logo
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬
 
ekattor
১৫ আগস্ট : সামরিক প্রেক্ষাপট ।। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে
১৫ আগস্ট : সামরিক প্রেক্ষাপট ।। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে
শঙ্কর প্রসাদ দে, ০৫ আগস্ট, এবিনিউজ : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলেন। নৃশংসতার দিক থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে রাজপরিবার হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম। আবার আঁততায়ীর হাতে নিহত পৃথিবীর অন্য যেকোন নেতার চাইতে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন শীর্ষে। মৃত্যুর একুশ বছর পর দায়েরী মামলায় যারা সাজা পেয়েছে তারা সেনাকর্মকর্তা। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ষড়যন্ত্র হয়েছিল শুধু সেনানিবাসে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি আরো বিস্তৃত। সরাসরি খুনি হিসেবে ঐ কয়জন সেনা সদস্যকে দোষারোপ করা হয়েছে। কিন্তু ঐ হত্যাকান্ডের জন্য যে পটভূমি তৈরী হয়েছিল তাতে এদেশের আমলাতন্ত্র, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, সরকারী দল, সমাজপতি, একাত্তরের পরাজিত শক্তি সর্বোপরি আন্তর্জাতিক চক্রান্তও কম দায়ী ছিলো না। প্রত্যেকটি গোষ্ঠীর কর্মকান্ড পৃথকভাবে আলোচনার দাবী রাখে বিধায় এই নিবন্ধে শুধুমাত্র সামরিক পটভূমিটাই আলোকপাত করা হল।
একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের শুরু ২৬ শে মার্চ, জেনারেল ইয়াহিয়া স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে অস্ত্রের ভাষায় স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন। পৃথিবীর বহু দেশেই এমন ঘটতে দেখা গেছে এবং এখনো দেখা যায়। আমাদের পড়শী শ্রীলঙ্কার তামিল জন গোষ্ঠীর স্বাধীনতার আকাঙ্খা বহুদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সামরিক পদক্ষেপ কি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে তা জানা থাকা স্বত্ত্বেও ইয়াহিয়া-ভুট্টো সামরিক সমাধানকেই বেছে নিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হলেও বাঙ্গালী সেনাদের তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ এক নজিরবিহীন ঘটনা। এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইপি.আর. ই.রি.আর, স্থল, বিমান, নৌসেনা, পুলিশ আনসার ও অবসরপ্রাপ্ত বাঙ্গালী সেনাসদস্যের সংখ্যা পূর্ব-পাকিস্তানে মোটামুটি ২৮ হাজারের মতোই ছিল। হয়তো অনেক সেনাসদস্য ও কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্রোহ করেনি। তবে এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, বাঙ্গালী সেনামাত্রই মানসিকভাবে পাকিস্তান দ্রোহী হয়ে উঠেছিল। সময় যতই গড়িয়েছে পূর্ব-পাকিস্তানে অবস্থানরত কোন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙ্গালী ব্যক্তিকে পাকিস্তানীরা নিজেদের পক্ষে নিতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানে যেসব সেনাসদস্য আটকা পড়েছিল, তাদের মধ্যে অনেকে পালিয়ে ভারতে এসে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। তবে এটাই বাস্তবতা যে, অন্তত একতৃতীয়াংশ সেনা কর্মকর্তা ধরে নিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান টিকে যেতে পারে। আবার অনেক সেনাকর্মকর্তা ও সিপাহী পশ্চিম পাকিস্তানে স্পষ্টত বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। স্বাধীনতা লাভের মুহূর্ত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়াদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত বেসামরিক ও সামরিক বাঙ্গালী প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়।
সামরিক বাহিনীতে পাকিস্তান ফেরৎ সেনাকর্মকর্তাদের আত্মীয়করণ এমন এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে এদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকেই লন্ডভন্ড করে দেয়। কর্ণেল হামিদের মতে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্তাদের দু’বছর সিনিয়রিটি দিতে রাজী না থাকলেও চাপের মুখে মানতে বাধ্য হন। এই প্রমোশন তাৎক্ষনিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের পক্ষে বহু ব্যাচমেন্ট ও সিনিয়রকে ডিঙ্গানোর সুযোগ এনে দিয়েছিল। ফলে বঞ্চিতরা একটাই যুক্তি দিয়েছেন যে, তারা আটকা পড়েছিলেন এবং রীতিমত বন্দী জীবন কাটিয়েছেন যুদ্ধের নয় মাস। উপেক্ষিত হওয়ায় সমস্ত পাকিস্তান ফেরৎ সেনাকর্তাবৃন্দ এক কাতারে চলে আসে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। তাদের একটাই পরিচয় হয়ে উঠেছিল অ-মুক্তিযোদ্ধা। এই দ্বন্দ্ব বাহ্যিক এবং প্রকাশ্য ছিল। অলক্ষ্যে যে দ্বন্দ্বটি প্রকট হচ্ছিল সেটি আরো মারাত্মক। স্বীকৃতি পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্তারা আকাশ ছোয়া অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন। তাদের মনস্তাত্বিক দিক ছিল তারাই সশ্রস্ত্র বিদ্রোহ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভীত তৈরী করেছিলেন। পাকিস্তান ফেরৎ অ-মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা ঐ পরিস্থিতিতে এক ধরণের মনস্তাত্বিক বৈকল্যের মধ্যে নিপতিত হন এবং তারা এই অপমানজনক অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে মানতে রাজী হচ্ছিলেন না। এদের বেশীর ভাগই চাকুরীতে থেকে গিয়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অজনপ্রিয় করার সব ধরণের কর্মকান্ডে নীরব সমর্থন দিতে শুরু করেন। এই অভিযোগটি লেঃ কর্ণেল শাকায়াত জামিল স্পষ্ঠভাবে তার বইয়ে উত্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ গোটা সোন ক্ষমতা কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। শফিউল্লাহ ছিলেন ১৯ মার্চ জয়দেবপুর বিদ্রোহের সেনানেতৃত্বে আর জিয়া ছিলেন ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষক। খালেদ ছিলেন অসম সাহসিকতার প্রতীক ‘কে’ কোর্সের অধিনায়ক এবং সেনা বাহিনীর তৃতীয় উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ‘এস’ কোর্সের অধিনায়ক শফিউল্লাহর সেনাপ্রধান হওয়ায় খুব বেশী সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু ৭৫ এর মে মাসে শফিউল্লার মেয়াদ শেষ হওয়া স্বত্ত্বেও আরো ৩ বছরের জন্য নিয়োগ দেয়ায় ‘জেড’ কোর্সের অধিনায়ক জিয়া কোনঠাসা হয়ে পড়লেন। এবং বুঝলেন শফিউল্লাহর পরে তাকে ডিঙ্গিয়ে খালেদকেই সেনাপ্রধান করা হবে। ঢাকা গ্যারিসনে মতা কাঠামোর চূড়ান্ত এই বিন্যাস সেনা গ্রুপিংকে স্পষ্ট করে তোলে। সবচে বড় গ্রুপে ছিলেন শফিউল্লাহ-খালেদ-শাকায়াত নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ। এর পরের অবস্থানে ছিলেন জিয়ার অনুসারী মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ। এই গ্রুপের সমর্থক ছিলেন ফারুক-রশীদ গং। এরা বঙ্গবন্ধুর সরকার পরিচালনার ব্যর্থতাগুলোতে ছিলেন চরম অসন্তুষ্ঠ আর পরিবর্তন প্রত্যাশী। এটাকে আরো সহজ কথায় বললে দাড়ায়, বঙ্গবন্ধুপন্থী শফিউল্লাহ-খালেদ-শাফায়াত বনাম সিপাহী সমর্থনে জনপ্রিয় জিয়া গ্রুপ। তৃতীয় অবস্থানে ছিল পাকিস্তান ফেরৎ সেনা কর্মকর্তাগণ। পরবর্তীকালে এরশাদকে জিয়া ডেপুটি করার মধ্য দিয়ে এই গ্রুপ সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। তবে ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডে পাকিস্তান ফেরৎ সেনাকর্তাদের তৃতীয় গ্রুপটির সরাসরি জড়িত থাকার কোন তথ্য এখনো উঠে আসেনি। তবে এ পর্যন্ত সেনাকর্তাদের যে সব বই বেরিয়েছে, সেগুলো পড়ে আমাদের ধারণা হলো, বঙ্গবন্ধু বিরোধী ফারুক-রশীদ গং ধরে নিয়োছিলো, তারা পাকিস্তান ফেরৎ অমুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটির সমর্থন পাবেন। চতুর্থ গ্রুপে সংগঠিত হচ্ছিলেন তাহেরের (জাসদ সমর্থিত) বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। এই চারটি গ্রুপের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় পঁচাত্তরে সেনানেতৃত্বের মনস্তাত্ত্বিক তাপমাত্রা কি মাত্রায় পৌঁছেছিল তা বুঝতে পারলে বলতে পারবো, ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ড সংগঠনে সেনাকুঞ্জে কি ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছিল।
দেশের সার্বিক অবস্থা নিঃসন্দেহে অস্থিতিশীল ছিল। এটাই বাস্তবতা যে, বঙ্গবন্ধু সরকারের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নেমেছিল। তিনি বহু সমস্যারই সমাধান করতে পারেননি অথবা তা সম্ভবও ছিল না। চুয়াত্তরের মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষকে সবাই যার যার মতো করে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি। ৭৫ এর শুরুতে একদলীয় শাসনজারীর ফলে সেনাবাহিনীতে বঙ্গবন্ধু বিরোধী গ্রুপ চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হয় এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে নিয়মতান্ত্রিক পথে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়। বলপ্রয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই। ফারুক-রশীদ গং বুঝেছিল, সেনাবাহিনীর বাইরে থেকে পাকিস্তানপন্থী ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী সকল গ্রুপ, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন পাবে। সেনাঅভ্যন্তরেও শফিউল্লাহ-খালেদ-শাফায়াতদের বিরুদ্ধে, বিক্ষুব্ধ জিয়াপন্থী মুক্তিযোদ্ধাও সাধারণ সৈনিকদের সমর্থন পাবার ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল। ঘটনার পরে তাদের মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। জিয়া গ্রুপের কাছ থেকে তাদের আসলেই কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। তারা এও অনুমান ছিল, সমস্ত পাকিস্তান ফেরত অমুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্তারা তাদের অভ্যুত্থান ও প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেবে। এই অনুমানও তাদের সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। চতুর্থত; তাহের এর বিপহ্মবী সৈনিক সংস্থার অবস্থান তখনো অবধি সবার কাছে পরিস্কার ছিল না এবং তাহের যেহেতু সেনাবাহিনী থেকে আগেই বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন সেহেতু বড় কোন ঝুকিপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নই ছিল না।
চুড়ান্ত আঘাত হানার আগে ফারুক-রশীদের সামনে মূল বাধা ছিল শফিউল্লাহ, খালেদ, মোশাররফ ও শাফায়াত জামিল। তিনজনই ছিলেন সেনাবাহিনীর যথাক্রমে ১ম ৩য় ও ৪র্থ (৪৬ বিগ্রেডের অধিনায়ক হিসেবে শাফায়াত)। শাফায়াত জামিলের বক্তব্য হলো তারই অধীনস্থ একটি ইউনিট নিয়ে রশীদের মুড করার বিষয়টি গোয়েন্দারা জানলেও তার নিকট সুকৌশলে গোপন ব্যাখ্যা হয়েছিল। তাঁর আরো বক্তব্য হলো বঙ্গবন্ধু যখন শফিউল্লাহকে ফোন করেন তখন তিনি অবরুদ্ধ। শফিউল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে পুরো সেনাবাহিনীকে সশস্ত্র অবস্থায় নিয়ে আসার মতো দক্ষতা দেখাতে পারেন নি। তাছাড়া শাফায়াত তার বিগ্রেডকে প্রস্তুত করে এ্যাকশনে গেলেও বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করা যেত না। কারণ ফারুক-রশীদ গং সময়ের বিবেচনায় দু’ঘন্টা অগ্রগামী ছিল। নিয়মিত পদাতিক বাহিনী এ্যাকশনে যেতে হলে অন্তত দু’ঘন্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এটাও ইতিহাসে আলোচনায় দাবী রাখে যে, কি কারণে শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান হয়েও দু’জন জুনিয়ার অফিসারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে এ্যাকশনে নিতে পারলেন না। এটা যদি নিতান্ত ব্যক্তি শফিউল্লাহর অযোগ্যতা হয় তবে বলার থাকে না। কিন্তু অনেকের মতো আমিও মনে করি গোটা সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন পর্যায়ে পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সেনাকমান্ডে পারস্পরিক অবিশ্বাস দানা বেঁধেছিল। শফিউল্লাহর বোধ হয় ধারণা হয়েছিল যে, নিশ্চয়ই তার ডেপুটি জিয়ার অভ্যুত্থানে মদদ রয়েছে। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর কাছে এখনো জাতির একটাই প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ আছে যে, বঙ্গবন্ধুকে বাঁচানো যাক বা না যাক- কেন তিনি সংকটমূলক মুহূর্তগুলোতে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেন। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে। সেদিন কুশীলব অথবা নীরব দর্শক, সেনাকর্তাদের বেশীরভাগ এখনো জীবন সায়াহ্নে। ধারণা করা হচ্ছে তাঁরা নিজ বক্তব্য হাজির করবেন জাতির সামনে। তবেই আমরা সেদিনের ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলোতে সেনাকুঞ্জে কি ঘটেছিল তা আরো ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারবো। (সংগৃহীত)
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট

প্রধান শিরোনাম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত