logo
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬
 
ekattor
সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্র ড. রণজিৎ বিশ্বাস
সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্র ড. রণজিৎ বিশ্বাস
নেছার আহমদ, ০৬ আগস্ট, এবিনিউজ : পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, বনাঞ্চল, ফসল, ভূমি, নদ-নদী, খাল, বিল সমৃন্ধ সূপ্রাচীন ভূখণ্ড চট্টগ্রাম। প্রকৃতির পাঁচটি আকর্ষণীয় উপাদান রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ চট্টগ্রামে। দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য, নদী ও হৃদ এবং এসবের সাথে রয়েছে সমুদ্র বন্দর। অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামকে সমগ্র বিশ্বে একক ও অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। এক কথায় বলা যায় চট্টগ্রামের অনবদ্য নৈসর্গিক সৌন্দর্য এ জনপদকে পরিণত করেছে প্রকৃতির অপরূপ লীলা নিকেতনে। প্রকৃতির অপূর্ব নান্দনিক পরিবেশে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য আলোকিত মানুষ। যারা চট্টগ্রামের এ ঐতিহ্যকে ধারণ করে নিজেরা যেভাবে আলোকিত হয়েছেন তদ্রুপ চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মানুষদেরকেও আলোকিত করেছেন। চট্টগ্রামের তেমনি এক কৃতী সন্তান কবি, ঔপন্যাসিক, রম্য লেখক, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবং কথাশিল্পী ডক্টর রণজিৎ বিশ্বাস। ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এলাকা রাঙ্গুনিয়ার পোমরা গ্রামে রণজিৎ বিশ্বাসের জন্ম। পিতা অপর্ণাচরণ বিশ্বাস একজন স্কুল শিক্ষক। মাতা ্নেহলতা বিশ্বাস একজন সুগৃহিনী। পিতা অপর্ণাচরণ বিশ্বাস কাপ্তাই প্রজেক্ট হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। যার কারণে পিতার কর্মস্থল কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রজেক্ট এলাকায় প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যে রণজিতের বেড়ে ওঠা।
এখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। ১৯৭২ সালে কাপ্তাই প্রজেক্ট হাই স্কুল হতে কৃতিত্বের সাথে এস.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। স্বাধীনতা পরবর্তী সে সময়ে দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় কাপ্তাইয়ের পরিবেশ ছিল শান্ত ও নৈসর্গিক। সে কাপ্তাই এলাকায় বসবাসের কারণে রণজিৎ যাঁদের সাহায্য পেয়েছেন তাঁরা ছিলেন সে সময়ে বাংলা সাহিত্য জগতের নক্ষত্র স্বরূপ। কাপ্তাই প্রজেক্টের সিকিউরিটি প্রধান এজাহারুল ইসলামের স্ত্রী মনিরাতুল আলম প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাহবুব উল আলমের মেয়ে। তাঁদের ছেলে ফরিয়াদুল আলমের সাথে ছিল রণজিৎ এর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। স্কুলের দুই মেধাবী ছাত্রের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব এবং রণজিৎ এর বাবার অসুস্থতার কারণে আলম পরিবারের সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্কের কারণে রণজিৎকে সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। স্বশিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান রণজিৎ এর প্রতি আলম পরিবারের স্নেহ, মায়া, মমতা নিজ সন্তানের চেয়ে কম ছিল না।
কাপ্তাই হতে এস. এস.সি পাস করে উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় শহরে সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের পরিবারের একজন হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। গ্রামের ছেলে শহরের পরিবেশে এসে একেবারে নতুন এ পরিবেশের সাথে মানিয়ে মাহবুব উল আলমের পরিবারের স্নেহধন্যে চট্টগ্রাম শহরে টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে কৃতিত্বের সাথে ১৯৭৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন।
আত্মবিশ্বাসী ও মেধাবী ছাত্র রণজিৎকে পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা বাধা দমিয়ে রাখতে পারেনি। রণজিৎ বিশ্বাসের পুরো জীবনটা আসলে রূপকথার গল্পের মত।
১৯৭৪ সালে দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহে “দৈনিক জমানা”কে নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক জমানা হিসেবে প্রকাশ করার অনুমতি পান সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম। এ পত্রিকায় সবুজ আসর এ “রাজা রাজা খেলা” কিশোর উপন্যাস লিখে রনজিৎ ছোটদের প্রিয় লেখক হয়ে ঊঠেন। সম্ভবত ছোটদের জন্য লেখালেখির মাধ্যমে রণজিৎ এর লেখালেখির জগতে প্রবেশ। চাকুরী, টিউশনি, লেখালেখি এবং পড়ালেখা এভাবেই চলে রণজিৎ এর জীবন।
চট্টগ্রাম কলেজ হতে ১৯৭৮ সালে বিএসসিতে অনার্স নিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাস করেন এবং ১৯৮০ তে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে এম.এস.সি পাস করেন।
১৯৮১ তে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন। ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের চকবাজারস্থ আলিয়ঁস ফ্রসেজের পার্শ্বে অবস্থিত অরুণ সেনের বিদুষী কন্যা শেলী সেনগুপ্তার সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
রণজিৎ ক্যাডার সার্ভিস জীবনের শুরুতে চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী কর্নেল অলির সরকারি পিএস হিসেবে কাজ করেন, যা তাঁর জন্য এক সময় এসে বিপর্যয়ের কারণ ঘটে। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সচিব হিসেবেও কাজ করেন। সরকারি উচ্চ পদস্থ আমলা হয়েও সততা, দক্ষতা ও সম্পদের প্রতি অনাগ্রহ তাঁকে মাটি ও মানুষের সাথে সম্পৃত্ত করে রেখেছে। সরকারি ফাইলের গৎবাধা জীবনের সাথে সাথে তিনি সংগীত জগতের সে সময়কালের জনপ্রিয় দল “সোলস” এর সাথে কাজ করেছেন। শ্রেষ্ঠ রম্য লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ক্রীড়া ভাষ্যকার হিসেবে পেয়েছেন জনপ্রিয়তা।
পেশাগত কারণে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি একজন শ্রমজীবী লেখক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। তিনি সমাজের পোড় খাওয়া, খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ বেদনা গভীর মমতার সাথে উপলব্ধি করতেন। তাই মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর ছিল গভীর সখ্যতা। তিনি অবিরাম লিখেছেন। সাথে সাথে একাডেমিক পড়ালেখাকে ত্যাগ করেননি। তিনি একে একে এমবিএ, এম বি সি ডিগ্রি নিয়েছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তিনি আমেরিকার প্রিস্টন বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহিত্য, সাংস্কৃতিক জগতে কাজ করার সুবাধে তাঁর বক্তব্য শুনার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের বক্তৃতা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। আমি কখনো চিন্তাই করতে পারিনি রণজিৎদার বাড়ি ‘চট্টগ্রাম’ হতে পারে। বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ এবং সাহিত্যিক ভাষায় বক্তৃতা দিতে আমি চট্টগ্রামের কম লোককেই দেখেছি। সে দিক দিয়ে রণজিৎদার ভাষা জ্ঞান উল্লেখ করার মত।
গল্পকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি কিংবদন্তির ন্যায়। সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পি এস হতে বদলির পর সে সময়ে অভিজ্ঞতা নিয়ে চমৎকার এক গল্প লিখেছেন “সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন নামে”। যা সে সময়ে দারুণ সাড়া জাগিয়েছে। তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন। তবে গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ২টি। বিভিন্ন প্রবন্ধ নিবন্ধের উপর রণজিৎ বিশ্বাসের প্রায় ২০টির মতো বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। শুদ্ধ বানান চর্চার উপরও তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ দিক দিয়ে তাঁকে আমরা ভাষা বিজ্ঞানীও বলতে পারি।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে তিনি ১ মে ২০১৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বহুমাত্রিক মানুষ হিসেবে রণজিৎ বিশ্বাস সহকর্মীদের কাছে পরিচিত ছিল। শিল্প সাহিত্য জগতে বোদ্ধা ও প্রাজ্ঞজন হিসেবে অশেষ সুনামের অধিকারী তিনি। জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত যিনি সর্বদা লড়াই করে গেছেন।
এখানে সাহিত্যিক মোহীত উল আলমের একটি লেখার উদ্ধৃতি দেয়া সমীচীন মনে করছি। “কথাটার সত্যমিথ্যা জানি না, কিন্তু গ্রামের প্রেক্ষাপটটি বিবেচনায় আনলে এই অনুভূতি হয় যে এরকম একটি পরিবেশ থেকে পেশাগত জীবনে উন্নতির শিখড়ে ওঠা, পাশাপাশি নিজের জন্য নির্ধারিত ‘শ্রমজীবী লেখক’ উপাধিটিকে যথার্থ প্রমাণ করা বিস্ময়কর বটে। রণজিৎ তা পেরেছিলেন এবং বাংলাদেশের অনেক ক্ষণজন্মা পুরুষই তা পেরেছিলেন, কিন্তু রণজিতের সংগ্রামটা আমার কাছে অনুপম মনে হয়, কারণ তাঁর সংগ্রামটা আমরা খুব কাছে থেকে দেখেছি। সততা ও শ্রমের, মেধা ও বিশ্বাসের, মানবিকতা ও বিবেচনাবোধের এমন মধুর সমন্বয় খুব কম চরিত্রের মধ্যে আমি পেয়েছি। রণজিৎ তাই আমার কাছে শুধু পটে লেখা ছবি নয়, বরঞ্চ ছবিকে ছাড়িয়ে যার অনুপ্রেরণা রাতে চমকে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়”।
আসলে রণজিৎ বিশ্বাস কে লেখার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রণজিৎ বিশ্বাসের পুরো জীবনটাই একটি উপন্যাসের খোলা পাতা।
চট্টগ্রামের প্রকৃতির সন্তান এবং আলোকিত মানুষ রণজিৎ বিশ্বাস। ২৩ জুন ২০১৬, মাত্র ৬১ বছর বয়সে অবিশ্বাস্য এক জীবন কাহিনী ও বর্ণাঢ্য এক জীবনের অবসান ঘটে। রণজিৎ বিশ্বাস চলে গেলেন না ফেরার দেশে। (সংগৃহীত)
সূত্র : শেলী সেনগুপ্ত (প্রয়াত রণজিৎ বিশ্বাসের স্ত্রী) এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ।
Like us on Facebook

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত