logo
মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই ২০১৭
 

প্রজাপতির জন্য মিষ্টি এনেছি : শুনে অবাক লাগছে?

প্রজাপতির জন্য মিষ্টি এনেছি : শুনে অবাক লাগছে?
ফজলুল হক, ১৩ ফেব্রুয়ারি, এবিনিউজ : সংগীত ব্যক্তিত্ব মোস্তফা জামান আব্বাসী একটি পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় কলামে লিখেছেন, “বই মেলায় গিয়ে যদি দেখি ছেলেমেয়েরা খিচুড়ী ভাষা ব্যবহার করছে, তাহলে মন খারাপ হবে। সেই খিচুড়ীর সাথে যোগ হয়েছে ইংরেজী। অর্থাৎ বাক্যের অর্ধেক ইংরেজী, অর্ধেক বাংলা, এটা কি ভালো হবে?” (৩০/০১/২০১৭)।
আমি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তাম। আমাদের সাথে অবাঙালির ছেলেমেয়েরাও পড়ত। তখন দেখতাম ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ইংরেজীতে কথা বলছে, তখন আমারো ইংরেজী শুনতে ভাল লাগত। আমার বাবা ঘরে একটি ইংরেজী পত্রিকা রাখতেন। আমাকে সে পত্রিকা পড়তে বাধ্য করতেন। হয়ত ভাষার প্রয়োগে ইংরেজীতে কথা বলতে হতো। বাংলা, উর্দু, বালুচ, পশ্‌তু-পাকিস্তানে বিভিন্ন ভাষাভাষী লোক ছিল। কিন্তু যখন অন্তরঙ্গভাবে নজরুলকে বুঝতে চাইতাম, রবি ঠাকুরকে পেতে চাইতাম, জীবনানন্দ. জসিমউদ্দিন, সুকান্তকে বুঝতে চাইতাম,তখন মায়ের ভাষা বাংলা ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর ছিলনা। সেই গান, সেই কবিতা, আমরা বুঝতাম-যার কোন অনুবাদ হয়না। যখন প্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে নজরুল, রবীন্দ্রনাথের গান শুনি, তখন শিল্পীর কণ্ঠে প্রেম বুঝতে পারি। শিল্পীর মনের ভালবাসা বুঝতে পারি। এভাবে ইংরেজী বা উর্দু থেকে বাংলায় চলে যাই। কবির কবিতা, শিল্পীর গান-তার অনুবাদ হতে পারে, কিন্তু তাদের প্রেমের কোন অনুবাদ হয়না। তামিল ভাষী, তেলেগুভাষী শিশুর কান্না বা হাসি, আর বাংলাভাষী শিশুর কান্না হাসিণ্ডএক। তার অনুবাদের প্রয়োজন পড়েনা।
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারী এটা। এই মাসে আমরা বাংলাভাষা নিয়ে কথাবার্তা বলি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে শব্দ এবং বানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কলেজে আমাদের বাংলা পড়াতেন এমন তিন স্যারের কথা খুব মনে পড়ে। চিত্ত প্রসাদ তালুকদার, আবু তাহের এবং নিজাম উদ্দিন স্যার। খুবই শুদ্ধ উচ্চারণে পড়াতেন। আমাদের অন্য সব বিষয় পড়োনো হতো ইংরেজীতে। বাংলার ক্লাসে মনে হতো মা ও মাতৃভূমির গন্ধ পাচ্ছি। ফুলের গন্ধ, পিঠা পুলির মৌ মৌ গন্ধ, খেজুরের রসের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বেলী ফুল জড়ানো খোপার গন্ধ-মানুষ ভুলতে পারেনা। চিত্ত স্যার-রবীন্দ্রনাথ পড়াতেন। হৈমন্তি পড়ানোর সময়ণ্ডকে চিত্ত প্রসাদ তালুকদার আরণ্ডকে হৈমন্তির বাবা, আমরা ক্লাসে বসে কবি গুরুর গল্পে এমন আত্ন নিমগ্ন হতাম যে- সে পার্থক্য নির্ণয় করতে ভুলে যেতাম। আমি শিক্ষকতার চাকরীতে ঢোকার পর চিত্ত স্যারকে পাই সহকর্মী হিসেবে। ঈশ্বরের পরেই আমার কাছে আমার শিক্ষকের স্থান। চিত্ত স্যারের কাছে বাংলা না শিখলে তো আমি আজ লেখকই হতে পারতামনা। স্যারের সাথে রিকসায় করে যাওয়ার সময় স্যার ঘন ঘন রিকসা থামাতেন। দোকানের সাইন বোর্ডে ভুল বানান দেখে মনে কষ্ট পেতেন। দুঃখ করে স্যার বলতেন, মানুষ কেন মায়ের ভাষাকে গুরুত্ব দেয়না? হায়দ্রাবাদের বানজারা হিল্‌স্‌ এলাকায় কিছু দিন আমাকে যাওয়া আসা করতে হয়েছিল। থাকতাম সেকান্দ্রাবাদে। আমার স্ত্রী সারাদিন বাইরে বাগানে অপেক্ষা করত। লাউঞ্জে গিয়ে ওপ্‌মা ইডলি খেত। আমি ভেতরে কাজে থাকতাম। সন্ধ্যের সময় বের হয়ে এসে দেখতাম, আমার স্ত্রী সপ্রতিভ এবং হাস্যোজ্জ্বল। ব্যাপার কি? বলত, এখানে তিনজন “শুদ্ধবাংলা” সঙ্গিনী পেয়েছি। তাদের সাথে কথা বলে আরাম। কোলকাতার তিন মেয়ে শুদ্ধবাংলায় দিনভর কথা বলে, আমার স্ত্রীকে আনন্দ দিয়েছে। তেলেগুভাষীদের মাঝে কয়েকজন বসে মিষ্টি মিষ্টি মৌ ছড়ানো শুদ্ধ বাংলায় গল্প করছে, বেশ মজার ব্যাপার বটে।
আমার সাথে ছোট বাচ্চাদের বেশ ভাল সম্পর্ক আছে। এখন আমি যে প্রতিষ্ঠান চালাই তাতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল শাখায় পড়ানো হয়। স্কুলে দুই হাজারের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রী আছে। স্কুলের পাঠদান সৃজনশীল পদ্ধতিতে হয়। স্কুল দেখতে গেলে চিত্ত স্যারের কথা মনে পড়ে। ২০০৭ সালে আমি গরীব বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল করেছিলাম। শ দুয়েক থেকে আড়াইশ গরীব বাচ্চা পড়াতাম। আমি নিজে বাচ্চাদের দেখা শোনা করতাম। আমি ডেপুটেশনে সিটি কর্পোরশনে চাকরি করেছি। সে সময়ে বেশ কিছু স্কুলকে আপগ্রেড করা হয়েছে। সে সব স্কুলে বাচ্চারা পড়ত। আমি তখন অনুভব করেছি, বাচ্চাদের শুদ্ধ উচ্চারণ ও শুদ্ধ বানান শেখানো যায়। আপনি বাস কিংবা বেবী টেক্সির মতো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গন পরিবহনের পেছনে লেখা পড়লে মাঝে মাঝে আঁতকে উঠবেনঃ- “বাঘদাদ ফরিবহন।” “মায়ের ধোয়া।” “ম্যারোনা আমায়-আমি ছোট।” এই হচ্ছে বাংলা ভাষা।
আমরা যখন বাচ্চাদের সৃজনশীল পড়াই, এই প্রশ্ন কাঠামোতে বানান কি উপেক্ষিত হচ্ছে? সৃজনশীল প্রশ্ন কাঠামোয় প্রথম প্রশ্নটিকে বলা হয়, ‘জ্ঞানমূলক”। এর জন্য আছে ১ নম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর লিখেছেন, প্রশ্ন যদি হয়, “বলাই” ছোট গল্পের লেখক কে? এই প্রশ্নের উত্তর হবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কোন পরীক্ষার্থী যদি “রবিন্দ্রনাত টাকুর” লেখে? অথবা কোন পরীক্ষার্থী যদি লিখে “ড়বিন্দ্রনাত”ণ্ড তাহলে তাকে কত নম্বর দেবেন? এক নম্বরে এক দিতে হবে। পুরো নম্বর সে পাবে। দৈনিক প্রথম আলো, উপসম্পাদকীয় (২২/০১/২০১৭)। এক্ষেত্রে আধা নম্বর ও কাটা যাবেনা। কারণ যারা সৃজনশীল নিয়ে কাজ করেন, তারা বলেছেন, পরীক্ষার্থীর প্রশ্ন সম্পর্কে “জ্ঞান” আছে। পরীক্ষার্থী জানে লেখক কে। তাই সে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। ইংরেজ পন্ডিতরা তো ঠাকুরকে “টেগোর” বলে। ঢাকাকে “ঢক্কা” বলে, কাজ তো চলেছে। কিন্তু এখন শুদ্ধ পথে এগুতে চাই, আমরা গতানুগতিক পথে এগুবোনা।
আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা অনেক ক্ষেত্রে অসাধারন সৃজনশীলতা দেখায়। শিক্ষক এবং মা বাবার চোখ এড়িয়ে যায় অনেক সৃজনশীল স্টোরীর ক্ষেত্রে। আম একটি সুমিষ্ট ফল। অত্যন্ত পুষ্টিকর। ভিটামিনে ভর্তি। খেলে শরীর ভাল থাকে। ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ। পৃথিবীর কোন আম্রকাননে কোন্‌ দেশের স্বাধীনতা সূর্য্য অস্তমিত হয়েছিল? আমরা ছাত্র জীবনে এমন ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি। আমি শিক্ষকদের বলি, আপনারা যুগের পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করুন। বাচ্চাদের চাপ দিবেননা। যখন শুনি ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাকে শিক্ষিকা মেরেছেনণ্ডমন খারাপ হয়।
আপনি বাচ্চাদের সৃজনশীল প্রশ্নের “অনুধাবন” ও “প্রয়োগ” পর্যায় দেখুন, এটি কিন্তু কাঠামোবদ্ধ। আমরা পত্রিকায় লিখি। আমাদেরকে “ওয়ার্ড ইকনমি” নামক নিয়ম অনুসরন করতে হয়। পত্রিকায় যারা ফিচার দেখেন তারা অনেক শক্তিশালী। লেখা ছাপার ব্যাপারে তারাই ক্ষমতাধর। যাকে ইচ্ছা তারা লেখক বানাতে পারেন। সে রকম একজন ফিচার এডিটর ছিলেন, রুশ ভাষায় বলতেন, লেখা দীর্ঘ কেন? এক অনুষ্ঠানে এই ফিচার এডিটর এত দীর্ঘ বক্তব্য দেন যে, সেদিন আমার মনে হয়েছিল উনি ওয়ার্ড ইকনমির কথা ভুলে গেছেন। এখন আমি কোন আলোচনা সভায় যাইনা। সবাই লম্বা বক্তব্য দেন।
কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতিতে “অনুধাবনে” নির্দিষ্ট বাক্যের বেশী নিষিদ্ধ। এটা হচ্ছে ওয়ার্ড বা বাক্য ইকনমি। “উচ্চতর প্রয়োগ দক্ষতা”-এটিও নির্ধারিত। এখন অনুচ্ছেদে তো বটেই, রচনা বা প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে শব্দ উল্লেখ করে আয়তন বেঁধে দেয়া হয়। তাকে ২০০ শব্দের মধ্যে রচনা লিখতে হবে। গল্প পাঠাতে হবে- আড়াইশ শব্দের বাইরে না গিয়ে। আসলে প্রকাশই সাহিত্য। নানাজন নানা ভাবে লিখবে। এভাবে মানুষ তার স্বকীয়তা দেখাতে পারে। আমি কার সৃজনশীলতা মাপব। আমি কি নিজে সৃজনশীল? আমি আমার শিক্ষকদের বলি বাচ্চাদের দমিয়ে দেবেননা। নিজে আপডেটেড হোন।
আমাদের জীবনে অনেক অসংগতি আছে। আমাদের জীবনে অনেক হাহাকার আছে। আমি যখন লেখাপড়া করি, বই পড়ি, অসংগতি বুঝতে পারি। অনেক নিয়ম মাথার উপর চেপে বসে আছে। গতানুগতিকতা, কুসংস্কারের লালন পালনকারীরা সমাজকে চেপে ধরে রেখেছে। তারা ফায়দা নিচ্ছে। তারা অন্তঃসারশূন্য। কখনো ধর্মকে ব্যবহার করছে। কেউ রাজনীতিকে ব্যবহার করছে। মানবতাকে পর্যদুস্ত করে এই পশ্চাৎপদতা। সব অসংগতি আঁকা যায়না। শিল্পীর তুলি থেমে যায়। সব হাহাকার কবিতায় ফুটে উঠেনা। সব ছবি সিসিটিভি দেখতে পায়না। রাডারে ডাইনীর ছবি ফুটে উঠেনা। তো, কি করা যায়? বই পড়ে যদি আমি কণ্ঠস্বর উঁচু করি, নীরবতা ভঙ্গ করি? আপনার গায়ে লাগবে। অনেক কিছু মান্‌তে পারিনা। চুপ করে থাকতে হয়। তবে এমনভাবে অসংগতিগুলো উপস্থাপন করা যায়, যা পরিবর্তনে সহায়ক হয়। এ জন্যই দরকার সৃজনশীলতার। ঢাকা লাইভ আর্ট রিয়েনান-১৭, গত সপ্তাহে ঢাকায় ১৬টি দেশের শিল্পীদের কিভাবে শিল্প উপস্থাপন করেছেনণ্ড রক্কো জুহাস োভাকিয়ার মানুষ, তিনি কয়েকজন রিকসা চালককে ডেকে নিয়ে গেলেন, খেলার মাঠে। যাত্রীরা তো প্রতিদিন রিকসার সীটে বসেন। বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে রিকসাগুলো দাড়িয়ে আছে। তার একটিতে রিকসাওয়ালাকে বসিয়ে চালকের সীটে উঠলেন জুহাস। রিকসা চালালেন। রিকসাওয়ালা আজ যাত্রীর আসনে। আরো রিকসা আছে, আপনি চাইলে একজনকে বসিয়ে নিতে পারেন। ব্যাপারটা ব্যতিক্রমী না?
দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার বিশেষ পাতা “আনন্দ” (৯/২/২০১৭) পড়ে জানতে পেরেছি, একবার রাজু ভাস্কর্য্যের পাশে একটা জটলা দেখা গেল। সেখানে টেবিল চেয়ার পেতে বসেছিলেন দুই যুবক। একজন সস লাগিয়ে কাঁচা মাংস খাচ্ছে। অন্যজন ছাড়াচ্ছিলেন গোল আলোর খোসা। পথচারীর চোখ কপালে, এসব হচ্ছে কি? ছাত্ররা বলল, কিছু মানুষ, মানুষের মাংস চিবিয়ে খাচ্ছে। বাকীরা আলু ছেলায় ব্যস্ত। এটি এরই রূপক। শাহবাগ থানা থেকে পুলিশ আসে। র‌্যাবও আসে-এসব হচ্ছে কি? উত্তর-এসব পারফরমিং আর্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এফ এইচ হলের পুকুর ঘাটে রাহুল আনন্দ। সাদা ঠোংগায় মাথা ঢাকা। তাতে কালি দিয়ে একটি চোখ আঁকা। আরেক ঠোংগায় গোলাপ পাপড়ি। পুকুরের পানিতে ছড়াচ্ছে-আনন্দ। আনন্দ কেন ছড়াচ্ছেন? বাজারে ভালবাসার উপকরনের দাম বেশী। কিন্তু আসল ভালবাসা নেই। গোলাপ পাপড়ি মানে আসল ভালবাসা।
আমার বাগানে অনেক গোলাপ ফুটেছে। সাদা, লাল, হালকা লাল। গাঁদাও অফুরন্ত। বাগান প্রজাপতিতে ভরে গেছে। আমি দু কেজি সন্দেশ কিনে এনেছি প্রজাপতির জন্য। আমার স্ত্রী বলল, এর মানে কি? আরে প্রজাপতি বলে কথা। পাহাড়ে যারা খালি পেটে কাঠ খুঁজতে যায়-তারাই আসল প্রজাপতি। গরীবের কাঠ কুড়ানি ছেলে মেয়ে প্রজাপতি নয় কেন?
লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
(সংগৃহীত)

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত