়। তাহাদের মা বাবাও মেয়েদের ইনকামে ছেড়ে দিয়াছে। এরা কলগার্ল ছাড়া কিছুই নয়। তাহাদের অনিচ্ছায় কিছু হলে তাহারা সকালে উঠে রিসিপসনে অভিযোগ করিত। পুলিশ স্টেশনে যাইত। ঘরে গিয়া মা বাবাকে জানাইত। দেড় মাস পরে কেন অভিযোগ? ওদের ধর্ষকরা ব্লাকমেইল করিয়াছে তেমন কিছুই জোর দিয়া বলেনি। দেনা পাওনার হিসাব গড়বার হইয়াছে বলেই এই অভিযোগ। এমন মেয়েদের কারণে সমাজ কলুষিত হচ্ছে। এই নরপশুদের সাথে সাথে এইসব মেয়েদের সমাজে সাজা দেওয়া উচিৎ। এদের মায়ের জাত বলিলে মাকেই অপমান করা হবে।” এই ব্যক্তি তার স্ট্যাটাসে বিভিন্নজনের মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে এই মেয়েদের পতিতা, কলগার্ল বানিয়ে ছেড়েছেন। এবং এক জায়গায় লিখেছেন তাঁর এই ধরনের মেয়ে থাকলে তিনি অনার কিলিং করতেন।

একটি সভ্য দেশে কোনো ব্যক্তির পক্ষে ভিকটিম সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করা সম্ভব বলে মনে হয় না। এই একজন নুরুল আবসারকে দিয়ে আমাদের সমাজের প্রকৃত চেহারাটি আমরা দেখতে পাব। আমরা অনুধাবন করতে পারবো এখনো সমাজে একজন নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হয়। নারীর প্রকৃত অবস্থানটি সমাজে কেমন। হেফাজতের আমীর শফি সাহেবের একটি মন্তব্যে দেশে তোলপাড় হয়েছিল। আমারতো মনে হয় তিনি খুব মন্দ বলেননি। বরং তাঁর কথায় এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের প্রকৃত চরিত্রটিই বেরিয়ে এসেছিল।

এই সমাজে একটি নারী ধর্ষিত হয় একবার। আর এ ঘটনা জানাজানির পর সে নারীকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ধর্ষিত হতে হয়তো পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। যাঁরা আইন পেশায় আছেন তাঁরা এবং যাঁদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাঁরা খুব ভালোভাবেই জানেন ধর্ষণের মামলা করতে গিয়ে, এই মামলা চালাতে গিয়ে একই নারীকে কতভাবেই না আরও ধর্ষিত হতে হয়। এই সমাজ এখনো নুরুল আবসারদের চোখ দিয়ে নারীকে দেখে। এই সমাজ এখনো নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখে। পুঁজিবাদী বিশ্বে ভোগবাদকে উসকে দেওয়া হয়। বিনোদন ও মনোরঞ্জনের জন্য হাজারো উপাদান তৈরি করা হয়।

আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার বলেছেন, তাঁর সুপুত্রের প্রতিদিনের হাত খরচ দুলাখ টাকা। তথ্যটি বিস্ময়কর। একজন তরুণ এই ঢাকা শহরে প্রতিদিন দু লাখ টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ করবে? মদ, মেয়ে মানুষ, হেরোইন, ইয়াবা ছাড়াতো আর কোনো রাস্তা নেই তার। ফূর্তি-মাস্তি মানেই তো মদ আর মেয়ে মানুষ। একটি ছেলের প্রতিদিন দুলাখ টাকা হাত খরচ, এই খরচতো বিল গেটসের ছেলেও পায় না। এর তুলনা চলতে পারে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারে, যেখানে ব্যভিচারই হচ্ছে তাদের সংস্কৃতি।

দিলদার কোনো শিল্পপতি নয়। সে দোকানদার। কয়েকটি সোনার দোকান আছে তার। তার এই অঢেল সম্পদের উৎস কী? প্রতিদিন কত কোটি টাকা উপার্জন করলে একটি ছেলের শুধু হাত খরচ হতে পারে দিনে দুলাখ টাকা। দিলদার তাহলে আয়কর দিতো কত? ভ্যাট? তাঁর এত সোনা সংগ্রহের উৎস কী? বাংলাদেশেতো স্বর্ণ আমদানি নিষিদ্ধ। ব্যক্তিগতভাবে ১০ গ্রামের বেশি কেউ স্বর্ণ আনতে পারে না। এত স্বর্ণ দিলদার পেল কোথায়। কী অদ্ভুত! যে দেশে সোনা আমদানি হয় না সে দেশে প্রতিদিন অন্তত কয়েক মণ স্বর্ণ কেনা-বেচা হয়ে থাকে। এই প্রশ্ন এতদিন কেউ তোলেনি। পত্র-পত্রিকায় স্বর্ণের দাম ওঠা-নামার খবর জানাতে গিয়ে হয়তো কখনো লেখা হয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে কেউ ভাবেনি, কেউ প্রশ্ন তোলেনি। বনানীর ঘটনার পর শুল্ক বিভাগ যেভাবে আপন জুয়েলার্সের দোকান সিলগালা করছে তাতে মনে হচ্ছে শুল্ক বিভাগ এত বছর বিষয়টি জানতো না। নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছিল তারা।

সোনা পাচার করে কিংবা পাচার করা সোনা ক্রয় করে ত্রিশ বছরের মধ্যে দিলদার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আর এইভাবে রাতারাতি যারা বড় লোক হয়, তারাতো দিলদার ও তার পুত্রের মতো আচরণই করবে। এ দেশেও অনেক শিল্প পরিবার আছে। যাঁরা স্বীয় মেধা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে তাদের শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছেন। এই অঞ্চলে প্রথম শিল্প স্থাপনকারী ইস্পাহানি, এ কে খান পরিবার, অধুনা পিএইচপি, বিএসআরএমসহ দেশের সৎ শিল্পপরিবারগুলোতে এমন উচ্ছৃঙ্খলতা কখনো দেখা যায়নি। কালো টাকা, অবৈধ উপার্জনকারী পরিবারে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে।

ধর্ষণ যে শুধু বাংলাদেশ বা এই উপমহাদেশে হচ্ছে তা নয়। পশ্চিমা বিশ্ব, যেখানে নরনারীর মুক্ত মেলামেশার সুযোগ আছে, সেখানেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তবে বাংলাদেশের সাথে তার ব্যতিক্রম হচ্ছে-ওখানে ধর্ষিতা বিচার পায়। ধর্ষক সমাজের কে, তার সামাজিক কী অবস্থান, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় কী এসব ওদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমলে নেয় না। ওখানে একজন নারী জানে রাষ্ট্র তাকে কীভাবে সুরক্ষা দিয়েছে। আর বাংলাদেশে পুলিশের প্রথম কাজ হচ্ছে এই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে প্রথমেই অভিযোগকারীনিকে হতাশ ও নিরুৎসাহিত করা। আর এক্ষেত্রে অভিযুক্ত যদি সমাজের হোমরা চোমড়া শ্রেণির হয় তখন আপনা থেকেই তার লেজ নড়তে থাকে। পুলিশই উদ্যোমী ভূমিকা পালন করে কীভাবে প্রভাবশালী অভিযুক্তকে বাঁচানো যায়।

সাম্প্রতিক ঘটনায় এই দুটি মেয়ের ক্ষেত্রেও পুলিশ একই ভূমিকা পালন করেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা নিতে গড়িমসি করেছে পুলিশ।

পশ্চিমা বিশ্বে কী অবস্থা তা লিখেছেন কানাডা প্রবাসী ও ‘নতুন দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সেরীন ফেরদৌস। তিনি লিখেছেন, জানি, পশ্চিমের এই শহরটাতে তুলনামূলকভাবে আমার দুই কন্যা সন্তান নিরাপদ। কোনো অপরাধের শিকার হলেও, প্রচলিত আইনে ন্যায্য বিচার তারা পাবে। পাবেই, কোনো মন্ত্রী-আমলা-টাকার কুমিরও সেই শাস্তি থেকে ছাড় পাবে না। একচুলও নয়। আর এইটুকু নিরাপত্তাবোধ যে কী বিশাল শান্তি। আমার মেয়ে যতই বুক চিতিয়ে হাঁটুক না কেন, হাঁটুর ওপরে স্কার্ট পরে ঘোরাঘুরি করুক না কেন, ওর মাথাতেই নেই এতে ওর নিরাপত্তার কোনো সমস্যা হতে পারে। ও পরিষ্কার জানে, একটি ছেলে তিন সেকেন্ডের বেশি ওর শরীরের কোনো অংশে মনোযোগ দিলে ওর কর্তব্য কী? ও জানে সেলফোনে তিনটি নম্বর ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে ওকেই বিশ্বাস করবে সবার আগে। শুধু মেয়েই নয়, সম্ভাব্য ধর্ষকও এ তথ্য জানে। স্কুল ওকে প্রতি পলে পলে শিখিয়েছে সব। ছেলে শিশুদের যথাযোগ্য মগজ ধোলাইয়ের কাজও সারা হচ্ছে স্কুলে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে।”... ছেলেরা জেনে যায় ধর্ষণতো দূরের কথা, মেয়েদের সামান্য অ্যাবিউজ করে কেউ ছাড় পাবে না আইন ও প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে। সামাজিক অবমাননা থেকে।”

আর আমাদের সমাজে একটি ছেলে শিশু বেড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে একটি মেয়েকে, নারীকে অপমানিত হতে দেখে দেখে। সামান্য মানুষেরও মর্যাদা না পাওয়া নারীদের তাই এখানে পুরুষের ইচ্ছার দাস হিসেবে দেখা হয়। তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, তার দিকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া যায়। এবং সুযোগ পেলে তার শরীর নিয়ে মেতে ওঠা যায়। কারণ এখানে তো ঘরের বাইরে পা রাখা নারীদের নষ্টা বলে দেখা হয়। আর বন্ধুদের বিশ্বাস করে তার অনুরোধে কোনো পার্টিতে গেলে তাকে বেশ্যা বা পতিতা বানিয়ে দেওয়া হয়।

এদেশের পুরুষরা বিশ্বাসই করতে চায় না, নারীর শরীরের মালিক নারীই। তার অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া তার শরীর স্পর্শ করা মানে অনধিকার চর্চা করা, নারীকে অপমান করা। অসম্মতিতে নিজের স্ত্রীর সাথে সহবাসও ধর্ষণ বলে বিবেচিত। একজন নারীর না বলা মানে, যে কোনো অর্থে না।

না বলা মানে আমার শরীর থেকে তোমার কুৎসিত হাত গুটিয়ে নাও পুরুষ।

Email: qhbadal@gmail.com
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত