logo
শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭
 

বর্ষবরণ উদযাপনে কমেছে পান্তা-ইলিশের কদর

বর্ষবরণ উদযাপনে কমেছে পান্তা-ইলিশের কদর

ঢাকা, ১৪ এপ্রিল, এবিনিউজ : পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের আদি উৎসব। হাজারো ছন্দ-কবিতা ও প্রাণের উচ্ছ্বাসে বছর ঘুরে আসে পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছর এ দিনকে ঘিরে জাতি আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। সঙ্গে থাকে বিভিন্ন প্রকার খাবারের ব্যবস্থা। সেসব আয়োজনের মধ্যে একটি সাধারণ উপাদান হল পান্তা-ইলিশ। মাছে-ভাতে বাঙালির ইলিশ-প্রীতি হালের কোন বিষয় নয়; দেশের জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম একটি সম্পদ। শুধু সম্পদই নয়; ইলিশ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ধারক-বাহকও বটে। তাই নববর্ষে ইলিশ খাওয়ার ঝোঁকটা কেউ এড়াতে পারে না। পান্তা-ইলিশ ছাড়া বৈশাখ যেন জমেই না। শহুরে মধ্যবিত্তদের কাছে পান্তা-ইলিশ এখন অনেকটা শখের ব্যাপার।

যতদূর জানা যায়, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে পান্তা ইলিশের প্রচলন শুরু হয় ১৯৮৩ সাল থেকে রমনার বটমূলে এবং এর উদ্যোক্তা ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক বোরহান আহমেদ। গত প্রায় তিন দশক ধরে এই উৎসবের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ যেন একাকার হয়ে আছে। শহুরে মানুষেরা ঘটা করেই পান্তা ইলিশের আয়োজন করেন। পাড়া মহল্লায় যেখানেই বৈশাখের উৎসব,সেখানেই থাকে পান্তা ইলিশের আয়োজন। তবে রাজধানীতে বৈশাখের আয়োজনগুলো এবারই ছিল ব্যতিক্রম।রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নববর্ষ উদযাপনে পান্তার আয়োজন থাকলেও তাতে মানুষের আগ্রহ ছিল কম।তাই এবার লোকসানের মুখোমুখি হতে হবে বলে জানিয়েছেন পান্তা-ইলিশের আয়োজক বিক্রেতারা ।

তবে শখের হোক অথবা সংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত কারণেই হোক; এর মাধ্যমে অন্যতম এ জাতীয় সম্পদকে রক্ষার চেয়ে বরং ধংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বেশি। তাই গত কয়েক বছর ধরে দেশের উচ্চ পর্যায় থেকে পান্তা-ইলিশ দিয়ে বৈশাখ উদযাপন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবছর পান্তা-ইলিশ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে দেশবাসীকে তা বন্ধের আহ্বান জানান।

এরপর থেকেই মূলত ইলিশ দিয়ে বৈশাখ উদযাপন প্রত্যক্ষভাবে ফিকে হয়েছে। তাই জাতীয় এ ঐতিহ্য ও সম্পদকে টিকিয়ে রখতে সোচ্চার হয়েছেন দেশের সচেতন মহল। এ বিষয়ে কথা হয় সংস্কৃতিক কর্মী ও আবৃত্তি একাডেমীর সমন্বয়ক মনজুর হোসাইনের সঙ্গে। তিনি অর্থসূচককে বলেন, আমরা প্রতিবছরই পান্তা-ইলিশের আয়োজন করে থাকি। কিন্তু এ বছর আমরা পান্তা-ইলিশ থেকে বিরত রয়েছি। এ বছর ঐতিহ্যগতভাবে মিষ্টি, নারকেল নাড়ুসহ বিভিন্ন পিঠার আয়োজন করেছি।

তিনি বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের। যেহেতু নববর্ষের প্রারম্ভে ইলিশের প্রচলন ছিল না; সেহেতু কেন আমরা এটাকে বৈশাখের সাথে সংযুক্ত করছি।

তার সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অপর একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, বিশ্ব কলা কেন্দ্রের সদস্য ইলিয়াম মাহমুদ নিরব বলেন, পান্তা-ইলিশ দিয়ে বৈশাখ উদযাপন মানে বাঙ্গালীয়ানাকে ধারণ করা নয়; বরং প্রকারান্তে অপমান করা। বাংলা নববর্ষের ইতিহাস জেনে সঠিকভাবে তা উদযাপন করা দরকার। তাছাড়া পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কিংবা ঐতিহ্য খুঁজে কোথাও ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। আর বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। তখনকার সময় প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। বর্তমানে ১লা বৈশাখে ইলিশকে ঘিরে যে নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটি তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে সাধারণ মানুষদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে যতটা সময়ের প্রয়োজন; তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদেরকে সচেতন করে তুলতে। কারণ তাদের অধিকাংশই জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের কথা না ভেবে ভাবছেন তাদের ব্যবসার কথা। এসব বষিয়ে কথা হয়েছিল রাজধানীর পল্টনের ক্যাফে ঝিল রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আব্দুল ওয়াদুদ সেন্টুর সঙ্গে।
বর্ষবরণ উদযাপনে কমেছে পান্তা-ইলিশের কদর
তিনি বলেন, আগের মতো আয়োজন এখন করা হয় না। কারণ সবাই এখন ইলিশ বিমুখ। এখন থেকে পাঁচ বছর আগেও প্রচুর ব্যবসা হয়েছে। তখন দিনে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পান্তা-ইলিশ বিক্রি হতো। আর এখন ব্যবসা এতই খারাপ যে, মাত্র ৩০ পিস ইলিশ রান্না করেছি। চিন্তায় রয়েছি এগুলোও বিক্রি হবে কি না।

ব্যবসায়ীরা রয়েছে তাদের ব্যবসার চিন্তায়; এদিকে কর্তৃপক্ষ রয়েছে জাতীয় সম্পদ রক্ষার চিন্তায়। ইলিশ রক্ষার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গবেষণা প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা জানান, এখন ইলিশ মাছ ধরার মৌসুম নয়।

এবারের পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পান্তা-ইলিশের কয়েকটি স্টল দেখা গেলেও তাতে ছিল না দর্শনার্থীদের ভিড়। এখানকার একটি স্টলের মালিক আফজাল হোসেন বলেন, ‘এবার মানুষের পান্তা-ইলিশের প্রতি কোনও আগ্রহ নেই। সকাল থেকে ১০ থেকে ১৫ প্লেট বিক্রি হয়েছে। সব ভাত, ইলিশ, ভর্তা রয়ে গেছে। অনেক লোকসান হবে।’

তিনি বলেন, এক থালা পান্তা ভাত, একটুকরো ইলিশ মাছ ভাজা, আলু ও শুকটি ভর্তা এবং চাটনি তারা প্যাকেজ হিসাবে ২৫০ টাকা দরে সকাল থেকে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউ খাচ্ছে না।এরপর দর ৫০ টাকা কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়, তারপরও কেউ খায় না। আরও ১০০ টাকা কমিয়ে শুধু ১০০ টাকায় বিক্রি করার চেষ্টা করেও কোনও ক্রেতা টানতে পারছেন না।

বংশাল থেকে মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রেবেকা ও সালাম দম্পতি বলেন, ‘চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে ভোরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসেন তারা। কিন্তু পান্তা-ইলিশ খাননি। কারণ, বাসা থেকে তারা নিয়মিত খাবার খেয়ে এসেছেন। বাইরে তারা পান্তা-ইলিশ খাবেন না।’

বিএন/জনি/জসিম/জেডি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত