logo
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬
 
ekattor
জবি শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি : সেশন জটে শিক্ষার্থীরা
জবি শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি : সেশন জটে শিক্ষার্থীরা

জবি, ০৭ আগস্ট, এবিনিউজ : নিয়ম আছে, সেমিস্টার শুরু হলেই শিক্ষকরা ক্লাস রুটিন অনুসারে ক্লাস নেবেন। প্রতি সেমিস্টারে প্রতি ক্রেডিটের জন্য ১৫ ঘণ্টা ক্লাস নেবেন। মিডটার্ম পরীক্ষা, অ্যাসেসমেন্ট জমা, এমন কী প্রেজেন্টেশন নেওয়ার পরবর্তী ১০ কর্মদিবসের মধ্যেই তার ফলাফল প্রকাশ করবেন। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনে এমন নিয়মের কথা বলা থাকলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বেশির ভাগ বিভাগের শিক্ষকরা এই নিয়মের তোয়াক্কাই করেন না। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ রকমের সেশন জটের শিকার হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, তারা হয়ত অনেকটা দায় ঠেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তারা এটাও বলেন, কোনও কোনও শিক্ষক ঠিকঠাক নিয়ম মানলেও অনিয়ম করা শিক্ষকদের প্রভাবটাই বেশি পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনে বলা আছে, যেহেতু এক বছরে দুটি সেমিস্টার, সেহেতু জুলাই থেকে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দুই সেমিস্টার মিলিয়ে একটি সেশন শেষ হবে। এক সেমিস্টারের মেয়াদ ছয় মাস হওয়ায় পাঁচ মাসের মধ্যেই সমস্ত ক্লাস-অ্যাসেসমেন্ট-মিডটার্ম এবং প্রেজেন্টেশন শেষ করে ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের অন্তত সাত দিন সময় দেবেন শিক্ষকরা এবং ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়ার সময়কাল থাকবে দুই সপ্তাহ। কিন্তু কোনও কোনও বিভাগে এক সেমিস্টার শেষ করতে সাত/আট মাস সময় লাগিয়ে দেন শিক্ষকরা।
সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করবেন বলেও একাডেমিক রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনে বলা আছে। অনার্স এবং মাসটার্স ফাইনাল বর্ষে গবেষণা প্রবন্ধ থাকার কারণে ১২ সপ্তাহের মধ্যে তাদের ফলাফল প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ কয়েকটি বিভাগে পরীক্ষা শেষ হওয়ার ২৪ থেকে ৩২ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শিক্ষকরা ফলাফল ঘোষণা করেন না বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
তারা বলেন, শিক্ষকরা অজুহাত দেখান, এক্সটার্নাল শিক্ষকরা খাতা সময়মতো জমা দেন না। অথচ এক্সটার্নাল শিক্ষকরা খাতা সময়মতো জমা না দিলেও তার জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, সবাই মিলে উৎসব করে আমাদের সেশন জটে ফেলছেন যার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, আমাদের এডাডেমিক এবং প্রফেশনাল ক্যারিয়ারে।
এদিকে, সেশন জটের কারণ হিসেবে শিক্ষক সংকট এবং ক্লাসরুমের সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করান শিক্ষকরা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিটি বিভাগের জন্যই গড়ে দুই থেকে তিনটি ক্লাসরুম বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু কোনও বিভাগের একমাসও সেশন জট নেই, অপরদিকে কোনও কোনও বিভাগের এক থেকে দুই বছরের বেশি সময় সেশন জট রয়েছে। আবার শিক্ষক সংকট নেই বলেও শিক্ষকদের এই অজুহাত খারিজ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে,বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট ৩৩টি বিভাগে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় ছয়শ শিক্ষক রয়েছেন। অর্ধশতাধিক শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে থাকলেও বর্তমানে যত শিক্ষক রয়েছেন, তা দিয়ে ঠিকঠাক মতোই বিভাগ পরিচালনা করা যায়।
বিভিন্ন বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, বিভাগের শিক্ষকরা নামেমাত্র একটি রুটিন তৈরি করেন। ওই রুটিন অনুযায়ী শিক্ষকরা ক্লাস নেন না। ক্লাসের আগের দিন রাতে ফেসবুকে অথবা ফোনে ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে জানতে হয়, পরের দিন ক্লাস হবে কী হবে না। আবার অনেক সময় আধা ঘণ্টা পর পর তাদের মতের পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্লাস টাইম পরিবর্তন করেন। তাদের আচরণ এমন থাকে যেন আমরা ‘নাচের পুতুল’!
তারা আরও অভিযোগ করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)  যেহেতু অনাবাসিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়, আমরা ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্যাম ঠেলে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই জানতে পারি কোর্স-শিক্ষক সেই ক্লাসের টাইম আরও তিন অথবা চার ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়েছেন। ৩/৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর আবার জানতে পারি, তিনি ক্লাসটি শেষ পর্যন্ত নেবেনই না। অন্যদিকে, তাদের দেওয়া নিধার্রিত সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে যদি পাঁচ মিনিট দেরিও হয়, তাহলে তারা ক্লাসে ঢুকতেই দেন না অথবা হাজিরা খাতায় উপস্থিতি দেন না। সঙ্গে তো তাদের চোখ রাঙানিও দেখতে হয়। অথচ তারা আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখেন। এতে তাদের বিন্দুমাত্র অনুশোচনাবোধ নেই। তারা তাদের ব্যক্তিগত কাজ ঠিকই করছেন। কিন্তু আমরা বলির পাঁঠা হচ্ছি।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে নৃবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, সেমিস্টারের শুরুতে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। এমনও হয়, ক্লাস শুরুর নির্ধারিত তারিখ থেকে আরও প্রায় দুই মাস পরে গিয়ে কেউ কেউ ক্লাস শুরু করেন। যখনই দেখেন কোর্স শেষ করতে পারছেন না, তখন তারা না পড়িয়েই বাড়তি অ্যাসেসমেন্ট আমাদের ওপর চাপিয়ে দেন যা পড়াননি, যা বুঝিয়ে দেননি, তা আমাদের পক্ষে বুঝতেও অনেক কঠিন হয়ে যায়। ফলে, আমরা পরীক্ষাতেও ভালো মার্কস পাইনা। তিনি বলেন, এদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো না হলে তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেক সময় শিক্ষকদের কাছে পরীক্ষা আরও কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করি। কিন্তু তারা সে আবেদনও রাখেন না। তারা যদি প্রথম থেকেই সময় মতো ক্লাস নিতেন, তাহলে আমরা পরীক্ষা পেছানোর জন্য আবেদন করতে যেতাম না। এমন কী সেশন জটেও আমরা পড়তাম না।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের তুলনা করে ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন দুই শিক্ষার্থী বলেন, এখন প্রতিযোগিতার সময়। চাকরির বাজারে আমাদের টিকে থাকতে হবে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের চেয়ে আমাদের ফলাফল এতই খারাপ যে, আমরা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিনা। অথচ তাদের চেয়ে আমরা কোয়ালিটিতে কোনও অংশেই কম নই। সুতরাং, যতই আমরা ভালো শিক্ষার্থী হই না কেন, চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতাই নেই আমাদের!
বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ভূগোল ও পরিবেশ, নৃবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, ইংরেজি বিভাগ ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিভাগে ভয়াবহ রকমের সেশন জটের কবলে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। আর এ সব বিভাগের শিক্ষার্থীদেরই অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিভাগের শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দেন। এমন কী ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পরিবার, বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করেন এবং সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোডও করেন।
অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন,শিক্ষকদের এমন অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের চোখ রাঙানি দেখতে হয়। তারা আমাদের মার্কস কম দেওয়ারও ইঙ্গিত দেন। তাই, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ তুলতেও ভয় পাই।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সহজে কেউ কথা বলতে সাহস করেনা। তার কারণ শিক্ষকরা ক্ষমতা কাঠামোকে খুব বেশি কাজে লাগান। তাছাড়াও তারা একের পর এক অনিয়ম করে চলেন অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা তদারকি করেনা। এমন কী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোনও জবাবদিহিতাও নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অন্তত সংবাদমাধ্যমে দেখে হলেও শিক্ষকদের অনিয়ম তদারকি করা।
অনিয়মকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীরাই যে তাদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় থাকে, তা নয় কোনও শিক্ষকও যদি অনিয়মকারী অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, তাহলে তাকেও পড়তে হয়সমালোচনায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের সভাপতি ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়া এবং নানা অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে একটি বিভাগের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ায় ওই শিক্ষককে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে শুক্রবার বিকেলে তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, বোঝেন তো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কেউ কেউ তাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে। এ তেমন কিছু না। এতে আমার কিছু যায় আসেনা।
তিনি বলেন, আমরা শিক্ষকরা যদি নিয়মিত রুটিন মাফিক ক্লাস নিই এবং শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকে, তাহলে সেশন জটের মতো ভয়াবহ সমস্যার প্রায় সবটাই সমাধান হয়ে যাবে। তাছাড়া রুটিন অনুযায়ী কোনও শিক্ষকের ক্লাস না থাকলেও তার বিভাগে প্রতিদিনই আসা উচিত। কারণ, ক্লাসের বাইরেও বিভাগে অনেক কাজ থাকে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষকরা সমাজের বিবেকবান মানুষ। তাদের আদর্শ-নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার্থীসহ সবাই অনুসরণ করেন, নিজের মধ্যে ধারণ করেন। ফলে, তাদের সবার আগে এটা বুঝে চলা উচিত। তারা নিজেই আত্মসমালোচনা করবেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা রুটিন মেনে ক্লাস নেবেন, এটাই নিয়ম। তারা কোনোভাবেই এটাকে অবহেলা করতে পারেন না। ক্লাস ফাঁকি দেন, অনিয়ম করে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় ফেলেন এমন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান এবিনিউজকে বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ কেউ হয়ত সেই নিয়ম মানেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সেশন জট অনেকটাই কম। তারপরও যেসব বিভাগে সেশন জট আছে, কীভাবে তা কমানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করবো।

এবিএন/রবি-১ম/শিক্ষাঙ্গন/জাহিদুল/মুস্তাফিজ/রাজ্জাক

Like us on Facebook

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত