logo
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৬
 
 
  • হোম
  • সারাদেশ
  • ভোলায় অর্ধশত গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
ভোলায় অর্ধশত গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
ভোলায় অর্ধশত গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
ভোলা, ০৬ আগস্ট, এবিনিউজ : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপকূলীয় জেলা ভোলার মেঘনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ভোলা সদর, তজুমদ্দিন, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার অর্ধশত গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। পানিবন্দি এসব মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একদিকে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, অন্যদিকে তাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে ভিটে-মাটিসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মালামাল। ইতিমধ্যে বহু পরিবার প্লাবিত এলাকা ছেড়ে পাশের এলাকায় আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে ঘর-বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভোলার বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিনেও সংস্কার না হওয়ায় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বেড়িবাঁধ। আর এসব ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে হু হু করে ভেতরে ঢুকছে মেঘনা নদীর পানি।    
পানিবন্দি এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা জানায়, পাহাড়ি ঢলে মেঘনা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে করে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়ন, রাজাপুর ইউনিয়ন, ধনিয়া ইউনিয়ন ও বাপ্তা ইউনিয়নের প্রায় ১৫ গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে পানিবন্দি ও ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন বানিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। এ সময় দলীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
 এছাড়া গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় তিনটি স্পটে পাউবোর প্রায় ২৭৫ মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ (সম্পূর্ণ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয় ১১ কিলোমিটার বাঁধ। ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ সংস্কার না করায় জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের কেয়ামুল্যা, হাজিকান্দি, আড়ালিয়া, পাটওয়ারী কান্দি, দড়ি চাঁদপুর, দালালকান্দি, শশিগঞ্জ, ভুলাইকান্দি, ভুইয়াকান্দি, দেওয়ানপুর, বালিয়াকান্দি, সিকদারকান্দি, মহাজনকান্দি, শম্ভুপুর ইউনিয়নের কোড়ালমারা ও সোনাপুর ইউনিয়নের অন্তত ২৫ গ্রাম। এতে পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। জোয়ারের পানিতে ভেসে যাচ্ছে ভিটে মাটিসহ ঘর-বাড়ি। এ অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষ। 
কেয়ামূল্যাহ গ্রামের পানিবন্দি মোঃ শাহজাহান (৬০) বলেন, বার বার নদী ভাঙনের কবলে সব কিছু হারিয়ে এখন আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। এ পর্যন্ত আমি ৬ বার ভিটা বদল করেছি। গত বছর এ জমিটা ক্রয় করে ঘর তুলেছি। জোয়ারের পানির কারণে পরিবার নিয়ে ঘর ভাড়া করে অন্য জায়গায় বসবাস করছি। জোয়ারের পানিতে ভিটা মাটির অধিকাংশ ভেসে গেছে। তাই ঘর দুয়ার ভেঙে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। 
একই গ্রামের সহিদ মাঝি বলেন, আমাদের খোঁজ নেয়ার কেউ নেই। গত কয়েকদিনের জোয়ারের পানিতে ঘর দুয়ার সব শেষ হয়ে গেছে। হাঁস মুরগি ও ভিটে মাটি পানির সঙ্গে মিছে গেছে। জোয়ার আসলেই ছেলে সন্তানদের নিয়ে থাকতে হয় রাস্তার ওপর। রান্না করতে না পেরে পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। শুধু শাহজাহান আর সহিদ মাঝি নয়। পানিবন্দি উপজেলার অর্ধলক্ষ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ এসব পরিবারকে দূর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার দাবি জানায় পানিবন্দি মানুষ। জোয়ারের পানির কারণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে উপজেলার প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ। পানির সঙ্গে ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ। 
কোড়াল মারা এলাকার এমরান মাতাব্বর বলেন, প্রায় ২ একর জমিতে আমন আবাদের লক্ষে তিনি বীজতলা রোপন করেন। কিন্তু জোয়ারের পানিতে সব বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সাজ্জাদ হোসেন তালুকদার বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বেড়িবাধ নির্মান করা প্রয়োজন। দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামত করতে না পারলে এভাবে লবনাক্ত জোয়ারের পানির কারণে আমন আবাদ না হওয়ার পাশাপাশি মাটিতে লবনাক্ততা বেড়ে যাবে। এতে করে মাটি দীর্ঘমেয়াদী পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 
তজুমদ্দিন মৎস্য কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, জোয়ারের পানিতে প্রায় ৭০০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। যার ক্ষতির পরিমান প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা। এভাবে লোকাসানের ফলে মৎস্য চাষীরা আয়মূলক এ কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। চাষিরা যাতে তাদের লোকসান কাটিয়ে উঠে পুনরায় মৎস্য চাষে ফিরে আসতে পারে সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে সহজ শর্তে ঋনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। 
তজুমদ্দিন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহাকারী প্রকৌশলী মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, রোয়ানুর প্রভাবে উপজেলা শহর রক্ষা বাঁধের ১১ কিলোমিটার আংশিক ও ২৭৫ মিটার বাঁধ সম্পর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পানি বন্ধ করতে আমরা ঢাকা হেড অফিসে যোগাযোগ করেছি। তাদের মৌখিক নির্দেশে ইমার্জেন্সি ভিত্তিতে ৪-৫ টি স্পটে বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। পুরোপুরি কাজ শেষ হতে আরো সময় লাগবে।
জোয়ারের পানিতে মনপুরা উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের কুলাগাজীর তালুক, আন্দিরপাড়, ইশ্বরগঞ্জ, রামনেওয়াজ পরিষদ চত্বর এলাকা, কলাতলী, দাসেরহাট এলাকা ও চর নিজাম এলাকাসহ অন্তত ১০ গ্রাম তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
ইশ্বরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় ইউপি সদস্য ফখরুদ্দিন পাটওয়ারী হিরন বলেন, ঘুর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে এ এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সংস্কার না করায় অরক্ষিত রয়েছে বাঁধটি। ইতিমধ্যে বাঁধের অনেক অংশই মেঘনা নদীর পানির ¯্রােতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পাউবো কর্তৃপক্ষকে একাধিবার জানালেও কোন লাভ হচ্ছেনা। কুলাগাজীর তালুক এলাকার মোঃ শাহজাহান বলেন, এতোদিন বেড়িবাঁধের কারণে পানি ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে মানুষ কিছুটা হলেও রক্ষা পেত। কিন্তু বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ভেতরে ঢুকে ফসলী জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের পানিতে ভেসে যায় ঘর-বাড়ি ও পুকুর। এতে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ এলাকার সাধারণ মানুষ। 
লালমোহন উপজেলার অন্তত ১০ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ঘুর্ণিঝড় রোয়াুনর আঘাতে লালমোহন, লর্ডহার্ডিঞ্জ ও ধলীগৌড় নগর ইউনিয়নের তিনটি স্পটে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ফাতেমাবাদ গ্রাম ও নতুনবাজার গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে বলে জানান লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম মিয়া। 
চরফ্যাশন উপজেলার চর কুকরী-মুকরী, চর পাতিলা, চর মানিকা, চর কচ্ছপিয়া, ঢালচর, চর মাদ্রাজ, চর নিউটন, মোহাম্মদপুর, আসলামপুর, চরকরমী, চর হাসিনা, নজরুল নগর গ্রামসহ অন্তত ২৫ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।  
ঢালচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার জানান, বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে গত কয়েকদিন ধরে তার ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহি প্রকৌশলী বাবুল আখতার গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এবিনিউজকে বলেন, ভোলা সদরে জোয়ারের পানিতে পানিবন্দি হওয়ার কোন খবর আমি পাইনি। তবে, মেঘনার পানি বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন বেড়েছে।  
জোয়ারের পানিতে তজুমদ্দিন, লালমোহন, মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার কথা স্বীকার করে ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার আলম এবিনিউজকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে এসব বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি বর্ষা মৌসুমের পর ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ মেরামত করা হবে। 
 
এবিএন/শনি-২য়/সারাদেশ/ডেস্ক/তপু/মুস্তাফিজ/ইতি

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত