logo
বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
bijoy
  • হোম
  • মুক্ত মতামত
  • বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয় বাগড়া না দিলেই চলবে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয় বাগড়া না দিলেই চলবে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয় বাগড়া না দিলেই চলবে

ড. মইনুল ইসলাম, ১৯ এপ্রিল, এবিনিউজ : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদ্য-সমাপ্ত ভারত সফর নিয়ে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপি’র অন্যান্য নেতারা সম্প্রতি সমালোচনায় মেতে উঠেছেন। তাঁদের মতে এই সফর ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ হয়েছে। শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটা চুক্তি এবং একগাদা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারতকে একতরফাভাবে শুধু সুবিধা দিয়েই এসেছেন, ভারত থেকে কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে নাকি শেখ হাসিনা ভারতের কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে এসেছেন। বিএনপি’র এহেন সমালোচনা এবং অভিযোগসমূহ পুরোপুরিই প্রত্যাশিত। অবশ্য, এটাও বলা প্রয়োজন যে কট্টর আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাড়া দেশের সাধারণ জনগণ শেখ হাসিনার এবারের সফরকে ‘খুব একটা সফল’ আখ্যায়িত করবেন না। স্বয়ং শেখ হাসিনাও যে সফর নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত তা-ও মনে হয়নি আমার। দেশে ফেরার আগে দিল্লিতে তাঁকে প্রদত্ত এক সংবর্ধনায় তিনি যে ভাষণটি দিয়েছেন তাতে তাঁর আশাহত মনের বেদনা অনেকখানি প্রকাশিত হয়ে গেছে: ‘পানি চাহা ইলেকট্রিসিটি মিলা, কুছ তো মিলা’। আমি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাব তাঁর এই রাষ্ট্রনায়কোচিত কূটনৈতিক সৌজন্য ও হাস্যরসের মাধ্যমে তাঁর সফরটি ভণ্ডুল করার প্রধান ‘নাটের গুরু’ মমতা ব্যানার্জীকে একহাত নেয়ার জন্যে। দেশে ফেরার পর তাঁর সংবাদ সম্মেলনে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করার সময়ও তাঁর গুরুগম্ভীর কণ্ঠ আবারো ঘোষণা করলো, “তিস্তার পানি আসবেই, পানি কেউ আটকাতে পারবে না।” এই চ্যালেঞ্জ যে মমতা ব্যানার্জীকে উদ্দেশ করেই দেওয়া হয়েছে সেটা ‘আক্কেলমন্দ কি লিয়ে ইশারা-ই কাফি’। তিস্তার পানি নিয়ে ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহ এই ইশারাকে ঘিরে আবর্তিত হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

এবারের সফরের প্রটোকল সংক্রান্ত প্রধান অর্জন আমার মতে নরেন্দ্র মোদি এয়ারপোর্টে গিয়ে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্বীকার করে নেয়ার প্রতীকী প্রকাশ। চীন এবং পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক তলানীতে ঠেকে যাওয়াতে ভারত এখন জোরেসোরে চেষ্টা করছে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি ছয়টি দেশ--বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানকে সাথে নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে জোরদার করতে। একইসাথে, বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরে চীনকে সহজ প্রবেশাধিকার দিতে নারাজ বিধায় ভারত বাংলাদেশকে নিজের প্রভাব বলয়ে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করার জন্যে জোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অব্যবহিত পূর্বে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে ভারত বাংলাদেশকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ থেকে বিরত রেখেছে। আবার, বিসিআইএম (Bangladesh-China-India-Myanmar) ইকনমিক করিডোর বা কুনমিং ইনিসিয়েটিভ নামক আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়নের মাঝপথে ভারত পুরো প্রক্রিয়াটিকে হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ঐ ‘কুনমিং ইনিসিয়েটিভ’ চুক্তির অংশ হিসেবেই সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বাংলাদেশের ঘুনধুম ও মিয়ানমারের মংডু সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং নগরী পর্যন্ত রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে উল্লিখিত বিসিআইএম দেশগুলো অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিল। ভারতের কংগ্রেস সরকারের ক্ষমতার মেয়াদে ভারত এই চুক্তি বাস্তবায়নে অত্যন্ত উৎসাহী ছিল, কিন্তু বিজেপি’র নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতাসীন হয়েই চীনের সাথে এই আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতি থেকে ভারতকে সরিয়ে নিয়েছে। চীন ও ভারত এখন আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে প্রবল প্রতিপক্ষের অবস্থানে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ এই দু’দেশের ‘সুপারপাওয়ার গেমের’ টানাপড়েনের প্রত্যক্ষ শিকারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রায় তিন দশক ধরেই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের জন্যে চীনের ওপর নির্ভরশীল ও আস্থাশীল ছিল। উপরন্তু, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং তদ্‌পরবর্তী রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সরবরাহের ওপর ক্রমেই নিজের নির্ভরতা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে গত দু’দশকে। এ-ব্যাপারে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর নীতিতে তেমন কোন ফারাক্‌ দৃশ্যমান হয়নি। অন্যদিকে, গত এক দশক ধরে ভারতপ্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনো তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারকই রয়ে গেছে, অস্ত্র রপ্তানিতে এখনো তারা নেহাতই ‘ক্ষুদ্র বিক্রেতা’ বলা চলে।

কিন্তু, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের এই প্রতিরক্ষা ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্কটি এবার ভারতের কাছে ‘আপত্তিকর’ মনে হয়েছে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটো সাধারণ মানের সাবমেরিন সংগ্রহ করার পর। ভারতকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ বা শত্রুপক্ষ বিবেচনা করে এই দুটো সাবমেরিন ক্রয় করার প্রশ্ন অবান্তর হলেও ভারত পুরো ব্যাপারটায় তার অসম্মতি ও উদ্বেগের বিষয়টি মোটেও গোপন করেনি। এখানে যে বিষয়টি ভারতের বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন ছিল তাহলো, বাংলাদেশের অপর প্রতিবেশী মিয়ানমার এখনো প্রকৃত বিচারে একটি সেনাশাসিত দেশ। ঐ দেশটিতে অং সান সুকি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বলে ধারণা করা হলে সেটা বড় ধরনের ভুল করা হবে। প্রকৃত বিচারে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে ঐ দেশটির মুক্তি এখনো সুদূরপরাহত বললে অত্যুক্তি হবে না। অতীতে বেশ কয়েকবার মিয়ানমারের নৌবাহিনী বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশের জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। এমনকি, কয়েকবছর আগে একটি কোরীয় তেল কোম্পানীকে মিয়ানমারের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল অনুসন্ধান না করে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে মিয়ানমারের যুদ্ধ জাহাজগুলো। ঐ কোম্পানী তাদের এক্সপ্লোরেশন সরঞ্জামাদি সহ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিত্যাগ করে ফিরে আসার পর ঐ এলাকায় মিয়ানমার অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল গ্যাসের রিজার্ভ আবিষ্কার করেছে। ঐ গ্যাস এখন তারা চীনের কাছে বিক্রয় করছে। এই ঘটনার কিছুদিন পর ইটলসের (International Tribunal on Laws of the Sea) সমুদ্রসীমা বাঁটোয়ারার রায়ে ঐ এলাকার বৃহদংশের ওপর এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা স্বীকৃত হয়েছে। মিয়ানমার যদিও ঐ সমুদ্রসীমা-নির্ধারণ আপাততঃ মেনে নিয়েছে তবুও যখন তাদের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের অনুসন্ধান ব্লকে আবারো বাংলাদেশের পক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে তখন মিয়ানমার যে আবার সামরিক শক্তি প্রদর্শন করবে না তার কী গ্যারান্টি? (বলা হচ্ছে, ঐ ব্লকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।) অতএব, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে অতি দ্রুত একটি শক্তিধর ত্রি-মাত্রিক আঞ্চলিক নৌশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা ছাড়া বাংলাদেশের কোনই বিকল্প নেই। সামরিক জান্তাশাসিত মিয়ানমারের অন্যায় জবরদস্তিকে মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করতেই হবে বাংলাদেশকে। এ-ব্যাপারে অতীতের মত আবারো পিছিয়ে গেলে সেটা কি ষোল কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের জন্যে চরম অসম্মানজনক হবে না? অতএব, বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়কে ভারত অহেতুক সন্দেহের চোখে দেখছে বলেই আমার দৃঢ় অভিমত। আমার মতে, এক লক্ষ আঠারো হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর অর্থনৈতিক মালিকানা অর্জন করার সুবাদে বাংলাদেশ এখন যে বিশাল ‘blue economyএর হক্‌দার হয়ে গেছে তার সাথে সাজুয্যপূর্ণ নৌবাহিনী গড়ে তোলা এখন বাংলাদেশের জন্যে ফরজ্‌ হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে এবারও যে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি হবে না সেটা তো সফরের প্রস্তুতিপর্বেই বোঝা গিয়েছিল। এতদ্‌সত্ত্বেও সফরের সময় মমতা ব্যানার্জীকে দাওয়াত দিয়ে দিল্লী নিয়ে যাওয়ায় অহেতুক ‘অতি-প্রত্যাশার’ জন্ম দেওয়া হয়েছিল বলে আমার ধারণা। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর আগ্রহে নাকি ঐ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল! কিন্তু, মমতা ব্যানার্জীর গোঁয়ার্তুমির সাথে যারা পরিচিত তারা ঐ পদক্ষেপ যে ব্যর্থ হবে সেটা আগেভাগেই বলে দিয়েছিলেন। তবুও মনে হচ্ছে, এবারের অসম্মতি ‘মমতা দিদির’ জন্যেই রাজনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনবে অনেক বেশি। সফর-পরবর্তী ভারতীয় মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতকে অনেক বেশি সুবিধা দিয়ে বিনিময়ে তেমন কিছুই যে পেলেন না সেটা পুরো ভারতকেই ‘অকৃতজ্ঞ বড়ভ্রাতা’র আসনে বসিয়ে দিয়েছে বলে প্রবল জনমত সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নির্বাচনে যাতে ভারতের এই ‘একতরফা লাভ’ পাওয়াটা শেখ হাসিনার নির্বাচনী বিপর্যয় না ঘটায় সেজন্যে আগামী দেড় বছরের মধ্যে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর জন্যে ফরজ হয়ে গেছে। অতএব, বিএনপি আগামী নির্বাচনে ভারত-বিরোধিতার কার্ডকে ‘তুরুপের তাস’ বানাতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। বরং, এবারের শেখ হাসিনার সফর-পরবর্তী বিএনপি’র বেলাগাম ভারত-বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা ঐ দলের জন্যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘বুমেরাং’ হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

এ-পর্যায়ে পাঠকদেরকে আশ্বস্ত করতে চাই যে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনভাবেই আর ভারতের কৃপা কিংবা দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর খয়রাত-নির্ভর লজ্জার অবস্থানে নেই। এদেশটি এখন খাদ্যশস্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। দেশের আমদানী বিল রপ্তানী আয়ের চাইতে এখনো বেশি থাকায় যেটুকু বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে তা দ্রুতই কমে যাচ্ছে। ঐ বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর জন্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স এখনো যথেষ্ট প্রমাণিত হয়ে চলেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির বার্ষিক প্রবাহ সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মত, অথচ বাংলাদেশ থেকে ভারতে বছরে রপ্তানি হয় মাত্র ৬৮ কোটি ডলারের পণ্য। উল্টোদিকে, বাংলাদেশে যেসব ভারতীয় অভিবাসী কর্মরত রয়েছে তারা প্রতি বছর আরো প্রায় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতে পাঠাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ, ভারত থেকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্সই আসে না। এমনকি, বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগকেও এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য বলা যাবে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে সাম্প্রতিক কালে ভারত যে ‘লাইন অব ক্রেডিট’ প্রদান করেছে সেগুলোকে কোন বিচারেই খুব আকর্ষণীয় ‘সফ্‌ট লোন’ বলা যাচ্ছে না। এই ঋণগুলো এতই শর্ত-কন্টকিত যে এগুলোকে আর দশটা ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের’ চাইতে বেশি সুবিধাজনক আখ্যায়িত করার কোন যুক্তি নেই। এবারও যেসব ঋণ প্রদানের অঙ্গীকার পাওয়া গেছে সেগুলোও একই ধাঁচের। (বরং, এসব ঋণের আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ‘কানেকটিভিটি’ বাড়ানো এবং সুগম করা। এখানে কোন দয়া-দাক্ষিণ্যের ছিঁটেফোটাও নেই।) মজার ব্যাপার হলো, একসময় বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসী কিংবা শরণার্থীর যে বিপুল প্রবাহের অভিযোগ তুলে ভারত শোরগোল বাধিয়ে দিত এখন ঐ শরণার্থী স্রোতের অস্তিত্ব্ব আর তেমন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোদ বিজেপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে ভারত থেকে মুসলিম বাংলাদেশীদেরকে খেদানোর যে রণহুঙ্কার প্রদত্ত হয়েছিল তারা সেটার আর প্রয়োজন বোধ করছে না বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পালে বাতাস লাগার পর। (আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার অবস্থান থেকে এখনো অবশ্য সরে যায়নি বিজেপি! ওখানে এখনো ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়।) ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু চোরাচালান নিয়ে বিজেপি’র হৈ চৈ এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায়, তবে ভারতীয় গরুর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা যে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে সেটাও এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। (ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশী মুসলিমদেরকে গরুর গোশত্‌ খাওয়ার অভ্যাস ভুলিয়ে ছাড়বেন বলে যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন সেটা বোধ হয় তাঁর জীবদ্দশায় ঘটবে না!) উপরে যে কয়েকটি সাদামাটা অর্থনৈতিক প্রবণতার উল্লেখ করা হলো তার সার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কোনভাবেই আর ভারতের কাছ থেকে কত বেশি দয়া-দাক্ষিণ্য পাওয়া গেলো বা গেলো না তার ওপর নির্ভর করে না। বরং, এবারের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব আরো মজবুত করার ক্ষেত্রে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এটাও স্বীকার করতে হবে যে সফরের প্রস্তুতি পর্বে প্রতিরক্ষা চুক্তির আশংকার কথা বলে যে ঝড় তোলা হয়েছিল ওটার পরিবর্তে যে প্রতিরক্ষা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সেটাতে গোপন কোন ধারা আছে কিনা জানি না, কিন্তু যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে তাতে ভারতকে একতরফা দাসখত দেওয়ার কোন আলামত খুঁজে পাইনি।

বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমার বিবেচনায় যেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো ভারত চাইলে বাংলাদেশকে পদে পদে বিপদে ফেলতে পারে, বাংলাদেশের জনগণের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করতে পারে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে নানান্‌ ব্ল্যাকমেইলিং-এর মাধ্যমে। ফারাক্কা ব্যারেজ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিস্তা নদীর পানি পুরোপুরি অন্যায়ভাবে ভারত একতরফাভাবে ভোগ করছে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসেবে ন্যায্য হিস্যা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মনে করছেন বাংলাদেশকে পানি দেওয়া না দেওয়া তাঁর অধিকার। এ-ধরনের আন্তর্জাতিক আইন-বিরোধী গোঁয়ার্তূমি তাঁর ভোটের রাজনীতির জন্যে খুবই সুবিধাজনক হলেও এটা অভব্য ও অমানবিক আচরণের শামিল, সেটা তিনি এখনো বুঝতে চাইছেন না। মোট ৫৪টি নদীর পানির হিস্যা নিয়ে ভারত বাংলাদেশের ওপর ‘দাদাগিরি’ প্রদর্শনের ক্ষমতা রাখে, এটা মনে রাখা সমীচীন মনে করি। তাই, ভারতকে শত্রু বানিয়ে বিএনপি দেশের কী ফায়দা অর্জন করতে চায় আমি বুঝি না। সমমর্যাদার ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ যদি ভারতকে ‘বাগড়া’ দেওয়ার অবস্থান থেকে দূরে রাখতে পারে সেটাকে মোটেও অকিঞ্চিৎকর মনে করি না। ১৮ এপ্রিল ২০১৭

লেখক : ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত