logo
শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭
 

অপূরণীয় ভ্রান্তিবিলাস

অপূরণীয় ভ্রান্তিবিলাস

অজয় দাশগুপ্ত, ২১ এপ্রিল, এবিনিউজ : বাংলা নববর্ষ পালন নিয়ে কত উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ। একদিকে মানুষের অসীম আগ্রহ আরেকদিকে দেশের অন্ধকার শক্তির আস্ফালন। বিগত কয়েকবছর ধরে উৎকণ্ঠার কিছু যৌক্তিক কারণ ও ঘটেছে বৈকি। গেল বার মঙ্গল শোভাযাত্রার ভেতর ঢুকে পড়া এক শ্রেণির ইতরের দল মা বোনদের কাপড়ে গায়ে হাত দিয়ে যে অপমানজনক পরিবেশ তৈরি করেছিল , এখন মনে হচ্ছে সেটাও হয়তো ছিল পরিকল্পিত। এরা কারণ তা সরকারের অজানা নয়। দেশের বাহিনীগুলোও ভালোই জানে কারণ এইসব দুষ্কৃতি। কিন্তু কি তাদের ভাগ্যে ঘটেছে কোথায় তারা আজ আমরা আর কিছুই জানি না। এই আমাদের জাতীয় চরিত্র। যে কোন ঘটনায় আমরা প্রথমে হামলে পড়লেও ক’দিন পর সব ভুলে যাই আমরা। অথবা ভুলে যাবার আয়োজনগুলো কিংবা নীল নকশায় ভুলিয়ে দেয়া হয়। এটা তেমন কোন ঘটনার মত চাপা পড়ে গেলেও বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ পড়েছে তোপের মুখে। একবার ভুভুজেলা পরের বার মুখোশ এরপর হয়তো মানুষকেই আসতে দেয়া হবে না। হয়তো বলা হতে পারে মুখোশগুলোই হেঁটে যাবে মানুষের প্রয়োজন নাই।

অথচ মানুষ অকুতোভয়। বাঙালি এক অনন্ত সম্ভাবনার জাতি। তারা ভাঙে কিন্তু মচকায় না। এবারও তারা তাই করেছে। ঘরশত্রু বিভীষণের জ্বালায়, তাদের হুংকারে অতিষ্ঠ হবার পরও এই জাতি নিজের জাতিসত্তা ও উৎসবের প্রতি নিবেদিত। তারা খুব ভালো জানে ধর্ম যার যার উৎসব সবার। এই স্লোগানকে সামনে রেখে ধর্ম ও রাজনীতির বাইরে একমাত্র সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখকে তারা বরণ করে নিয়েছে। যে রাজনীতি নারীকে তেঁতুল মনে করে যার চোখে ভাস্কর্য হলো মূর্তি এবং যারা এদেশের প্রগতিকে মনে করে সমাজের অধ:পতন তাদের চোখ রাঙ্গানিকে তুচ্ছ করে এবার নারী পুরুষ সবাই নেমে এসেছিল রাস্তায়। শুধু তাই নয় প্রচন্ড দাবদাহকে পাশ কাটিয়ে রাজপথে বা আয়োজনে অনুষ্ঠানে আসা বাংলাদেশের মানুষের এই নাড়ীর স্পন্দন আওয়ামী লীগ ধরতে পারেনি। পারলে পহেলা বৈশাখের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হেফাজতকে খাতির করে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানোর কথা বলতেন না। তাঁর এই ঘোষণা যে কতটা অপমানজনক এবং হতাশার সেটা হয়তো তিনি নিজেই টের পাননি। কারণ রাজনীতি যখন অচল ও অন্ধ হয়ে যায় যখন তার পথ প্রায় রুদ্ধ হবার পথে তখন আসলে দৃষ্টিময়ী দৃষ্টিমান ও চোখে দেখেননা। হয়তো প্রধানমন্ত্রী ও এখন তাই কুয়াশায় আছেন।

সম্প্রতি তিনি ভারত সফর করে ফিরেছেন। তাঁর এই ভারত সফর যে উত্তেজনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মনে হয় তিনি ইসরায়েল সফরে গেলেও তেমনটা হতো না। ভারত একাত্তরের বন্ধু হলেও এখন আর সে জায়গায় নেই দুদেশের সম্পর্ক। ইতোমধ্যে অনেক পানি গড়িয়েছে গঙ্গা পদ্মায়। সে পানি এসে ঠেকেছে তিস্তায়। বলা ভালো একদিকে জল আরেকদিক পানি শূণ্য। সে রাজনীতি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ফেলেছে ঘোর বিপদে। মাঝখানে মমতার নামে দাঁড়িয়ে থাকা মমতাহীন রমনীর খেলায় দুদেশের সম্পর্ক যখন গোলমেলে তখন শেখ হাসিনার সফরের যাবতীয় অর্জন প্রায় শূন্য। সাধারণ মানুষ যা বোঝে তা খুব স্পষ্ট আর মোটা দাগের। তা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতার যে মাজেজা সেটার কুফলভোগী আওয়ামী লীগ। বিএনপি এর উল্টোদিকে। কিনতু এর সমাধান কি হেফাজতকে হাত করায়? না তাদের কথামত দু চারটি ভুল সিদ্বান্ত নিলেই তারা সুড়সুড় করে আওয়ামী নৌকায় ঢুকে পড়বে? অথচ নিজের ভোটব্যাংক আর প্রগতিশীলতার কথা নাভেবে প্রধানমন্ত্রীর এই কৌশল বা পন্থা অবলম্বন আসলে কিসের ইঙ্গিতবাহী?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমাদের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। কে না জানে আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। এই পরিচয়টি শাসন ক্ষমতার চাইতে অনেক বড়। কারণ তিনি আমাদের যে দেশটি দিয়ে গেছেন সেটি ছিল কূপমণ্ডূকের হাতে। পাকিদের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও হীনতার কবল থেকে আমাদের মুক্ত করার নেতা তিনি। তাঁর কন্যা বলে আপনার ওপর প্রগতির যে ভরসা সেটা এবার টাল খেয়েছে মাননীয়া।

এদেশে অন্ধদের রাজনীতি নতুন কিছুনা। জামাতের মতো মৌলবাদী,ক্যাডার ভিত্তিক দলকে সাইজ করেছেন আপনি। মানবতাবিরোধী রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসীতে ঝোলানো আপনি কেন হেফাজতের জালে আটকা পড়বেন? এই হেফাজতের উত্থান কি খুব বেশী দিনের ঘটনা? এদের বাড়বাড়ন্ত হবার কারণ যদি শাপলার ঘটনা হয়তো সেটিও আপনি সামাল দিয়েছেন।কিন্তু তখন থেকে এরা লাই পেতে পেতে এখন মাথায় উঠেছে। শোনা যায় যতবার তারা ক্ষেপে ততবার রেলের জমি, টাকা বা উপঢৌকন দিয়ে বশ করা হয়। এবার তারা পৌঁছে গেছে গণভবনে। গণভবনে তাঁরা যেতেই পারেন। তাঁদের আদর্শ বা নীতি তাঁদের মতো। কিন্তু মুশকিল হলো তাঁরা যখন তাঁদের মনগড়া কাহিনী ও খায়েশের নামে বাংলাদেশকে অন্ধকূপে ফেলতে চায় তখন কি করে সরকার তাতে সায় দেয়?

কোর্ট এর বাইরে থাকা মূর্তিটি আসলে ভাস্কর্য। সেটি আপনি ভালোই বোঝেন। এর সুরত আদল বা মান নিয়ে কথা থাকতেই পারে। কিন্তু হেফাজতের এজেন্ডা ভিন্ন। তাদের উদ্দেশ্য বলার দরকার পড়েনা। তাঁরা যখন গণভবনে গিয়ে এ আশ্বাস পায় যে এটি সরানো হবে এবং তা আপনারও অপছন্দের,নৌকা কিন্তু দুলে ওঠে। কারণ নৌকার মাঝি মাল্লারা এদেশের সাধারণ ও মুক্তমনের মানুষ।আপনি অবগত আছেন এখন দলের চেয়ে আপনার ইমেজ বড় ও কার্যকর। আপনি না বললে বা না চাইলে অনেক দরকারী কাজও হয়না। সেখানে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার জায়গাটা আপনার হাতে বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষমতা থাকলেও ভবিষ্যৎ হাতে থাকবেনা। এটা সবাই জানে এই শক্তি বা অপস্রোত নৌকা ডোবানো ছাড়া কোন কাজে আসবে না।

একটা গল্প মনে করিয়ে দেই মাননীয়া। এক সাপ আর এক ব্যাঙে দারুণ বন্ধুতা। তাই ব্যাঙ চাইতোনা সাপটির কিছু হোক। বারবার তাকে বলতো ভাই আঁকা বাঁকা চলিস না। সোজা চললেই ভালো থাকবি। সাপ হাসতো আর বলতো, আমি বিষধর। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না। তুই বরং সামলে থাক। ব্যাঙ দুদিনের জন্য বেড়াতে গিয়ে ফিরে এসে সাপকে পায়না। খুঁজতে খুঁজতে দেখে সটান সোজা হয়ে শুয়ে আছে। ব্যাঙ মনে মনে ভাবলো বাহ এইতো সুমতি হয়েছে। কাছে গিয়ে কথা বলে নেড়ে চেড়ে দেখে সাপটা মরে সোজা হয়ে গেছে। তখন সে কাঁদতে কাঁদতে বললো, জীবনে সোজা হলিনা মরার পর সোজা হয়ে কি লাভ রে শয়তান?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাপ কখনো সোজা হয় না। আপনি যতই ছাড় দিন ওরা ছোবল মারবেই।যে আপনি আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে গান তাঁকে ওরা কখনো ছেড়ে কথা বলবেনা। আপনি ভুল করলে দেশও জাতির কি হবে সেটা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। আমরা আপনার মুখ চেয়ে আছি। আহমদ ছফার সেই লাইনগুলো মনে করছি। আওয়ামী লীগ জিতলে শুধু আওয়ামী লীগ জিতবে। আর তারা হারলে সমগ্র দেশ ও জাতি হেরে যায়। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিশ্চয়ই এমন ভুল করবেন না। করলে এদেশের ভবিষ্যৎ কবে কখন কিভাবে হারিয়ে যাবে কেউই বলতে পারেনা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত