logo
শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭
 

জেব্রা ক্রসিং কি বিলুপ্ত হয়ে গেলো!

জেব্রা ক্রসিং কি বিলুপ্ত হয়ে গেলো!

মুহাম্মদ মুসা খান, ১৬ মে, এবিনিউজ : একসময় শহরের রাস্তায় সাদা রংয়ের জেব্রা ক্রসিং একদিকে যেমন রাস্তার শোভা বর্ধন করতো, অন্যদিকে পথচারিদের শৃংখলার সাথে রাস্তা পারাপারে সুযোগ করে দিতো। জেব্রা ক্রসিং-এর উৎপত্তি কখন, তা সঠিক জানা না গেলেও সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ যখন নিজেদের মধ্যে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, সম্ভবত তখনই রাস্তা পারাপারে নিয়মানুবর্তিতা প্রবর্তনের মানসেই জেব্রা ক্রসিং-এর সৃষ্টি হয়েছিলো।

শহরের রাস্তায় যখন জেব্রা ক্রসিং ছিল, তখন এর বহুবিধ সুবিধা আমরা প্রত্যক্ষ করতাম। যেমন- পথচারিরা সুশৃংখল ভাবে রাস্তা পার হতো, মোড়ে লালবাতি জ্বললে বা গাড়ি থামার সংকেত পেলে গাড়ি গুলো জেব্রা ক্রসিং-এর সামনে এসে থেমে যেতো, ফলে পথচারিরা নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে রাস্তা পার হতে পারতো। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের কোন সমস্যা হতো না। জেব্রা ক্রসিং-এর উপর দিয়ে হুইল চেয়ারে করে প্রতিবন্ধিদের রাস্তা পার হতেও দেখা যেতো। মূল কথা হলো- জেব্রা ক্রসিং ট্রাফিক সিস্টেমের অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করতো।

দুঃখজনক সত্য হলো, অজ্ঞাত কারণে অনেক বছর যাবৎ “জেব্রা ক্রসিং” নামের এই সুন্দর ও সভ্যতার প্রতীক চিহ্নটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কখন থেকে শহরের রাস্তা হতে এই জেব্রা ক্রসিং হারিয়ে গেলো তা সঠিক বলতে না পারলেও সম্ভবতঃ এক যুগ বা তারও বেশী সময় হবে বলে মনে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- ট্রাফিক সিস্টেমের এই সুন্দর প্রতীকটি কেন আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে? কার অবহেলায় বা কার অযোগ্যতার কারণে আমরা এই সুন্দর প্রতীকটি হারিয়ে ফেললাম? এর উত্তরে বলা যায়, যে প্রতিষ্ঠান (ট্রাফিক বিভাগ) সভ্যতার এই প্রতীক চিহ্নটি সংরক্ষণ করার কথা সেই প্রতিষ্ঠানের গাফেলতির কারণেই মূলতঃ জেব্রা ক্রসিং বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যা চরম দায়িত্ব অবহেলা বৈ অন্য কিছু নয়।

বর্তমানে জেব্রা ক্রসিং বিহীন রাস্তায় পথচারিদের রাস্তা পারাপারের চিত্র দেখলে একদিকে যেমন গা শিউরে উঠে, তেমনি নিজেদের “অসভ্য” বলে মনে হয়। পথচারিদের (নারী, পুরুষ সবাই) এলোপাতাড়ি, কোনাকুনি, যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়ার চিত্র রীতিমত ভীতিজনক। ৫০ কি.মি. বেগে আসা গাড়িকে “এলোপাতাড়ি রাস্তা পার হতে থাকা বেপোরোয়া পথচারি” হাত তুলে থামিয়ে দেয়। সামনের দ্রুতগামী গাড়িকে যখন কান্ড-জ্ঞানহীন পথচারির হাত তোলার কারণে হঠাৎ থেমে যেতে হয়, তখন পেছনের গাড়িও থামতে বাধ্য হয়। সামনের গাড়ির এই আকস্মিক ব্রেক কষার কারণে এক গাড়ির সাথে অন্য গাড়ির ধাক্কা লেগে যায়, সূত্রপাত হয় সড়ক দুর্ঘটনার। কিন্তু পথচারি নির্বিকার। জেব্রা ক্রসিং না থাকার কারণে ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি গুলো থামার কোন নিয়মনীতি মানে না, মোড়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে যায়। তাছাড়া গাড়ি আর পথচারি লুকোচুরি খায় বলেই মনে হয়। একবার এক টিভি অনুষ্ঠানে দেখিয়েছিলো, পথচারিরা “ব্রেকড্যান্স” ষ্টাইলে গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে রাস্তা পার হচ্ছে। দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, পথচারিদের র্নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ট্রাফিক পুলিশ/ সার্জেন্টরা কখনই কিছু বলেন না বা কোন উদ্যোগ নেন না।

আমরা আমাদের কর্তা ব্যক্তিদের মুখে অনেক সুন্দর সুন্দর জ্ঞানের কথা শুনি। উনারা আমাদের অনেক নসিহত করেন। কিন্তু শহরের রাস্তা থেকে জেব্রা ক্রসিং বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উনাদের নজরে আসেনা বলেই সম্ভবতঃ এই জেব্রা ক্রসিং বিষয়ে উনাদের মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। অনেকের অভিযোগ উন্নয়নের ফিরিস্তির নীচে নাকি জেব্রা ক্রসিং চাপা পড়ে গেছে! আমাদের খুবই আশ্চর্য লাগে যখন দেখি অক্ষরজ্ঞান না জানা মানুষকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার জন্য ওকালতি করা হয়, কিন্তু জেব্রা ক্রসিং বা ট্রাফিক শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য কোন কথা বলা হয় না (নতুন আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স-এর জন্য অষ্টম শ্রেণী পাসের সনদ পত্রের কথা বলা হয়েছে)।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রাস্তা পারাপারের জন্য পথচারিরা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করেন। ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও কম থাকে। আমাদের দেশে স্বাধীনতা পরবর্তি যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অবকাঠামো, উন্নয়ন কার্যক্রম অনেক বেশী হচ্ছে, এ বিষয়টি আমরাও দেখছি এবং সরকারের পক্ষ থেকেও প্রচার করা হয়। কিন্তু ট্রাফিক বিভাগ হতে ট্রাফিক সিস্টেম উন্নয়নের জন্য তথা জেব্রা ক্রসিং পুনঃস্থাপন, ট্রাফিক চিহ্ন পুনঃস্থাপন, সিগন্যাল বাতি স্থাপন, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও শহরের অভ্যন্তরে যাত্রীবাহন বাস/ টেম্পু দাঁড়ানোর জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করা ইত্যাদি বিষয়ে অদ্যাবধি কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখিনি। ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নের পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে শহরের ট্রাফিক জ্যাম কোনভাবেই কমানো যাচ্ছে না, বরং দিন দিন ট্রাফিক জ্যাম বাড়ছে। এই ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার বা নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অনেক কিছুই করা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। শহরের অভ্যন্তরে রিক্সা, থ্রি হুইলারের দৌড়াত্মে পথচারিদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরের যানজট দেখলে রীতিমত আঁৎকে উঠতে হয়। শহরে যানবাহনে যেমন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে, তেমনি হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটেও চলে। অথচ পা’য়ে হেঁটে চলার মানুষদের “নিরাপদ চলাচলের” জন্য কোন সুব্যবস্থা নাই। প্রয়োজনীয় ওভারব্রীজ না থাকার কারণেও মানুষ রাস্তা পারাপারে সমস্যায় পড়ে। আবার যে কয়েকটা ওভারব্রীজ আছে, সেগুলোতে হকার ও টোকাইদের দৌড়াত্ম্যে পথচারিরা উঠতে চায় না। শহরের রাস্তার পাশে ফুটপাতগুলো অবৈধ দোকানিদের দখলে। দোকানদাররা দোকানের ভিতরের চেয়ে বাইরে তথা ফুটপাতে ব্যবসা করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন বলে মনে হয়। দোকানে জায়গা থাকলেও ফ্রিজ-চুলা বাইরে ফুটপাতে বের করে রাখেন। ফুটপাতে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে বিপদজনক ভাবে নাস্তা তৈরী করে বিক্রির দৃশ্যও আমরা দেখে থাকি। ফুটপাতে চাঁদাবাজির ঘটনাও আমরা প্রত্যক্ষ করি।

সব মিলিয়ে সহজে বুঝা যায় যে, পুরোপুরি ট্রাফিক পদ্ধতির উন্নয়ন ব্যতিত ট্রাফিক শৃংখলা আনয়ন সম্ভব নয়। তাই শহরের রাস্তায় পথচারি পারাপারের জন্য দ্রুত জেব্রা ক্রসিং দেয়া আজ সময়ের দাবি। শুধু জেব্রা ক্রসিং দিলেই হবে না, এই জেব্রা ক্রসিং দিয়ে যেন পথচারিরা রাস্তা পার হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে মোটিভেট করতে হবে এবং সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি না জ্বলা পর্যন্ত বা গাড়ি বন্ধ করার সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত পথচারিরা যাতে রাস্তা পার না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে এলোপাতাড়ি রাস্তা পার হওয়ার জন্য পথচারিদের তাৎক্ষণিক ১০/২০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা যেতে পারে। তাছাড়া শহরের বিভিন্ন মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন ও যাত্রীবাহী গাড়ি দাঁড়ানোর স্থান চিহ্নিত করে দেয়াও প্রয়োজন। আশাকরি ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ অচিরেই পথচারিদের জন্য শহরের রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং-এর ব্যবস্থা করে নিরাপদ রাস্তা পার হওয়া নিশ্চিত করবেন।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত