logo
রবিবার, ২০ আগস্ট ২০১৭
 

‘অস্তিত্ব সংকটে পড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে জঙ্গিরা’

‘অস্তিত্ব সংকটে পড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে জঙ্গিরা’

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ, ১০ এপ্রিল, এবিনিউজ : বাংলাদেশের জঙ্গিরা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। আর তাই তারা অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠে নতুন নতুন হামলা করছে। রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অব. মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ। পুরো বক্তব্যটি উপস্থাপন করা হলো।

জনাব অব. মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা কমে গেছে বলে কিছু দিন আগেও ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবারও জঙ্গি-কর্মকাণ্ড এবং তা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবারও এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ কী?

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আবারও জঙ্গি-কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়া নিয়ে  আমরা যেটা মনে করছি সেটা হচ্ছে- ঢাকার হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর তাদের যে দক্ষতা ও সামর্থ্য ছিল সেটা দেশের  নিরাপত্তা বাহিনী কমিয়ে এনেছে। ফলে হলি আর্টিজান হামলার পর তারা স্বাভাবিকভাবেই গুটিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবার ভেতরে ভেতরে তারা সংগঠিত হয়েছে। আবার তারা হামলা করার জন্য বাইরে বের হয়ে এসেছে। যে কারণে জঙ্গি কর্মকাণ্ড বেড়েছে।

এবার যেসব জঙ্গি হামলা হচ্ছে আর গতবার যেসব হামলা হয়েছিল তারমধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি হচ্ছে যে, এর আগে তারা ধরা পড়ত না; এখন তারা ধরা পড়ছে। এর আগে তাদের আস্তানা খুঁজে পেতে কষ্ট হতো এখন সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এখন পুলিশের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে এবং জঙ্গি সক্ষমতা অনেক কমেছে।
 

আপনি যদি সুনির্দিষ্ট করে কারণগুলো কী তা উল্লেখ করেন..

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ: আমি মনে করি বাংলাদেশে এখন যে সংগঠনটি সমস্যা সৃষ্টি করছে তারা নব্য জেএমবি নামে পরিচিত। এরাই সবচেয়ে বেশি উৎপাত করছে। তাদের হামলার যে ধরন সেটি বেশ অপরিকল্পিত হামলা। দেখেছি অদক্ষ জঙ্গিরা বোমা নিয়ে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। শুধু আমরা আস্তানাগুলোতে দেখতে পাই কিছু প্রশিক্ষিত জঙ্গি। যারা সহজে ধরা পড়ছে না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় দেখা যাচ্ছে হয় তারা নিজেরা আত্মহত্যা করছে অথবা পুলিশের গুলিতে মারা পড়ছে।

হঠাৎ করে আবার হামলার প্রবণতা থেকে আমরা যেটা বুঝতে পারি সেটা হচ্ছে-তাদের ভেতরে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। তারা এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। কারণ হলি আর্টিজনের পর জনসমাজে জঙ্গিবিরোধী যে প্রচারণা হয়েছে তাতে করে এদের প্রতি মানুষের একটা বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে তারা নতুন করে সদস্য সংগ্রহ করতে পারছে না। তাছাড়া আগে তাদের যেসব সদস্য ছিল তাদেরও অনেকে পিছুটান দেয়ার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে তারা একটা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। আর সেই অস্তিত্বরক্ষার জন্য তারা বড় ধরনের হামলা করে সক্ষমতার পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা ভাবছে বড় ধরনের হামলা করতে পারলে হয়তো তারা আবার জীবন ফিরে পাবে। আর সেই সাথে যোগ হয়েছে সিরিয়া ও ইরাকে আইএসআইএলের সংকোচন। সেই সংকোচনের ফলে তাদের যে একটি আইকন ছিল খেলাফত; সেটিও এখন উৎখাতের পথে। সব মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে এখন আমরা একটা বেপরোয়াভাব দেখছি।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বারবারই বলছেন, জঙ্গিবাদ দমনে রাজনৈতিক ঐক্য দরকার। আপনার কি মনে করেন?

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ: অবশ্যই, রাজনৈতিক ঐক্য থাকলে তো ভালো হয়। কিন্তু আমি মনে করিনা বাংলাদেশে এরকম রাজনৈতিক ঐক্যের জন্ম হবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির দুটো মুখ আছে। একটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাভিত্তিক রাজনীতি। আরেকটি হচ্ছে ইসলামিক রাজনীতি। তো এদুটো তো কখনই মেশে না। সেক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক চেতনা কিভাবে একসাথে হয়ে একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠবে। তবে আমি বলছি এ বিষয়ে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে একটা ঐক্য গড়ে উঠবে! কারণ জনগণ এই জঙ্গিবাদকে পছন্দ করে না। তখন রাজনীতির কোনো একটি পক্ষকে তাদের রাজনৈতিক চেতনা থেকে সরে আসতে হবে। আমার মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে সেটি সম্ভব।

বাংলাদেশের বিএনপিসহ কোনো কোনো বিরোধীদল দাবি করছে, সরকার জঙ্গি দমনে আন্তরিক নয়। বিএনপির মহাসচিব অভিযোগ করেছেন, দেশে জঙ্গিবাদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগের কি কোনো ভিত্তি রয়েছে?

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ:
না, এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করছি না। কারণ জঙ্গি দমন বা নিয়ন্ত্রণের যে মিশন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দেয়া হয়েছে- তা পালন করতে গিয়ে তারা তাদের জীবন দিচ্ছে। যদি সরকার আন্তরিক না হতো এবং নিরাপত্তা বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ না করত তাহলে কি এমনটি হতে পারত। আমরা জঙ্গি দমনের অভিযানে অনেকগুলো পুলিশ কর্মকর্তাকে মরতে দেখলাম। আর সেজন্যেই আমি মনে করি বিএনপি মহাসচিব বা কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ভিত্তিহীন।

ইসলাম ধর্মের নানা বিধানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যার মাধ্যমে নানা বয়সের মানুষদেরকে জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কি কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ:
দেখুন, আমি এ বিষয়ে কতগুলো উদ্যোগ দেখেছি। তবে সরকারি উদ্যোগের মাত্রা খুব বেশি দেখিনি। বেসরকারি উদ্যোগের মাত্রাটা অনেক বেশি।

হলি আর্টিজনে জঙ্গি হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অনেকগুলো সমাবেশ ও মানববন্ধন আমি দেখেছি। এ বিষয়ে স্কুলে স্কুলে আলোচনা সভা দেখেছি। জঙ্গিবিরোধী মনোভাব তৈরি করার জন্য মিটিং-মিছিল দেখেছি।

আর সরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ দেখেছি। যেমন সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামি ফাউন্ডেশন-তারা দেশের মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জঙ্গিবাদবিরোধী প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করছেন।  যারা জ্ঞানের স্বল্পতা থেকে বিপথগামী হচ্ছে তাদের ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানকে যদি আরো উন্নত করা যায় তাহলে তাহলে খণ্ডিত বা বিকৃত ব্যাখ্যাকে সাধারণ মানুষ বুঝতে সক্ষম হবেন। সে কাজটি করা হচ্ছে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাধ্যমে।

এছাড়া আমাদের দেশের এক লক্ষ ইমাম একটি ফতোয়া দিয়েছে জঙ্গিবাদ এবং সহিংস জেহাদের বিরুদ্ধে। তারা তাদের ফতোয়ায় বলেছে জঙ্গিবাদ বা সহিংসতা ইসলাম নয়। এ বিষয়টিকেও আমি বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছি। আমি মনে করি এগুলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনা তৈরি করেছে।
এছাড়া আমাদের টিভি, মিডিয়ার ভূমিকা এবং দৈনিক পত্রিকাগুলো যেসব লেখালেখি করছে তাতে জঙ্গিবাদ সম্পর্কে মানুষ জানতে পারছে। আর যতই জঙ্গিবাদের বিভীষিকা সম্পর্কে মানুষ জানতে পারবে ততই মানুষ সচেতন হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক ছাত্র পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়ে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর কারণ কি?

মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ:
এখানে বেশ কিছু কারণ আছে। যেমন আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি-এখানে পরিকল্পিতভাবে ধর্মান্ধতাকে একটি স্কিম হিসেবে সমাজে বসিয়ে দেয়া হয়েছে-যা সমাজের ভেতরে কাজ করে।

একইভাবে বিদেশেও দেখা যাচ্ছে হিংসার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে তারা একটা রেডিকালাইজেশন টিম তৈরি করেছে। সেটি তারা খুব সুপরিকল্পিতভাবে করছে। সেইসব জায়গায় বসবাসকারী আমাদের জনগণ তাদের সংস্পর্শে গেলে ধর্মান্ধতার বিষয়টি একটি কেন্দ্রীকতা রুপলাভ করছে। আর এটির ব্যাপারে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।
আমরা দেখেছি বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো ছেলেরা বিদেশে পড়তে গেছে এবং পরে দেখলাম তারা জঙ্গি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নব্য জেএমবির মধ্যে আমরা দেখেছি কানাডা থেকে এসে কেউ কেউ নেতৃত্ব দিয়েছে। এগুলো একটি বিশ্বায়িত সমস্যার সৃষ্টি করেছে।


আমাদের এখানে যখন আমরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি তখন দেখছি অনেক দেশ আমাদের সমর্থন দিচ্ছে কিন্তু সেইসব দেশ তাদের দেশে ধর্মান্ধতা বন্ধ করতে তেমন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে মনে হয় না। নিলে হয়তো সামান্য কিছু নিতে পারেন তবে তা তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না। জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ার সেটিই মূল কারণ।
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত